থ্যাঙ্ক ইউ, মিস্টার মিটার, হাঁপ ছেড়ে বললেন মার্কাস গডউইন।
শার্লট গডউইনের ডায়রি যে কত মূল্যবান জিনিস সেটা আপনি জানেন? প্রশ্ন ফেলুদার।
না। শার্লট গডউইনের ডায়রি ওই বাক্সে রয়েছে তা আমি জানতাম না, বললেন মার্কাস গডউইন। তবে একটা কথা আমি আপনাকে বলছি মিঃ মিটার—আমার পূর্বপুরুষদের নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র কৌতুহল নেই। সত্যি বলতে কী আমার কোনও বিষয়েই কোনও কৌতুহল নেই। এখন শুধু মরার দিনটির জন্য অপেক্ষা। ওই বেড়াল ছাড়া আর আমার আপনি বলতে কেউ নেই। সন্ধেবেলা একজনের বাড়িতে গিয়ে পোকার খেলতাম, এখন গাউটের জন্য তাও পারি না।
তা হলে প্রশ্নগুলো করে বোধহয় লাভ নেই।
কী প্রশ্ন?
আপনার ঠাকুরদাদার বাবার নাম ছিল ডেভিড, যার সমাধি রয়েছে। সার্কুলার রোড গোরস্থানে।
ইয়েস।
ডেভিডের আর কোনও ভাই বা বোন ছিল কি?
মনে নেই। আমার এক পূর্বপুরুষ আত্মহত্যা করেছিলেন। সে ডেভিডের ভাই কি না মনে নেই।
ডেভিডের ছেলে, অর্থাৎ আপনার ঠাকুরদাদার নাম ছিল অ্যাণ্ডু?
ইয়েস। হি ওয়াজ ইন দি আর্মি।
শার্লট গডউইন তার এক ভাইঝি বা বোনঝির কথা লিখেছেন। হিসেব করে দেখা যাচ্ছে, তিনি আপনার ঠাকুরদার আপনি বোন কিংবা–
আমার ঠাকুরদাদার কোনও ভাই-বোন ছিল না।
তা হলে কাজিন।
তাদের সম্বন্ধে আমি কিছু বলতে পারব না, মিঃ মিটার। আমার স্মরণশক্তি অনেক’দিন থেকেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। তা ছাড়া আমাদের পরিবার তোমাদের মতো কাছাকাছি থাকে না। তারা সব ছিটকে ছড়িয়ে পড়ে। এ তো আর তোমাদের বাঙালিদের একান্নবর্তী পরিবার নয়।
***
সোসাইটি সিনেমার সামনে নিজামেতে বসে মাটন-রোল খেতে খেতে ফেলুদা লালমোহনবাবুকে একটা প্রশ্ন করল।
নিরেন বিশ্বাস লোকটাকে আপনার কেমন মনে হয়?
লালমোহনবাবু চিবোনো শেষ করে ঢোক গিলে বললেন, ভালই তো। চোখের মধ্যে বেশ একটা ইয়ে ভাব আছে।
আমারও তাই মনে হয়েছিল।
এখন আর হচ্ছে না?
অবিশ্যি একটা দোষেই একটা মানুষের গোটা চরিত্র নষ্ট করে দেয় না। কিন্তু এটা বলতেই হয় যে, ভদ্রলোক একটা মারাত্মক অন্যায় করে ফেলেছেন।
আমরা দুজনেই খাওয়া থামালাম।
আজ প্রমাণ পেলাম যে, ওর মানিব্যাগের কাটিং দুটো ন্যাশনাল লাইব্রেরির রিডিং রুমে সযত্নে রক্ষিত দেড়শো দুশো বছরের পুরনো খবরের কাগজ থেকে ব্লেড দিয়ে কেটে নেওয়া। আমার মতে, এ অপরাধের জন্য মানুষের জেল হওয়া উচিত।
আমি কল্পনা করতে চেষ্টা করলাম নরেনবাবু রিডিং রুমে বসে দম বন্ধ করে গোপনে কর্মচারীদের দৃষ্টি এড়িয়ে এই দুষ্কর্মটি করছেন, কিন্তু পারলাম না। সত্যি, মানুষকে দেখে চেনার উপায় নেই।
এটা একটা রোগ বলতে পারেন, ফেলুদা বলে চলল, আর এ ধরনের অন্যায় কাজ ধরা নাপড়ে সাক্সেসফুলি করতে পারলে মানুষ একটা উৎকট আনন্দও পায়, নিজেকে আর পাঁচ জনের চেয়ে বেশি চতুর মনে করে একটা আত্মতৃপ্তি অনুভব করে। ভেরি স্যাড।
মািটন রোলের পর লস্যির অর্ডারের সঙ্গে সঙ্গে ফেলুদা বিলটাও আনতে বলে দিল। ঘড়িতে বলছে আড়াইটা। আরও তিন ঘণ্টা সময় কাটিয়ে তারপর যেতে হবে। ঘড়ি-পাগল মিস্টার চৌধুরীর বাড়িতে। আমি জানি পেরিগ্যাল রিপিটারের সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ফেলুদার সোয়াস্তি নেই।
আচ্ছা মশাই, হাড়গিলেও কি এইভাবে খাবারের প্রত্যাশায় জানালার উপর বসে হাঁক পাড়ত নাকি?
আমাদের পাশেই রাস্তার দিকে একটা জানালা, তার উপর একটা কাক বসে বেশ কিছুক্ষণ থেকে কা-কা করছে। সেইটের দিকে তাকিয়েই লালমোহনবাবু প্রশ্নটি করেছেন।
সম্ভবত না, বলল ফেলুদা, তবে বাড়ির আলসে বা ছাতের পাঁচিলে যে বসত তার অনেক প্রমাণ পুরনো ছবিতে আছে।
আশ্চৰ্য, পাখিটার চেহারা যে কী রকম তাই জানি না।
জানার একটা উপায় হচ্ছে চিড়িয়াখানায় যাওয়া। আর না হয় চলুন কর্পোরেশন স্ট্রিট দিয়ে বেরোব। মিউনিসিপ্যাল বিল্ডিং-এর সামনেই কপোরেশনের সিম্বলে হাড়গিলের চেহারা দেখিয়ে দেব।
আপনি এখনও কর্পোরেশন স্ট্রিট বলছেন? হেসে বললেন জটায়ু।
থুড়ি, সুরেন ব্যানার্জি—
ফেলুদা থেমে গেল। চোখের চাহনি চেঞ্জ। পকেট থেকে খাতা বার করে কী জানি দেখল। তারপরেই ছটফট ভাব, কারণ বিল দিতে দেরি করছে। ফেলুদা বেয়ারা বলে হোক দিল—যেটা সচরাচর করে না। বিল দিয়ে গাড়িতে উঠে ড্রাইভার হরিপদকে নির্দেশ দিয়ে দিল। গাড়ি সুরেন ব্যানার্জি রোডে গিয়ে পড়ল। ফেলুদা বাড়ির নম্বর দেখছে, যদিও সব বাড়িতে নম্বর নেই— কলকাতার এই আরেকটা কেলেঙ্কারি। আরেকটু এগিয়ে যাব ভাই।…তোপ্সে, ১৪১ দেখলেই বলবি।
মনে পড়ে গেল—১৪১ SNB। সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি। বুকটা টিপ টিপ করছে।
ওই যে একশো একচল্লিশ!
গাড়ি থামল। বাড়ির গায়ে লেখা Bourne & Shepherd-BS! পাওয়া গেছে। মিলে গেছে।
ফেলুদার সঙ্গে আমরা দুজনও ভিতরে ঢুকলাম। লিফট দিয়ে উঠতে হবে।
দোতলায় লিফট থেকে বেরিয়েই একটা সোফা-বেঞ্চি পাতা ঘর। একজন কর্মচারী আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। ফেলুদার ইতস্তত ভাব, কারণ যে প্রশ্নটা করতে হল সেটায় একটা বেকুবি গন্ধ থাকতে বাধ্য।
ইয়ে—ভিক্টোরিয়ার কোনও ছবি আছে। আপনাদের এখানে?
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়া?
না। কুইন ভিক্টোরিয়া।
আজ্ঞে না। আমাদের এখানে শুধু যারা ভারতবর্ষে এসেছেন তাদের ছবি পাবেন। এডওয়ার্ড দ্য সেভেনথ পাবেন—যখন প্রিন্স অফ ওয়েলস ছিলেন—জর্জ দ্য ফিফথ, দিল্লির দরবার…
