এসব এখনও পাওয়া যায়?
প্রিন্ট তৈরি থাকে না। নেগেটিভ আছে; অর্ডার দিলে করে দিই। ১৮৫৪ থেকে সব নেগেটিভ রাখা আছে।
বলেন কী! আঠারোশো চুয়ান্ন?
বোর্ন অ্যান্ড শেপার্ড হল পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রাচীনতম ফোটার দোকান।
তার মানে তো হাজার হাজার নেগেটিভ থাকবে আপনাদের এখানে!
আসুন না, দেখিয়ে দিচ্ছি। ওই যে দেখুন দেয়ালে ঝুলছে—১৮৮০-তে মনুমেন্টের উপর থেকে তোলা ছবি।
এতক্ষণ দেখিনি, এবার বলতে চোখ গেল। এক হাত বাই পাঁচ হাত সাইজের ছবি। মনুমেন্টের উপর থেকে প্রায় একশো বছর আগের কলকাতা শহর। ড্যালহাঁসি-এসপ্ল্যানেড থেকে শুরু করে উত্তরে যতদূর দেখা যায়। গির্জাগুলির মাথা অন্য সব বাড়িকে ছাপিয়ে উঠেছে। ত্ৰিসীমানায় একটাও হাইরাইজ নেই। দেখলেই বোঝা যায় শান্ত শহর।
নেগেটিভের ঘর দেখে চোখ টেরিয়ে গেল। ঘরের চার দেয়ালের মেঝে থেকে সিলিং অবধি শেলফ উঠে গেছে, আর প্রত্যেকটি শেলফ ব্রাউন রঙের চ্যাপটা চ্যাপটা বাক্সে ঠাসা। প্রত্যেক বাক্সের গায়ে লেখা রয়েছে তাতে কোন সালের কী ধরনের ছবি রয়েছে।
ফেলুদা শেলফগুলোর সামনে ঘুরে ঘুরে লেখাগুলোর দিকে কিছুক্ষণ খুব মন দিয়ে দেখে হাতের রিস্টওয়াচটার দিকে একবার চেয়ে আমাদের দিকে ফিরে বলল, তোরা ঘণ্টাখানেক ঘুরে আয়; আমার একটু কাজ আছে এখানে।
লিফটে উঠে লালমোহনবাবু বললেন, তোমার দাদার হুকুম শিরোধার্য। ওই একটা লোককে না বলা যায় না। কী পার্সেনালিটি! চলো একটিবার ফ্র্যাঙ্ক রস-এ।
গাড়িটা সুরেন ব্যানার্জি রোডেই রেখে আমরা চৌরঙ্গি দিয়ে গ্র্যান্ড হাটেলের দিকে হাঁটতে লাগলাম। লালমোহনবাবু কী ওষুধ কিনবেন জানি না, জানার দরকারও নেই; উদ্দেশ্য কেবল সময় কাটানো।
ভিড়ের মধ্যে কলিশন বাঁচিয়ে কিছুদূর এগোনোর পর ভদ্রলোক বললেন, কিছু বুঝতে পারছি ভাই তপেশা-তোমায় দাদার মতিগতি?
বলতে বাধ্য হলাম যে কিছুই বুঝছি না, তবে এটুকু আন্দাজ করতে পারছি যে, ফেলুদা
গডউইনের কবর খোঁড়ার একটা সম্পর্ক রয়েছে।,
দুশো বছর মাটির নীচে থাকার পরও যে দেহ কঙ্কাল অবস্থায় থাকে সেটা তুমি জানতে? জটায়ু জিজ্ঞেস করলেন।
এ ব্যাপারে জোব চার্নকের মৃতদেহ নিয়ে একটা ঘটনা ফেলুদা আমাকে বলেছিল: সেটা লালমোহনবাবুকে বললাম। চার্নক মারা যাবার দুশো বছর পরে সেন্ট জনস গির্জার একজন পাদ্রির মনে হঠাৎ সন্দেহ ঢোকে চার্নকের সমাধিষ্টা সত্যিই সমাধি তো, নাকি এমনিই একটা স্তম্ভ খাড়া করা হয়েছে। সন্দেহটা এমনিই পেয়ে বসে যে, পাদ্রি শেষে লোক দিয়ে মাটি খোঁড়ালেন। চার ফুট নীচে পর্যন্ত কিছু পাওয়া গেল না, কিন্তু আর দু ফুট খুঁড়তেই একটা কঙ্কালের হাত বেড়িয়ে পড়ল। পাদ্রি মানে মানে গর্ত বুজিয়ে দিলেন!
ফ্র্যাঙ্ক রসে গিয়ে লালমোহনবাবু যখন কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে বলছেন, ওয়ান ফারহ্যাঁনস ফর দি গামস ফ্যামিলি সাইজ, ঠিক তখনই লক্ষ করলাম দোকানে একজন চেনা লোক ঢুকছেন। তিনি অবশ্যি আমাদের দেখামাত্র চেনেননি; বার দু-তিন আমাদের দিকে তাকিয়ে তারপর মুখে হাসিটা এল। নরেনবাবুর ভাই গিরীনবাবু। হাতে একটা বড় বাক্স, তাতে লেখা হংকং ড্রাই ক্লিনারস। বললেন, দাদার জন্য ওষুধ নিতে এসেছি।
কেমন আছেন নরেনবাবু? জিজ্ঞেস করলেন জটায়ু।
দাদা বেটার। ভাল কথা-আপনাদের সঙ্গে সেদিন যিনি ছিলেন। তিনিই নাকি গোয়েন্দা প্রদোষ মিত্তির? দাদা দিলেন খবরটা। ভদ্রলোকের নাম শুনেছি আগে। ভাবছিলাম–
গিরীনবাবু ভুরু কুঁচকে একটু যেন অন্যমনস্ক হলেন। তারপর বললেন, ওঁকে বাড়িতে পাওয়া যায় কখন?
সেটা ঠিক বলা মুশকিল, আমি বললাম, তবে ডিরেক্টরিতে নম্বর পাবেন! আপনি আসতে চাইলে আগে ফোন করে নিতে পারেন।
হাঁ… ওঁর সঙ্গে একটু.ঠিক আছে, আমি টেলিফোন করে নেব। বলবেন প্রদোষিবাবুকে, দরকার পড়লে যাব-হেঃ হেঃ…
আমরাও হেঁ হেঁ করতে করতে ভদ্রলোকের কাছে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলাম।
নিউ মার্কেটে একটা চক্কর মেরে মতিশীল স্ট্রিট দিয়ে সুরেন ব্যানার্জিতে পড়লাম। বোর্ন অ্যান্ড শেপার্ডের সামনে এসে দেখি ফেলুদা গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ওর কাজ নাকি যা আন্দাজ করা গিয়েছিল তার একটু আগেই শেষ হয়ে গেছে। গিরীনবাবুর সঙ্গে দেখা হবার খবরটা ফেলুদাকে দিলাম।বটে? বলল ফেলুদা,কী বললেন ভদ্রলোক? আমি জানি ফেলুদাকে ভাসাভাসাভাবে কিছু বললে চলবে না, তাই যা কথা হল সব ডিটেলে বললাম। এমনকী ভদ্রলোকের হাতে লস্ক্রির বাক্সটার কথাও বললাম! ফেলুদা চুপ করে শুনে গেল! কাজ কেমন হল? লালমোহনবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
ফিাস্ট ক্লাস, বলল ফেলুদা,একেবারে রত্নখনি। আর ওখান থেকে ফোন করে জেনে নিয়েছি মিঃ চৌধুরী বাড়ি ফিরেছেন। পাকা অ্যাপয়েন্টমেন্ট হয়ে গেছে। মখমলের মতো মোলায়েম গলায় কথা বলেন ভদ্রলোক।
০৯. বাজা-ঘড়ি বা চাইমিং ক্লক
বাজা-ঘড়ি বা চাইমিং ক্লক অনেক শুনেছি, কিন্তু মহাদেব চৌধুরীর বাড়িতে ঢুকতে না-চুকতে ছটা বাজার যেসব অদ্ভুত শব্দ একটার পর একটা ঘড়ি থেকে আমাদের কানে আসতে লাগল, সেরকম ঘড়ির বাজনা আমি কোনওদিন শুনিনি। লালমোহনবাবু বললেন, এ যেন স্বৰ্গদ্বার দিয়ে ঢুকছি। মশাই। মাঙ্গলিক বাজছে। এ রিসেপশন ভাবা যায় না।
ঢুকতেই যে ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হল তা নয়। একজন কর্মচারী গোছের লোক এসে বলল, মিঃ চৌধুরী ব্যস্ত আছেন, আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে। আমরা একটা আপিস ঘরে গিয়ে বসলাম। এই ছোট্ট ঘরেও দুটো বাহারের ঘড়ি—একটা দেয়ালে, একটা বুকশেলফের ওপর।
