ইসমত ভালো চাকুরিই করে, তবে নিশ্চয়ই ওর কষ্ট হচ্ছে সংসার চালাতে, কিন্তু ও কারো সাহায্য চায় নি; বরং ও-ই সাহায্য করে অনেককে। গ্রাম থেকে আত্মীয়রা এসে আমার বাসায় ওঠে না, হয়তো সাহস করে না, বা স্বস্তি পায় না, এতে আমার ভালোই লাগে; ওঠে ওর বাসায়, এতে আমার কিছুটা খারাপই লাগে। আমি দু-একজনকে আমার বাসায় উঠতে বলেও দেখেছি, তারা এককাপ চা খেয়ে চলে যায়, আর আসে না। একবার আমি অনেক রাত পর্যন্ত একজনের জন্যে না খেয়ে বসে ছিলাম, সে আসে নি; ফিরোজা অবাক হয়েছিলো গ্রামের একটি আত্মীয়ের জন্যে আমার বসে থাকা দেখে। বছর চারেক আগে ইসমত একটি হিন্দু ছেলেকে হিন্দু বলা ঠিক হচ্ছে না মনে হচ্ছে, কেউ কেউ আমাকে সাম্প্রদায়িক ভাবতে পারে-বাসায় জায়গা দেয়; ছেলেটা। আমাদের গ্রামেরই, ওর পিতাকে আমি মাছটাছ বিক্রি করতে দেখেছি, মদনকুমার না। হরিপদ নাম ছেলেটার, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছিলো, কিন্তু অত্যন্ত চৌকশ ছেলে সে। এর বেশি সংবাদ আমি রাখি না, তবে শুনি মদন নাটকটাটক করে খুব নাম করেছে, এক পত্রিকায় আমি তার সাক্ষাৎকারও পড়েছিলাম। অভিনয় যে এখন এতো শ্রদ্ধেয় ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, আমার জানা ছিলো না, মদনকুমারের সাক্ষাৎকার পড়েই আমার চোখ। খুলে যায়; ফেলটেল করা বাউণ্ডুলেরাই এসব করে বলে আমি জানতাম, ওর সাক্ষাৎকার পড়ে বুঝতে পারি অভিনয় আজকাল শ্রেষ্ঠ প্রতিভারাই করেন। তাই হবে, এ পর্যন্ত কেউ আমার সাক্ষাৎকার নিতে আসে নি। ছোঁকরাকে মনে মনে আমি একটু ঈর্ষাও করি। ইসমত ছোঁকরাকে বিয়ে করছে শুনে আমি উত্তেজিত হই নি, ভালোই লাগছিলো, আমরা তো আর ব্রাহ্মণ নই; মা কিছুটা উত্তেজিত হয়েছিলো; কিন্তু ইসমত যা করতে চায়, তা সে করে। ইসমতের একটি পুরুষ দরকার ছিলো, ছোঁকরার একটি থাকাখাওয়ার জায়গার দরকার ছিলো, আমি আপত্তির কিছু দেখি নি। ছোঁকরা দেখতে। বেশ, ইসমতের প্রথম তাঁদরটার থেকে অনেক বেশ, গজারমাছের মতো, বয়সে বছর দশেকের ছোটো; ইসমত নিশ্চয়ই সব কিছু পরখ করেই নিয়েছে। খোকাও হয়েছে। একটি বছর দুয়েক আগে, কিন্তু ইসমত এখন একটু সমস্যায় পড়েছে।
দাদা, একটু বাধা দাও এতে, ইসমত খুব আবেগের সাথে বলে আমাকে, কেঁদেও। ফেলতে পারে বলে মনে হচ্ছে। ইসমতকেও এতোটা বিহ্বল হতে আমি আগে কখনো দেখি নি; তাঁদরটা খুন হয়ে যাওয়ার পরও ইসমত এতোটা কাতর হয় নি।
আচ্ছা, দেখি, আমি বলি, আজই দেখছি।
তোমার সাথে তো মেয়েটির আম্মার পরিচয় আছে, তুমি তার সাথে একবার কথা বলো, ইসমত বলে, মদন এতোটা বিশ্বাসঘাতক হবে আমি কখনো ভাবি নি। গলা ধরে আসতে চাচ্ছে ইসমতের, খুব কষ্ট পাচ্ছে, আরো কষ্ট পাবে ইসমত।
তুই জানতি না আগে? আমি বলি।
এসব ব্যাপারে বউই জানে সবার পরে, ইসমত বলে, এখন দেখি সবাই জানে। অনেক আগে থেকে, শুধু আমি ছাড়া। ইসমতকে বেশ অভিজ্ঞও মনে হচ্ছে। অবাক লাগছে, আমাকে একবারও কেউ বলে নি।
মদনকুমার কয়েক দিন ধরে ইসমতের বাসায় আসছে না। আগে মদন দুপুরে আসতো না, তাতে ইসমতের কোনো সন্দেহ হয় নি। কিন্তু রাতে না আসায় ইসমত প্রথমে ভয় পায়, পরে খবর পায় মদন একটি তেলতেলে বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে অন্য এক বাসায় উঠেছে। ইসমত বেশ কষ্ট পাচ্ছে, মেয়েটি বাচ্চা বলে বেশি কষ্ট পাচ্ছে, বুড়ি হলে এতো কষ্ট পেতো না, হঠাৎ ইসমত নিজেকে বুড়ি ভাবছে, ইসমতের মুখে প্রতারিতের অপমানিতের মুখ দেখতে পাচ্ছি। মেয়েটির মায়ের সাথে আমার পরিচয় আছে। মেয়েটির বাবা আমাদের ফার্মেই ছিলেন, তাঁর কাছে ব্রিজের অনেক কিছু আমি। শিখেছি, কয়েক বছর আগে হঠাৎ হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে ব্রিজট্রিজ ফেলে রেখে চলে। গেছেন। মেয়েটিকেও আমি চিনি, আমি বুঝতে পারছি ইসমতকে উদ্ধার করতে আমি পারবো না, কেউই পারবে না, ইসমতের ধসে পড়া ব্রিজ আমি সারাই করতে পারবো না; ওই মেয়েকে ছেড়ে মদন ইসমতের কাছে ফিরবে না। দেশ খুব সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠছে, দেখতেই পাচ্ছি, কিন্তু মদন দেখছি একটির পর একটি মুসলমান মেয়েকে নিকে করে চলছে। মেয়েটির নামও আমার মনে পড়ছে, তিলোত্তমা, ইসমতই মনে করিয়ে দেয়। মেয়েটি আমার কোলেও দু-একবার বসেছে। ফয়েজ সাহেবের বাসায় আমি বেশ কয়েকবার গেছি, মেয়েটি তখন মাধ্যমিকে পড়ে হয়তো, খুব ঝলমলে, উপচে পড়ছে সব কিছু। সে এসেই কোলে বসতো, জড়িয়ে ধরতো। আমি অস্বস্তি বোধ করতাম, উত্তাপও; ফয়েজ সাহেব কিছু মনে করতেন না, তবে আমি যে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছি তাতে তিনি অস্বস্তি বোধ করতেন।
ভাবী, আমি মাহবুব বলছি, আমাকে চিনতে পারছেন? আমি ফয়জুন্নেসা ফয়েজকে ফোন করি, আপনার সাথে আমি একটু দেখা করতে চাই।
আমার সাথে আজকাল আর কে দেখা করে, ফয়জুন্নেসা ফয়েজ একটু শ্বাস একটু ক্ষোভ মিলিয়ে বলেন, আমার কি সেই দিন আছে!
দুঃখিত ভাবী, আপনার কথা প্রায়ই মনে পড়ে, কিন্তু সময় করে উঠতে পারি না, আমি একটু বিনয়ের ভাব করি।
বিনয়ের দরকার নাই, আসতে চাইলে এখনই আসেন, ফয়জুন্নেসা ফায়েজ বলেন, আজকাল আর এই সব দ্রতা ভালো লাগে না।
আমি আসছি, ভাবী, বিব্রত হয়ে আমি টেলিফোন রাখি।
ফয়জুন্নেসা ফয়েজ বাসায় একলাই আছেন। কয়েক বছরে বেশ বয়স হয়ে গেছে। তাঁর; তবে ঠোঁট এখনো আগের মতোই লাল, বাহু আগের মতোই ভোলা, পেট এখনো আগের মতোই আকর্ষণীয়। ফয়েজ সাহেবের তিনি দ্বিতীয়, আর ফয়েজ সাহেব তার তৃতীয়।
