জানো, রওশন খুব আস্তে বলে, শুধু হাত ধরে আর সাধ মিটছে না।
আমারও, আমি বলি, হাত ধরেও মনে হয় আমরা অনেক দূরে।
কী অবাক কাণ্ড না! রওশন বলে, একদিন তো হাত ধরেই সুখে গলে যেতাম, আর এখন মনে হয় কী যেনো চামড়ায় এসে আটকে যাচ্ছে, বেরোতে পারছে না!
শওকত এসে ঢোকে এমন সময়, আমরা বীজগণিত নিয়ে আলোচনা শুরু করি। রওশন খুব আগ্রহের সাথে বীজগণিত শিখতে থাকে। শওকত চলে যায়, আমরা আবার আমাদের বিস্ময় নিয়ে বিস্মিত হতে থাকি।
কী যে করি, কী যে করি, রওশন বলে, কী করলে যে মনে হবে তোমাকে ধরে আছি!
আমার ইচ্ছে করে, আমি বলি, আমার আর তোমার আঙুল কেটে আমার আঙুলের রগ তোমার আঙুলের রগের সাথে জোড়া দিয়ে দিই।
রওশন বলে, সেই ভালো, সেই ভালো; তাহলে আমাদের রক্ত মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে, আমাদের সাধ মিটবে।
তবে এ-পদ্ধতি সম্ভবপর বলে মনে হয় না; আমাদের মাত্র পনেরো বছর বয়স হলেও আমরা বুঝতে পারি আঙুল আর রগ কাটাকাটি বিচ্ছিরি কাণ্ড ঘটাবে, রগ জোড়া দেয়ার আগেই রক্তে আর আমাদের চিঙ্কারে চারদিক ভরে উঠবে। রওশন তখন নতুন একটি পদ্ধতি প্রস্তাব করে।
রওশন বলে, একটি কাজ করতে পারি, প্রতিদিন আমরা একবার নিজেদের জড়িয়ে ধরবো।
কেউ যদি দেখে ফেলে? আমি বলি।
রওশন খুব চিন্তিত হয়, বলে, তার সম্ভাবনা আছে।
তাহলে কী করবো? আমি বলি।
খুব সাবধানে দেখেশুনে নিতে হবে, রওশন বলে, একটু জরিপ করে নিতে হবে। জরিপটা আমিই করবো।
তাহলে সুখ লাগবে না, আমি বলি।
ঠিকই, রওশন বলে, তবে যেদিন সুযোগ পাবো, সেদিন। একটু পর রওশন বলে, আচ্ছা, এর কোনো দেবতাটেবতা নেই, যে একটু সুযোগ করে দিতে পারে? না হয়। বিকেলবেলা আমরা হিন্দুই হয়ে যাবো।
একটি আছে বলে আমি শুনেছি, আমি বলি, তবে সেটা সুযোগ করে দিতে পারে, শুধু তীর ছুঁড়তে পারে।
তাই হবে, রওশন বলে, আমার শরীরে অনেক তীর ফুটছে বলে মনে হচ্ছে।
রওশন একটু জরিপ করতে যায়, আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে আলমারিটার। কোণায়; এবং ফিরে এসেই জড়িয়ে ধরে আমাকে, সাথেসাথে দূরে সরে যায়।
না, এতে মন ভরলো না, রওশন বলে।
একটু ব্যায়াম হলো, আমি বলি; আর রওশন খিলখিল করে হেসে ওঠে।
তুমি একটু ভেবো, রওশন বলে, একটি উপায় বের কোরো, এটাই আমার প্রথম বায়না তোমার কাছে।
কোনো উপায় বের করতে পারি না আমি, রওশনের প্রথম বায়নাটি আমি বোধ হয় রাখতে পারবো না; আমার শুধু মনে হতে থাকে আমাদের রক্ত আর মাংস অসভ্য হয়ে। উঠছে, খুব অসভ্য হয়ে উঠতে চাইছে। আমি ভয় পেতে থাকি আমি বোধ হয় আর রওশনের মুখের দিকে চিরকাল তাকিয়ে থাকতে পারবো না, শুধু রওশনের হাসি দেখেই আমার বুক সুখে ভরে উঠবে না; রওশনও শুধু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আর আমার কথা শুনে শুনে সুখে ভরে উঠতে পারবে না। আমরা বদলে যাচ্ছি, আমাদের সুখ বদলে যাচ্ছে, আমাদের রক্ত বদলে যাচ্ছে, আমাদের মাংস বদলে যাচ্ছে। সুখ চিরকাল একরকম থাকে না কেনো, চিরকাল একইভাবে কেনো সুখ পাওয়া যায় না! আমাদের কি কেউ অভিশাপ দিয়েছে দেবতাটেবতা বা ফেরেশতাটেরেশতা কেউ কি আকাশ থেকে দেখতে পেয়েছে আমরা হাতে হাত রেখে খুব সুখ পাই, দেখে তাদের খুব ঈর্ষা হয়েছে; এবং অভিশাপ দিয়েছে তোমরা আর শুধু হাত ছুঁয়ে সুখ পাবে না, শুধু। মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে সুখ পাবে না? আমার তাই মনে হয়; তাদের অভিশাপে। আমাদের রক্ত জ্বলছে মাংস পুড়ছে; নিজেদের পোড়া রক্তমাংসের গন্ধে আমাদের জগত ভরে উঠছে। রওশন আমাকে বলেছে তার মাংস জ্বলে, রক্ত পোড়ে; আমিও বোধ করছি আমার মাংস পোড়ে রক্ত জ্বলে। সেখান থেকে অসহ্য সুগন্ধ উঠছে। কয়েক মাস আগে আমি একটি উপন্যাস পড়েছিলাম, আমার মনে পড়ে, তাতে এক জায়গায় লেখা ছিলো, তাহারা চুম্বন করিল। পড়ে আমার রক্ত ঝনঝন করে উঠেছিলো। ঠিক রওশন ও আমার মতোই ওই উপন্যাসের নায়কনায়িকার রক্ত আর মাংস জ্বলছিলো পুড়ছিলো; চুম্বন করে তাদের শরীর ঠাণ্ডা হয়েছিলো। রওশনকে আমি সে-কথা বলি; রওশন প্রথম লজ্জা পায়, কিন্তু আমরা দুজন বুঝে উঠতে পারি না চুম্বন কীভাবে করতে হয়। আমি বলি চুম্বন গালে করতে হয়, ঠোঁট আস্তে গালে ছোঁয়ালেই চুম্বন হয়; রওশন বলে চুম্বন হাতের উল্টোপিঠে করতে হয়। আমরা কয়েক দিন ঠোঁট দিয়ে গাল আর হাত স্পর্শ। করি; প্রথম আমাদের একটু অদ্ভুত অনুভূতি হয়, কিন্তু পরে তা আর যথেষ্ট মনে হয় না; আমরা যা চাই, আমাদের রক্ত যা চায়, তা ওই চুম্বন নয়।
আমাদের শরীরের ভেতর কী আছে, আমাদের রক্তে আর মাংসে এখন কী জমছে? সুধা না বিষ? রওশন বলে তার মনে হচ্ছে তার রক্তে বিষ জমছে, তবে অন্য রকম বিষ, এমন এক ধরনের বিষ, যা খুব মধুর, যা খুব মিষ্টি, যাতে মানুষ মরে না, মানুষ পাগল হয়ে ওঠে। আমারও তাই মনে হয়। রওশনকে আমি মনে করিয়ে দিই রওশন একবার লিখেছিলো যে আমিই পান করবো তার যৌবন সুধা। রওশন বলে যখন সে লিখেছিলো তখন সে পুরোপুরি বুঝতে পারে নি সে কী লিখছে। রওশন ভুলো না আমায় নামের একটি বইতে কথাটি পেয়েছিলো, পড়ে রওশনের ভালো লেগেছিলো, রওশনের শরীর কেমন করে উঠেছিলো, অনেক দিন ধরে কথাটি রওশনের মনের ভেতরে গানের মতো বাজছিলো, আর চিঠিতে ওই কথাটি লিখে রওশন সুখ পেয়েছিলো। এখন রওশনের মনে হচ্ছে তার শরীরে সুধা জমছে, আমার মনে হচ্ছে আমার শরীরেও সুধা জমছে; একদিন আমরা ওই সুধা পান করবো। সে-একদিন কতো দূর? অনেক দূর? ততো দিন কি আমরা বাঁচবো? পিপাসায় আমরা মরে যাবো না? আমাদের বেঁচে থাকতেই হবে, আমরা প্রাণ ভরে পান করবো আমাদের সুধা। তখন আমাদের অসভ্য মনে হবে না, আমাদের সুধা তো আমাদেরই পান করতে হবে। রওশনকে আমি একটি কথা কিছুতেই বলতে পারছি না, রওশন আমাকে অসভ্য ভাববে, তাই বলতে পারছি না। আমি এক সময় নিজের শরীর থেকে মধু আহরণ করতাম, মধুর চাক ভেঙে সুখে ক্লান্তিতে ভরে যেতাম। সেভাবেই আমাদের মধু আহরণ করতে হবে, নিজের শরীর থেকে নয়, পরস্পরের শরীর থেকে; রওশনের মধুর চাক ভাঙবো আমি, আমার মধুর চাক ভাঙবে রওশন; রওশনের সুধা পান করবো আমি, আমার সুধা পান করবে রওশন। আমাদের। শরীর বেয়ে বেয়ে সুধা ঝরতে থাকবে, আমার মুখ থেকে সুধা ঝরবে, রওশনের মুখ থেকে সুধা ঝরবে; সুধায় আমাদের শরীর ভিজে যাবে, বালিশ ভিজে যাবে, বিছানা ভিজে যাবে; আমাদের শরীরের প্রতিটি ছিদ্র দিয়ে সুধা ঝরতে থাকবে। সুধা পান করতে হলে অসভ্য হতে হবে আমাদের। খুব অসভ্য, অত্যন্ত অসভ্য, জঘন্য অসভ্য হতে হবে। আমাদের। সবাই অসভ্য হয়; আদম-হাওয়াও অসভ্য হয়েছিলো। আমার আজ মনে। হচ্ছে আমি পারবো অসভ্য হতে, কিন্তু রওশন কি পারবে?
