আমার প্রথম ব্রিজটি, যেটি তৈরির সাথে আমি বিশেষভাবে জড়িয়ে পড়েছিলাম, যার নকশাই করেছিলাম আমি, সেটি শুরুতেই ভেঙে পড়েছিলো; মনে হচ্ছিলো ফুলঝর নদীর ওপর আমার ব্রিজ কোনো দিন দাঁড়াবে না; কিন্তু এখনো ওই ব্রিজ দাঁড়িয়ে আছে, আরো কয়েক দশক দাঁড়িয়ে থাকবে। বেশ সুন্দর নাম ছিলো ব্রিজটির, নদীটির নাম আরো সুন্দর; তবে নদীটি আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলো দুই তীরের মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টি, নদীর ওপর সঙ্গীত লেখা, সহজ কাজ নয়। আমার মনে প্রশ্নই জাগিয়ে দেয় যে যা বিচ্ছিন্ন, তা কি আসলেই সম্পর্কিত হতে চায়; কিছু কি আসলেই পারে সম্পর্কিত হতে? ফুলঝর নদীর দু-তীরের সম্পর্ক ছিলো না, আমি সম্পর্কের একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছিলাম; নদীর ওপর ব্রিজের কাজ চলছিলো ঠিকঠাক; ব্রিজটি বেশি বড়ো হবে নয়, আট শো ফুটের মতো দীর্ঘ, পাশে বত্রিশ, আমি নিশ্চিত ছিলাম সব কিছু ঠিক সময়ে ঠিক মতো হয়ে যাবে, কিন্তু হঠাৎ বন্যা আসে। বন্যা হঠাৎই আসে; রওশন ও আমার ব্রিজ, ফুলঝর নদীর ব্রিজের অনেক আগে, হঠাৎ বন্যায়ই ভেসে গিয়েছিলো; আমি নদীর ওপর ব্রিজ বানাতে গিয়ে দেখি সেভাবেই বন্যা আসছে। যমুনার বাঁধ ভেঙে প্রচণ্ড স্রোত বইতে শুরু করে ফুলঝর নদী দিয়ে, ওই স্রোতের বড়ো কাজই হয় দু-দুটি ভিত্তিকূপ ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমার চোখের সামনেই ঘটনাটি ঘটে, অনেকেই চিৎকার করে উঠেছিলো, ঠিকাদারের চিৎকার ছিলো শোনার মতো, কিন্তু আমি ওই দৃশ্য দেখছিলাম নির্বিকারভাবে। ভিত্তিকূপ তৈরি হচ্ছে দেখে আমার যেমন লেগেছিলো, ভেসে যাচ্ছে দেখে তার থেকে ভিন্ন কোনো আবেগ আমার জাগে নি। কাঠামোর কাজ অবধারিত ভেঙে পড়াকে বিশেষ একটা সময়ের জন্যে ঠেকিয়ে রাখা; ওই ভিত্তিকূপ নিজেও কাঠামো, একদিন ধ্বংস হয়ে যেতোই, তবে ওই কূপের কাছে আশা করেছিলাম একটা বিশেষ সময়ের জন্যে ওটি টিকে থাকবে, কিন্তু টিকে থাকতে পারে নি। কিছুই টেকে না, সব কিছুই ভেঙে পড়ে, কোনোটি আগে কোনোটি পরে।
ভিত্তিকূপ ধসে পড়েছিলো বলে আমরা দমে যেতে পারি নি; ব্রিজ আমাদের দরকার, ফুলঝর নদীর ওপর ব্রিজ দরকার, সম্পর্ক দরকার। আগে যেভাবে ভিত্তিস্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছিলাম, তা আর চলে নি; অন্যভাবে অন্যখানে ভিত্তিস্থাপন করতে হয়েছিলো আমাদের, ব্রিজের নকশাও বদল করতে হয়েছিলো সম্পূর্ণরূপে; কিন্তু আমরা সৃষ্টি করতে পেরেছিলাম একটি ব্রিজ, নদীর দুই পারের মধ্যে সম্পর্ক। ফুলঝর নদীর ওপর ওই ব্রিজ এখনো দাঁড়িয়ে আছে, চোখ বুজলেই ব্রিজটিকে দেখি আমি; ওটি আমার প্রথম ব্রিজ, ওটি আরো অনেক বছর দাঁড়িয়ে থাকবে, সম্পর্ক পাতিয়ে চলবে উত্তরবঙ্গের। সাথে ময়মনসিং আর টাঙ্গাইলের, কিন্তু ওই কাঠামো চিরকাল থাকবে না। আমি এখন একটি বড়ো ব্রিজ নির্মাণের সাথে জড়িয়ে আছি; এ-ব্রিজ সরকারের একটি বড়ো কৃতিত্ব বলে গণ্য হবে, অনেক বিদেশি টাকা ভিক্ষা করতে পেরেছে তারা; যে-মন্ত্রীটি এ-এলাকায় দিন দিন অপ্রিয় হয়ে উঠছে, ব্রিজটি তৈরি হওয়ার পর সে আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠবে বলে রাজনীতিকভাবে আশা করা হচ্ছে, ভোট এলে ছিনতাই না করে সে পাশটাশ করবে, তার কাঠামোগুলো ঠিক থাকবে; কিন্তু আমি আর কোনো কাঠামোর ওপরই বিশ্বাস রাখতে পারছি না। উদ্বোধনের সময়ই যদি প্রধান মন্ত্রী, আর পঞ্চাশটি মন্ত্রী, আর একপাল রাজদূত নিয়ে ব্রিজটি নদীর ভেতর তলিয়ে যায়, তাদের আর খুঁজে না পাওয়া যায়, তাতে আমি খুব কষ্ট পাবো না; বরং চোখ ভরে সেই দৃশ্য। নির্বিকারভাবে দেখবো। কিন্তু আসলেই কি আমি নির্বিকারভাবে দেখবো, দেখতে পারবো? আমি কি এতোটা নির্বিকার হয়ে উঠতে পেরেছি?
চল্লিশ পেরিয়েছি, সব মিলে ভালোই আছি; আমার ব্যক্তিগত কাঠামোটিও চমৎকারই বলে মনে হচ্ছে, যদিও এর ওপরও আমি বিশ্বাস রাখি না, যে-কোনো সময় এটা ধসে পড়তে পারে। মনে মনে একটা ভয় আছে আমার, ধসে পড়ার ভয়, আমি ধসে পড়তে চাই না। দিন দিন আরো আকর্ষণীয় হচ্ছি শুনতে পাই; এমন অনেকের। মুখে শুনি যে হেসে উড়িয়ে দিতে পারি না, চুপচাপ ভেতরে জমিয়ে রাখি। সৌন্দর্য আর প্রশংসা সব সময়ই ভালো। যে-ব্রিজটি তৈরি করছি এখন, যার নকশা আমিই করেছি, দেখাশোনা করছি, সেটি আমাকে উদ্বেগে রাখছে বছর দুই ধরে, কেনো যেনো আমার ভয় হচ্ছে এটি ভেঙে পড়বে। হয়তো ভেঙে পড়বে না, আসলে ভেঙে পড়বেই না, আমার ব্যক্তিগত কাঠামো ভেঙে পড়ার পরও ওই ভয়ঙ্কর নদীটির ওপর ব্রিজটি দাঁড়িয়ে থাকবে, দুই পারের মধ্যে সম্পর্ক রক্ষা করে চলবে; তবু আমার ভয় হয় ব্রিজটি ভেঙে পড়বে, আমি দেখতে পাই ভেতরে ভেতরে এটি জীর্ণ হচ্ছে, এটি ভেঙে পড়ছে। এটি ভেঙে পড়ছে দেখার সময় আমি অন্য কিছু দেখতে পাই, আমার পাড়াটিকে দেখতে পাই। আমি এক ভালো আবাসিক এলাকায়ই থাকি, অধিকাংশেরই গাড়ি আছে, কারো কারো একাধিক আছে; বাড়িও আছে অনেকের, যাদের নেই তাদের শিগগিরই হবে; কিন্তু তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখা যায় তাদের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোটি ভেঙে পড়েছে। হয়তো তারা তা বুঝতে পারে, হয়তো পারে না; কিন্তু ভেঙে যে পড়েছে। কোনো সন্দেহ নেই।
ঘুম থেকে ওঠার পর একবার উত্তরের বারান্দায় যাওয়া আমার অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে, এটি আমার উৎকৃষ্ট অভ্যাসগুলোর একটি; বারন্দায় গেলে সামনের দালানের বারান্দায় বেগম আর জনাব নুর মোহাম্মদকে দেখতে পাই। যদিও তাদের সাথে আমার বিশেষ আলাপ নেই, তবু তাঁদের দেখলে আমার ভালো লাগে; আমি কি তাঁদের দেখার জন্যেই বারান্দায় যাই? তাদের বয়সের ফারাকটি একটু বেশিই; নুর মোহাম্মদ নিশ্চয়ই পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছেন, তবে তাঁর দেহখান বেশ বলিষ্ঠ, বারান্দায় তিনি খালি গায়েই দাঁড়ান, তার বুকের লোমগুলো দেখা যায়; তাকে একটি স্বাস্থ্যবান মোষের মতো দেখায়। বেগম নুর মোহাম্মদ চল্লিশ হবেন, এককালে তিনি একটি ধবধবে হরিণী ছিলেন সন্দেহ নেই, সে-ছাপ রয়ে গেছে তার শরীরে, যদিও তার মুখ ভরে ক্লান্তি নেমেছে। তাঁর মুখে দূর থেকে আমি যা দেখতে পাই, তা কি আসলে ক্লান্তি? না কি। ভোরবেলাকার রোদে আমি ঠিক মতো তাঁর মুখটি দেখতে পাই না? তাঁদের আমি প্রতিদিনই বারান্দায় দেখতে পাই, কিন্তু কখনো তাদের কথা বলতে দেখি না, একজনকে আরেকজনের দিকে তাকাতেও দেখি না। নুর মোহাম্মদ অনেকক্ষণ ধরে। নিজের বুক মালিশ করেন, আর দক্ষিণপশ্চিম দিকে তাকিয়ে থাকেন; আবার কখনো কনুই বারান্দার রেলিংয়ের ওপর রেখে শরীরটা ভেঙে দাঁড়ান, নিচের মাটি দেখেন। বেগম নুর মোহাম্মদ বসেন এক কাপ চা নিয়ে, চায়ের কাপটি তিনি বারান্দার রেলিংয়ের ওপর রেখে বাঁ হাত দিয়ে ধরে রাখেন, কিন্তু চায়ের পেয়ালায় তাকে মুখ দিতে বিশেষ দেখি না, পুব দিকে তিনি তাকিয়ে থাকেন ভাবলেষহীনভাবে। আমি অনেকবার খেয়াল করে দেখার চেষ্টা করেছি তার মুখে কোনো ভাবের আভাস দেখা যায় কি না, তিনি নুর মোহাম্মদ সাহেবের দিকে বিরক্তির সাথেও অন্তত একবারও তাকান কি না, কিন্তু আমি তা দেখতে পাই নি।
