আমি জানি না ফিরোজার আর কোনো ব্রিজ আছে কি না, কিন্তু আমি যতোই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছি ততোই আকর্ষণীয় হচ্ছি, আর ততোই আমার ব্রিজের সংখ্যা বাড়ছে; সেগুলোতে চলাচলও অনেক বেশি। ফিরোজা-আমি বিবাহিত, আমরা স্বামীস্ত্রী, এটি আমাদের সর্বজনস্বীকৃত ব্রিজ, এটিই আমার একমাত্র ব্রিজ বলে অন্যরা মনে করার ভান করে, আমিও করি। এছাড়া অন্য কোনো ব্রিজ অন্যরা মেনে নেবে না, যদিও তারাও নিজেদের ব্রিজে হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত, তারাও অন্য ব্রিজ তৈরি করে চলছে, বা তৈরি করার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। একটি পুরুষ আর একটি নারী কতো দিন একসাথে থাকার পর ক্লান্ত হয়? কতোবার একসাথে ঘুমোনোর পর, ঠিক কতোটি সঙ্গমের পর, তারা পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ হারায়? মানুষের গঠন আমি জানি না; আমি জানি না মানুষের ভেতরে এমন কিছু আছে কি না যা পালন করে অন্যের প্রতি আকর্ষণ বোধ করার দায়িত্ব; আছে নিশ্চয়ই, আমি তা টের পাই, বারবার আমি টের পেয়েছি; কিন্তু সেটির শক্তি কতোটা? কতো দিন সেটি আকর্ষণ বোধ করে যেতে পারে? ওই আকর্ষণ বোধ। করার শক্তিটির নামই সম্ভবত প্রেম। প্রেম বিয়ের শর্ত নয়, বিবাহিত জীবনেরও শর্ত নয়, কোনো ধর্মই চায় না স্বামীস্ত্রী প্রেমের মধ্যে থাকবে; এখন মানুষ একটু বেশি দাবি। করছি বিয়ের কাছে, শুনতে ভালো শোনায় বলে। কোনো কালে কোনো স্বামীস্ত্রী। ভালোবেসেছে একে অন্যকে, এটা আমার বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না; সহবাস, সঙ্গম, সন্তান, দায়িত্ব, এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়া, বেশ এই, এই তো বিয়ে। যেমন আমরা, ফিরোজা আর আমি, আমাদের মধ্যে বিশেষ কোনো গোলমাল নেই, সবই ঠিক আছে; কিন্তু আমার মনে হয় কোথাও একটি বড়ো গোলমাল ঘটে গেছে, যার জন্যে আমি। দায়ী নই, ফিরোজাও দায়ী নয়।
ভাত খেতে বসেছি, খাওয়া আমার শেষ হয়ে এসেছে, ফিরোজা আমার পাতে বড়ো এক চামচ ভাত তুলে দেয়।
আমি তো ভাত চাই নি, আমি অবাক হয়ে বলি।
চাও নি তাতে কী, ফিরোজা বলে, ভাত তো তুমি নিতেই।
তুমি কী করে জানলে? আমি বলি।
অন্য কেউ দিলে খুব তো খুশি হতে, আমি দিচ্ছি বলেই, ফিরোজা বলে।
আমি আর কথা বলি না, ভাত খাই; আমি পছন্দ করি না আমার পাতে কেউ ভাত তুলে দিক; এটা আমার ত্রুটি, ভাত তুলে দিলে খুশি হতে হয়, কিন্তু আমি হতে পারি না। কেননা হতে পারি না? ফিরোজা আমার পাতে ভাত তুলে দিলে আমার কেনো ভালো লাগে না, সে কি ফিরোজা বলে? অন্য কেউ হলে সত্যিই কি আমি আনন্দিত হতাম? ফিরোজার ভাত তুলে দেয়ার মধ্যে আমি কোনো চাঞ্চল্য দেখি না, আমার পাতে ভাত তুলে দিয়ে সে সুখ পাচ্ছে, আমার মনে হয় না; এমনকি সে একটি দায়িত্ব পালন করছে, এটা তাও নয়। হতো যদি আমার হাত অবশ হয়ে গেছে, দুর্ঘটনায় একটি হাত হারিয়ে ফেলেছি, ভাত তুলতে পারছি না, সে তুলে দিচ্ছে, একটি উপকারী দায়িত্ব পালন করছে, তাহলে কৃতজ্ঞ বোধ করতাম; কিন্তু এই হঠাৎ ভাত তুলে দেয়ার মধ্যে একটু প্রভুত্ব করার ঝোঁক আছে, সে আমার বৈধ স্ত্রী, যখনতখন ইচ্ছে করলেই সে আমার। পাতে ভাত তুলে দিতে পারে, আমার দরকার থাক বা না থাক।
আমি এক কাপ চা খেতে চাই। কাজের মেয়েটি জানে আমি ঠিক কী রঙের চা খেতে পছন্দ করি; মেয়েটি দু-মাসেই শিখে ফেলেছে, জেনে ফেলেছে ঠিক কতোটা চিনি চাই আমার; ফিরোজা অবশ্য তা জানে না, তাতে আমার একটুও দুঃখ নেই, বরং আমি কখনোই চাই না ফিরোজা আমার জন্যে চা তৈরি করে আনুক। চা বানানোর মতো। একটি কাজের জন্যে কাজের মেয়েই যথেষ্ট, তার জন্যে একটি বিবাহিত স্ত্রী দরকার পড়ে না। কাজের মেয়েটি পিরিচটি খুব যত্নের সাথে মোছে, একফোঁটা চাও তাতে লেগে থাকে না; চা খাওয়ার আগে আমি চামচ দিয়ে চা নাড়তে পছন্দ করি, মেয়েটি হয়তো দেখেছে, আমিই হয়তো তাকে বলে দিয়েছি চায়ের সাথে চামচ দেয়ার, তাই সাথে সে একটি পরিচ্ছন্ন চামচও দেয়। আমি ওই চা খেয়ে তৃপ্তি পাই। আমি মনে মনে চাই মেয়েটি চায়ের পেয়ালা আমার সামনের টেবিলে এনে রাখুক। মেয়েটিকে একবার দেখে কি আমার ভালো লাগে? আমি জানি না, তবে সচেতনভাবে মেয়েটিকে দেখার আগ্রহ আমার হয় নি কখনো। কোনো কোনো দিন ফিরোজা মেয়েটির হাত থেকে। চায়ের পেয়ালাটি নিয়ে আমার সামনে রাখে, কয়েক ফোঁটা চা ছলকে পিরিচে পড়ে, চামচটি মেঝেতে পড়ে যায়; চামচটি উঠোনোর জন্যে ফিরোজা মেয়েটিকে ডাকতে থাকে। আমার আর চা খেতে ইচ্ছে করে না, কিন্তু চা আমি খাই; না খেলে একটা ঘটনা ঘটে যাবে, আমি অমন ঘটনায় অংশ নিতে চাই না। বাবাকেও দেখেছি। কদবানের হাতের চা সুখের সাথে খেতে, মা চা নিয়ে এলে বাবার সামনে চা অনেকক্ষণ ধরে পড়ে থাকতো, ঠাণ্ডা হয়ে যেতো; তারপর মা তাড়া দিলে তিনি একবারে চা গিলে ফেলতেন, সেদিন আর চা খেতেন না।
আমার ছোটো বোনটি, ইসমত, একটি সমস্যায় পড়েছে; তাকে আমার উদ্ধার করতে হবে, যদিও উদ্ধার করা অসম্ভব আমার পক্ষে, এসব ক্ষেত্রে কেউ উদ্ধার করতে পারে না। ইসমত আমার ছোটো বোন, ওকে আমি পছন্দ আর অপছন্দ দুটোই করি, ও তার একটার খবরও জানে না; আমি কখনো প্রকাশ করি নি ওকে আমি পছন্দ করি, এও জানতে দিই নি ওকে আমি অপছন্দ করি। এমএ পর্যন্ত ওর আসার কথা ছিলো না, বাবা-মা কেউ চায় নি, তেরো বছর থেকেই ওর বিয়ের চেষ্টা চলছিলো, আমি বাধা। দিয়েছি, ও নিজেও বাধা দিয়েছে। সবাইকে অবাক করে ইসমত এমএ পর্যন্ত চলে। আসে; এবং এমএ পড়ার সময়ই আমাদের না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলে। ছেলেটা এক ক্লাশ নিচে পড়তো ওর থেকে, তাঁদরও ছিলো বেশ, বিশ্বের সব কিছু সে সবার চেয়ে। বেশি জানতো, কাউকেই পাত্তা দিতো না, আমার সাথে দু-একদিন এমনভাবে কথা বলেছে যেনো আমি ক্লাশ ফোরের ছাত্র। এ-বিয়েতে সবাই খেপে উঠেছিলো ইসমতের ওপর।:আমি খেপি নি। ওর বিয়ে করার ইচ্ছে বা দরকার হয়েছে, ও বিয়ে করেছে, তাতে আমার কী; একটা চাড়ালকেও যদি ও বিয়ে করে থাকে, চাঁড়ালের সাথেই যদি ও ঘুমোতে চায়, তাতে আমি বাধা দিতে পারি না। শরীরটা ওর, জীবনটা ওর। বিয়ে। করাটা দরকারই হয়ে পড়েছিলো ওর জন্যে, নইলে প্রথম ভাগনেটি পিতার পরিচয়। ছাড়াই জন্মাতো, কারো ভালো লাগতো না, ঝামেলা হতো। ইসমত আর তার তাঁদরটি বেশ প্রজননশীল ছিলো, বিস্তৃত হচ্ছিলো তারা তীব্র বেগে, চার বছরেই চার চারটি বাচ্চা জন্মাতে পেরেছিলো; একটা বাচ্চাকে ইসমতের পেটে রেখেই তাঁদরটি এক সন্ধ্যায় খুন হয়ে যায়। খুন হয়ে যাওয়ার পর আমি প্রথম বুঝতে পারি তাঁদরটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।
