বেগম ও জনাব নুর মোহাম্মদ কি সারারাত শারীরিক শ্রম করার পর ক্লান্ত? এ-বয়সে অধিক নৈশ শ্রম কি পোষাচ্ছে না তাদের? তবু তারা শ্রম করে চলছেন? মেয়েটি তাদের দিল্লিতে, ছেলেটি নিউইয়র্কে বলে আবার একটি শিশু আনতে চাইছেন তাঁরা? শ্রমের ক্লান্তি নিয়ে সকালবেলা তারা কি একজন আরেকজনের দিকে তাকানোর আগ্রহও বোধ করেন না? তবে তারা কি সারারাতে একবারও, ঘুমের মধ্যেও, একজন ছুঁয়েছেন আরেকজনকে? আমি জানি না, আমার জানার কথা নয়, তারা এক শয্যায়। ঘুমোন কি না, একই ঘরে ঘুমোন কি না। দেখে মনে হচ্ছে এখন তাদের একজন হঠাৎ বারান্দায় পড়ে গেলে আরেকজন খুব বিরক্ত হবেন; বেগম নুর মোহাম্মদের খুব খারাপ লাগবে চায়ের পেয়ালা সরিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াতে, নুর মোহাম্মদ সাহেবের খারাপ লাগবে রেলিং থেকে কনুই সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে। তাদের একজন পুরুষ। আরেকজন মেয়েলোক, একই ঘরে তাঁদের থাকার কথা ছিলো না; কিন্তু তারা পরস্পর বিবাহিত বলে, একজন স্বামী আরেকজন স্ত্রী বলে-যেমন ফিরোজা ও আমি বিবাহিত বলে থাকছি, তারাও থাকছেন, অনেক বছর ধরে তাদের একজনের শরীরের ওপর আরেকজনের অধিকার সবাই মেনে নিচ্ছে; কিন্তু তারা এতো দূরে কেনো? তাদের দেখে যেমন মনে হচ্ছে তাতে বিশ্বাসই করতে কষ্ট হচ্ছে কখনো তাঁদের একজন উলঙ্গ দেখেছেন আরেকজনকে। না দেখলে তারা এত দিন একসাথে থাকতে পারতেন না, নিশ্চয়ই দেখেছেন, হয়তো আজ রাতেই দেখেছেন, কিন্তু একই বারান্দায় তাঁরা এতো দূরে কেনো?
আমি নুর মোহাম্মদ আর বেগম নুর মোহাম্মদের কথা ভাবছি কেনো, নিজের কথাই তো ভাবতে পারি; ওরা দুজন অন্তত ভোরবেলা একসাথে বারান্দায় আসেন, কিন্তু আমি। তো একলাই আসি, ফিরোজা বারান্দায়ও আসে না। ফিরোজা আসে না বলে কি আমার খারাপ লাগে? আমি কি চাই এই এখন যখন আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে নুর মোহাম্মদ। দম্পতিকে দেখছি, তখন ফিরোজা আমার পাশে এসে দাঁড়াক, আমরা একসাথে সামনের দালানের দম্পতিকে দেখি, দূরের দু–একটি পাখি আর গাছের ডালে পাতার সবুজ দেখে মুগ্ধ হই? না, আমি চাই না ফিরোজা এখন আমার পাশে এসে দাঁড়াক; সে এসে দাঁড়ালে আমার বিরক্তি লাগবে, আমি অবশ্য তা প্রকাশ করবো না, একটু হাসারও চেষ্টা করবো হয়তো, কিন্তু আমি চাই না ফিরোজা এখন আমার পাশে এসে দাঁড়াক। স্বামী-স্ত্রী খেলা যথেষ্ট হয়েছে, এ-ভোরবেলা তা আর খেলতে ভালো লাগবে না। ফিরোজা যে আসে না এতে আমার খারাপ লাগে না, বরং অত্যন্ত ভালো লাগে; সে না এলে আমি বেগম নুর মোহাম্মদের দিকে ভালোভাবে তাকাতে পারতাম না, বা আমি আসা বন্ধ করে দিতামা। ফিরোজা আসে না বলে আমার ভালো লাগে। তাহলে। ফিরোজা কি আমাকে ক্লান্ত করে, আমি কি ক্লান্ত করি ফিরোজাকে? এখন আমি যদি ফিরোজাকে ডাকি, সে কি ঝলমল করতে করতে ছুটে আসবে? সে আমার ডাক শুনতেই হয়তো পাবে না, যেমন আমিও তার ডাক শুনতে পাই না মাঝেমাঝে।
আমাদের-ফিরোজার ও আমার-ব্রিজটি ভেঙে পড়ছে বলেই মনে হচ্ছে; ঠিক ভেঙে পড়ছে না, তবে ওই সাঁকো দিয়ে অনেক দিন আমরা চলাচল করছি না; কাঠামোটি দাঁড়িয়ে আছে, তার ওপর কোনো পায়ের শব্দ নেই। ফিরোজার মুখ দেখার জন্যে আমি কোনো ব্যাকুলতা বোধ করি না, বেশির ভাগ সময় না দেখলেই ভালো লাগে; ফিরোজারও তাই হয় নিশ্চয়ই, আমার মুখের দিকে সে অনেক দিন তাকায়ই নি, আমিও বোধ হয় তাকাই নি, মাঝেমাঝে আমি তার মুখটিকে মনে করতে পারি না। আমরা যে একজন ঘেন্না করি আরেকজনকে, পাশাপাশি বসতে আমাদের বমি পায়, এমন নয়; কিন্তু আমরা কোনো উল্লাসও বোধ করি না। ফিরোজাকে দেখে আমি অনেক বছর চঞ্চল হই নি; বাসায় ফিরে যখন দেখি সে বাসায় নেই, তখন দু-একটি সন্দেহ। মনে উঁকি দেয়, কিন্তু কোনো উদ্বেগ বোধ করি না; যখন দেখি সে ফিরে আসছে তখন কোনো কাঁপন লাগে না। আমাদের সব কি ঠিক আছে? আমরা কি ঠিক আছি? একটি বেজি দৌড়ে যাচ্ছে দূরের কৃষ্ণচূড়া গাছটির পাশ দিয়ে, ঢুকছে জঙ্গলের মধ্যে, দেখে। আমার ভালো লাগছে, মন ভরে উঠছে; ফিরোজা যদি ওই বেজিটি হতো, দেখে আমার ভালো লাগতো। কিন্তু আমরা স্বামীস্ত্রী, ভোরবেলা কৃষ্ণচূড়া গাছের পাশ দিয়ে দৌড়ে যাওয়া বেজি আমরা কোনো দিন আর হয়ে উঠতে পারবো না আমাদের কাছে। আমাদের সব কিছু কি ঠিক আছে?
আমরা এক বিছানায় ঘুমোই না, আমারই এটা ভালো লাগে না; ঘুমোনার সময়, কারো একটা হাত বা পা আমার গায়ে এসে পড়লেই আমার ঘুম ভেঙে যায়, ঘুমোনার সময় আমার গায়ের ওপর বিশ্বসুন্দরীর বাহু, স্তন, জংঘাও আমার সহ্য হবে না। আমি কামপ্রেমহীন ঘুম পছন্দ করি। ঘুমোতে যেতে সাধারণত আমার দেরি হয়; আর, ফিরোজার রাত্রিজ্ঞান একান্ত নিজস্ব ও অদ্ভুত, কোনো দিন সন্ধ্যার পরই তার মনে হয় রাত গম্ভীর হয়ে গেছে, আর জেগে থাকা যায় না, সে আর জাগতে পারে না, বালিশ জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে, মানুষের পৃথিবী তখন তার ভালো লাগে না তার মোয়ার ভঙ্গি দেখেই বোঝা যায়। আমি কোনো কোনো দিন দেরি করে ফিরি, দেখি ফিরোজা ঘুমিয়ে পড়েছে; ঘুমন্ত মানুষকে ডাকতে আমার ইচ্ছে হয় না, খুব শারীরিক দরকারেও না। একটি ঘুমন্ত মানুষকে ঠেলে জাগিয়ে প্রস্তুত করে দরকার মিটিয়ে আরেক বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ার কথা ভাবতেই আমার ঘেন্না লাগে। আবার কখনো রাত দশটায় ঘুমোতে গিয়ে দেখি ফিরোজার মনে হচ্ছে রাতই হয় নি, তার দু-একটা অনুষ্ঠান দেখা দরকার, একটি সিনেমা পত্রিকার কয়েক পাতা পড়া তার বাকি আছে; তখন আমি শুয়ে পড়ি, রাতে আর আমাদের দেখা হয় না। কোনো কোনো রাতে আমার ঘুম আসে না, অনেকটা শারীরিক দরকারেই, দরকারটা মিটে গেলে একটা চমৎকার ঘুম হতে পারতো; কিন্তু আমি ফিরোজাকে ডাকি না। এটা চলে আসছে অনেক বছর ধরে, কিন্তু আমরা বেশ আছি; তবে আমার মনে হয় আমাদের কিছু একটা হয়েছে। আমাদের। সাঁকোটিতে আর চলাচল নেই; তাতে আর আমাদের পায়ের ছাপ পড়ে না; ওটি আছে, সবাই দেখছে, আমরাও দেখছি, এই সব।
