আমাদের জন্যে রেখে দেবো, রওশন বলে।
সেই ভালো, আমি বলি।
রওশন বলে, তোমাকে আমার জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে।
একবার আমরা জড়িয়ে ধরি আমাদের? আমি বলি।
না, আজ নয়, আজ নয়, সেই একদিন, রওশন বলে।
রওশন সালোয়ারকামিজ পরতে থাকে; আমিও কাপড় পরি, এবং চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকি।
চোখ খোলো, রওশন বলে।
চোখ খুলে আমি রওশনের দিকে তাকাই, রওশন হেমন্তের কাশবনে চাঁদের আলোর মতো হাসে; চাঁদের মতোই সুদূর মনে হয় রওশনকে; আমি সিঁড়ির দিকে হাঁটতে থাকি, সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামি, দরোজা খুলে বাইরে বেরোই; সব কিছু আমার অচেনা লাগে। ওই নারকেল গাছ আমি আগে দেখি নি, এই মাটি আমি আগে দেখি নি, বাতাসের এমন ছোঁয়া আমি আগে পাই নি। আমি পেছনের দিকে ফিরে তাকাই একবার, দেখি। বারান্দায় রেলিংয়ের ওপর ঝুঁকে রওশন তাকিয়ে আছে। আমি নদীর দিকে হাঁটতে থাকি, আমি কিছু দেখতে পাই না; নদীর পারে এসে দেখি রওশনের শরীরের মতো পদ্ম বয়ে চলছে।
আমি কয়েক দিন রওশনদের বাড়ি যাচ্ছি না, তবে যাচ্ছি না আমার এমন মনে হচ্ছে না , মনে হচ্ছে আমি রওশনের সাথে দোতলায় রয়েছি, রওশন দেখছে আমাকে আমি দেখছি রওশনকে; যা তখন আমি দেখতে পাই নি এখন দেখতে পাচ্ছি, রওশনের গ্রীবার নিচের লাল তিলটিকে মনে পড়ছে, তিলটিকে একটি নাম দিতে ইচ্ছে করছে, ওর নাম লাল শুকতারা; আলতাভ দুটি বৃত্ত আমার চোখের সামনে ঘুরছে, রওশনের চাঁদের শীর্ষে গোলাপকুঁড়ি, দুটি চাঁদের শীর্ষে দুটি গোলাপকুঁড়ি, আলতাভ বৃত্ত ঘিরে আছে কুঁড়ি। দুটিকে; একখণ্ড মেঘের কথা মনে পড়ছে, হাল্কা মেঘ, আকাশের এককোণে ভিড়ে আছে; তবে আমি তাকালেই লাল রঙলাগা চাঁদ দেখছি চোখ বন্ধ করলেই লাল রঙলাগা চাঁদ দেখছি। প্রত্যেক বিকেলে বেরোই, কিছু দূর হটি রওশনদের বাড়ির দিকে, তারপর লাল রঙলাগা চাঁদ দেখতে দেখতে নদীর দিকে চলে যাই, ধানখেতের দিকে যাই, এক দিন বাজারেও গিয়ে চা খাই। শওকত আজ এসেছে, শওকত আমাকে ওদের বাড়ি যেতে বলছে না, ও ভীষণ দুষ্ট, যেতে বলবে না, কিন্তু আমাকে আজ যেতে হবে।
শওকত বাড়ি যাবে না এখন, আমাকে একলাই যেতে হবে।
বাঁধানো কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে রওশন, যেখানে রওশনকে না দেখলে আমি অন্ধকার দেখতাম। রওশন খুব গম্ভীরভাবে দাঁড়িয়ে আছে, এমন গম্ভীর আমি রওশনকে কখনো দেখি নি। গম্ভীরভাবেও রওশন সুন্দর।
তুমি কেমন আছো? আমি জিজ্ঞেস করি।
তুমি কেমন আছো? রওশন বলে।
আমরা দুজনে বসার ঘরে ঢুকি, আমি আমার চেয়ারটিতে বসি, এবং হাত বাড়িয়ে রওশনের হাত ধরি।
তুমি আমাকে ভুলে গেছো, রওশন বলে, আমি তোমাকে ভুলি নি।
আমিও ভুলি নি, আমি বলি।
তাহলে কেনো আসো নি? রওশন বলে।
আমি পাগল হয়ে গেছি, আমি হেসে হেসে বলি, একমাত্র পাগল পূর্ব পাকিস্থানে।
পাগল হলে তো সেদিনই আবার আসতে, রওশন এবার হাসে, আমার বুকে ঝলক দিয়ে রোদ ওঠে। রওশন আমার মুঠো ধরে জোরে টান দিয়ে বলে, পাগল হলে। সেদিনই কেনো হলে না? আমার সামনেই কেনো হলে না? পাগল হলে তোমাকে কেমন লাগে আমি দেখতাম!
তখন পাগল হলে তোমার খুব বিপদ ছিলো, লাফিয়ে হয়তো জানালা দিয়ে বাঁশঝাপের ভেতর পড়ে যেতাম, তখন তোমার অনেক কষ্ট হতো, আমি বলি।
কোনোই কষ্ট হতো না, রওশন বলে, আমিও তোমার সাথে বাঁশঝাপে লাফিয়ে পড়তাম, খুব চমৎকার হতো! সবাই এসে দেখতে আমরা দুজন ঝুলে আছি!
তারপর তুলে এনে একসাথে কবর দিতো, আমি বলি।
পাগল হলে, রওশন বলে, মানুষ নাকি বিড়বিড় করে নানা কিছু বলে, চোখের সামনে নানা কিছু দেখে; আচ্ছা, তুমি কী বলছো আর কী দেখছো?
আমি দিনরাত বলছি লাল শুকতারা, লাল শুকতারা, আর দেখছি লাল শুকতারা, আমি বলি।
লাল শুকতারা? রওশন বলে।
আমি নাম দিয়েছি, আমি বলি।
কার? রওশন জানতে চায়।
তোমার গ্রীবার নিচের লাল তিলটির, আমি বলি।
রওশন কোমলভাবে তাকায়, বলে, আর কী দেখছো?
গোলাপকুঁড়ি, আমি বলি।
রওশন আরো নিবিড়ভাবে আমার হাত ধরে আমার চোখের ভেতরে তার চোখের
সমস্ত আলো আর ছায়া স্থির করে জিজ্ঞেস করে, আর?
লাল রঙলাগা চাঁদ, আমি বলি। রওশন আরো শক্ত করে আমার মুঠো ধরে বলে, আর?
আকাশের কোণে একখণ্ড মেঘ, আমি বলি।
রওশন আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমাকে ভালোবাসি, মাহবুব।
আমাদের যেনো কী হয়েছে, খুব গভীর কিছু একটা হয়েছে মনে হচ্ছে, নইলে এমন হবে কেনো, আমাদের এমন লাগবে কেনো? আগে তো আমরা হাতে হাত রেখে খুব। সুখে ছিলাম, এতো সুখে ছিলাম যা কখনো কেউ থাকে নি। কিন্তু এখন শুধু হাত ধরে কেনো সাধ মেটে না? রওশন এটাও প্রথম আবিষ্কার করে, বা রওশনই প্রথম। এ-আবিষ্কারটি প্রকাশ করে, তাই এর কৃতিত্ব তারই প্রাপ্য। আমিও যে বোধ করি নি, তা নয়; কিন্তু প্রকাশ করি নি; রওশন কী মনে করবে, এমন এক দ্বিধা আমার মনে থেকেই যায় সব সময়; কিন্তু রওশনের কোনো দ্বিধা নেই, সত্যকে সে সত্যের মতোই প্রকাশ করে-আমার কাছে। আমি কি একটু কপট? পনেরো বছরেই? পুরুষ হলে কি একটু কপট হতে হয়? দোতলার দিন আমি বুঝতে পারি নি আমাদের শরীর নিয়ে। আমরা কী করবো, যদিও আমি অনুভব করি যে আমাদের শরীর নিয়ে কিছু একটা আমাদের করার কথা। আমার অনেক ভাবনাই আজকাল আমাকে অবাক করে দিয়ে, অনেক সময় ভীত করে দিয়ে, বদলে যাচ্ছে; এক সময় আমি ভাবতাম রওশন আর। আমি চিরকাল শুধু মুখোমুখি হাত ধরে বসে থাকবো, রওশন হাসবে আমি দেখবো, আমি কথা বলবো রওশন শুনবে, আমরা আর কিছু করবো না, আমরা কখনো অসভ্য হবো না। কিন্তু আমার দিন দিন ভয় হচ্ছে আমরা হয়তো অসভ্য না হয়ে পারবো না; অন্যদের মতো আমরাও অসভ্য হয়ে যাবে। তবে অসভ্য কীভাবে হতে হয় আমি পুরোপুরি জানি না, রওশনও হয়তো জানে না; কিন্তু একদিন আমি জেনে নিশ্চয়ই ফেলবো কীভাবে সত্যিকার অসভ্য হতে হয়, রওশনও জানবে; তখন হয়তো আমাদের সব সময় অসভ্য হতে ইচ্ছে করবে। রওশনই প্রথম প্রকাশ করে যে হাত ধরে আর সাধ মিটছে, কিন্তু হাত ধরা ছাড়া আর কী করলে সাধ মিটবে, তা বুঝতে পারছে না। রওশন; এবং আমিও বুঝতে পারছি না।
