রওশনকে একদিন আমি জিজ্ঞেস করি, রওশন, তুমি কি অসভ্য হতে পারবে?
রওশন বিস্মিত হয়, অসভ্য? অসভ্য কেনো হতে হবে?
আমি বলি, এই যে হাত ছুঁয়ে আমরা আর আগের মতো সুখ পাচ্ছি না।
রওশন বলে, হ্যাঁ, পাচ্ছি না।
আমি বলি, এই যে একবার জড়িয়ে ধরে আমরা আর সুখ পাচ্ছি না।
রওশন বলে, হ্যাঁ, পাচ্ছি না।
আমি বলি, সুখ পেতে হলে আমাদের খুব অসভ্য হতে হবে।
রওশন আমার চোখে গভীরভাবে তাকায়, আস্তে বলে, খুব অসভ্য হতে পারবো আমি তোমার সাথে, তবে আজ নয়, সেই একদিন।
অনেক রাত জেগে আমি পড়তে থাকি; আমার আর কিছু পড়ার নেই, সব মুখস্থ হয়ে গেছে, তবু আমি পড়তে থাকি, চিৎকার করে পড়তে থাকি; কেননা চোখ বুজলেই আমি দেখতে পাই রওশন আর আমি অসভ্য হয়ে গেছি, মাছের মতো পারদের মতো জলের ভেতরে আমরা অসভ্য হয়ে উঠেছি, আমাদের শরীর থেকে মধু ঝরছে, সুধা ঝরছে। আমি দেখতে পাই আমরা জড়িয়ে যাচ্ছি, আমাদের পৃথক করা যাচ্ছে না, আমরা এক হয়ে যাচ্ছি, আমি হারিয়ে যাচ্ছি লাল রঙলাগা চাঁদের ভেতরে, গোলাপকুঁড়ির ভেতরে, একখণ্ড মেঘের ভেতরে। আমি আর আমাকে খুঁজে পাচ্ছি না। পারদ জলের। ভেতরে রওশনের চুল ছড়িয়ে পড়েছে, মাছের মতো আমি আটকে যাচ্ছি রওশনের চুলের জালে, শ্যাওলায়, কচুরিপানায়, শৈবালে। রওশন বলেছে সে আমার সাথে খুব অসভ্য হতে পারবে, খুব অসভ্য হতে পারবে, আমার সাথে, শুধু আমার সাথে।
প্রবেশিকা পরীক্ষাটি আমি খুবই ভালো দিই, এতো ভালো দেবো আগে ভাবি নি, রওশনের জন্যেই আমি এতো ভালো দিই-রওশন গর্ব করবে আমাকে নিয়ে। আমি ছাড়া আর গর্ব করার রওশনের কী আছে। রওশন সুন্দর, তা নিয়ে সে গর্ব করতে পারে; কিন্তু রওশন যে সুন্দর তা তো আমার গর্ব। আমি যাকে ভালোবাসি, সে সুন্দর; এটা আমার গর্ব। রওশন গর্ব করবে আমাকে নিয়ে। আট দিন পর মুনশিগঞ্জ থেকে ফিরে। বিকেলে আমি রওশনদের বাড়ি যাই। আমি অবাক হই, আর আমার খারাপ লাগে যে রওশন বাঁধানো কবরের পাশে নেই। আমি বসার ঘরে ঢুকি, কিন্তু রওশন নেই। শওকত আমাকে দেখে দৌড়ে আসে।
শওকত বলে, রওশন মারা গেছে।
আমি চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠি, কী বলছো তুমি?
শওকত হাসে, তুমি এসেছো আর রওশন এ-ঘরে নেই, এতে বুঝতে পারছো না যে রওশন মারা গেছে?
আমি বলি, সত্যি করে বলো কী হয়েছে?
রওশনের মা ঘরে ঢুকছেন দেখে আমি অবাক হই, তিনি তো কখনো এ-ঘরে আসেন না। আমি দাঁড়িয়ে সালাম দিই। তিনি আমার চুলে হাত বুলিয়ে দোয়া করেন। শওকতকে চলে যেতে বলে তিনি চেয়ারে বসেন, এবং রওশনকে ডাকেন। রওশন তাঁর ডাক শুনে এসে দাঁড়ায়।
রওশনের মা বলেন, বাবা, তুমি একবার রওশনকে দেখো।
আমি রওশনের দিকে তাকাতেই রওশন দু-হাতে মুখ ঢেকে হুহু করে কেঁদে ওঠে, দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
রওশনের মা বলেন, বাবা, তোমাকে ছেলের মতো পেলে আমাদের সুখের সীমা থাকতো না, রওশনেরও সুখের সীমা থাকতো না।
আমি মাথা নিচু করে কান্না চাপতে থাকি।
রওশনের মা বলেন, তা তো হওয়ার নয়, রওশন বড়ো হয়েছে, আর তোমার অনেক লেখাপড়া বাকি।
আমি কেঁদে ফেলি।
তিনি বলেন, রওশনের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, তুমি ওকে দোয়া কোরো।
রওশনের মাকে সালাম দিয়ে টলতে টলতে আমি বেরিয়ে আসি।
আমি নদীর দিকে হাঁটতে থাকি
আমি নদীর দিকে হাঁটতে থাকি, আমি বুঝতে পারি না কোন দিকে হাঁটছি, নদীর দিকে না অন্ধকারের দিকে, আমার খুব কষ্ট হয়, কাঁদতে ইচ্ছে হয়, সূর্য ডুবছে নদীতে, আমার ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে হয়, আর কি সূর্য উঠবে, আমি কিছু দেখতে পাই না, সবুজ গাছগুলোকে কালো মনে হয়, আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি, রওশনের মুখটি আমি মনে করতে চাই, মনে করতে পারি না, কিছুই আমি মনে করতে পারি না, আরেকবার রওশনকে দেখতে ইচ্ছে হয়, রওশন বাঁধানো কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, আমি আর বাড়ি ফিরবো না, অনেক দূরে কোথাও চলে যাবো, আমাকে কেউ আর দেখতে পাবে না, রওশনকে নিয়ে আমার পালিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়, যেনো আমি রওশনদের বাঁশবাগানে গিয়ে দাঁড়িয়েছি, রওশন আমাকে দেখতে পেয়েছে জানালা দিয়ে, পালিয়ে চলে এসেছে রওশন, আমরা নৌকোয় উঠে ভেসে চলেছি, আমরা নিজেদের জড়িয়ে ধরে কাঁদছি। কিন্তু আমি সন্ধ্যায়ই বাড়ি ফিরি, যেমন আগে ফিরতাম। আমি খুব শূন্য বোধ করি, রওশনই আমাকে প্রথম দেয় শূন্যতার বোধ। আমি কি ভেঙে পড়বো, পনেরো বছর পাঁচ মাসের আমি নিজেকে বারবার প্রশ্ন করি, আমি কি ভেঙে পড়বো? আমার ইচ্ছে হয় ভেঙে পড়তে। কে যেনো আমার ভেতর থেকে বলে, না। ঘুমোতে আমার কষ্ট হয়, আমি ঘুমোতে পারি না, আমি ঘুমোতে জানি না; চোখ বুজলেই আমি একটি লোককে দেখতে পাই, যাকে আমি কখনো দেখি নি, লোকটি রওশনের ব্লাউজ খুলছে, আমার রক্ত জ্বলছে, দুটি লাল রঙলাগা চাঁদ বেরিয়ে পড়ছে, আমি দেখতে পাই লোকটি রওশনের লাল রঙলাগা চাঁদ ছুঁচ্ছে, কালো হাত দিয়ে রওশনের চাঁদ দুটিকে পিষছে লোকটি, আমি কেঁপে উঠি, ঘুমোতে পারি না; আমি দেখতে পাই লোকটির হাত আরো নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে, লোকটি রওশনের শাড়ি সরিয়ে দিচ্ছে কালো হাত দিয়ে, রওশন নগ্ন, লোকটি একখণ্ড মেঘ দেখতে পাচ্ছে রওশনের, মেঘের আড়ালে লোকটি সোনার খনি খুঁজছে, আমি দেখতে পাই লোকটি উলঙ্গ হচ্ছে, লোকটি রওশনের সাথে অসভ্য কাজ করছে, অমি নিঃশব্দে চিৎকার করে উঠি, একবার মনে হয় রওশন লোকটিকে সহ্য করতে পারছে না, সে বাধা দিচ্ছে লোকটিকে, আমার একটু ভালো লাগছে, কিন্তু রওশন লোকটিকে ফেরাতে পারছে না, লোকটি অসভ্য কাজ করছে, রওশন শুধু শুয়ে আছে চিৎ হয়ে, পরমুহূর্তেই আমার মনে হয়, আমি দেখতে পাই, রওশনের ভালো লাগছে; রওশন লোকটিকে চুমো খাচ্ছে, লোকটিকে রওশন জড়িয়ে ধরছে নিজের লাল রঙুলাগা দুই চাঁদের মধ্যে, লোকটি উলঙ্গ হয়ে রওশনকে পা ছড়াতে বলছে, আমি দেখতে পাই, সুখের ঘোরে পা ছড়িয়ে দিচ্ছে রওশন, লোকটি রওশনের মেঘের ভেতরে ঢুকছে, রওশন চোখ বন্ধ করে সুখে জড়িয়ে ধরছে লোকটিকে, রওশন কেমন শব্দ করছে, আমি দেখতে পাই রওশন লোকটির তালে তালে শরীর দোলাচ্ছে, রওশনের যৌবন সুধা পান করছে লোকটি, রওশন তাকে আরো সুধা পান করতে দিচ্ছে, লোকটি রওশনের যৌবন সুধা রাতভর পান করছে দিনভর পান করছে, আমি নিঃশব্দে চিৎকার করে উঠি, আমি ঘুমোতে পারি না, মনে মনে বলতে থাকি, রওশন, তুমি বলেছিলে আমিই পান করবো তোমার যৌবন সুধা, আমার সাথেই তুমি করবে অসভ্য কাজ, তুমি কথা রাখে নি, আমিও কথা রাখবো না; আমিও অসভ্য কাজ করবো, আমিও যৌবন সুধা পান করবো, তখন তুমিও ঘুমোতে পারবে না।
