ডঃ কদম রসুল ভাইর জন্যে আমরা জনগণরা কাঁদবো না হাসবো, বুঝতে পারি না। অতো বড়ো একটা অইধ্যাপক আছিলেন, তারপর অ্যাতনা বড়ো একটা পলিটিশিয়ান হইলেন, দ্যাশরে ধইন্য করলেন। ওই ডঃ কদম রসুল সাহেবকে হারামজাদারা শ্লোগান দিয়ে তিন দিনের জন্যে হাজতে ঢুকিয়ে দিলো, কিন্তু আটকে রাখতে পারে নি; পারবে কেননা, সব ঠিকঠাক করে রাখেন নি? প্রাইমারি ইস্কুল হইতে চোখবান্ধা মাইয়ালোকটা পর্যন্ত? ওই কানা মাইয়ালোকটা কাগো? সব ঠিকঠাক আছে, তাগো আটকাইয়া রাখনের কোনো উপায় নাই। পাঁচ মিনিটে বের হওয়ার ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে বাট্রাকসমিতির প্রেডিডেন্ট, ইটের ভাটার মালিক, টাউটগুলিরে বসাই দিছেন; এখন সবাই আগাম নিয়ে রাখছেন, তাগো আটকায় কে? আর সেই জাগায় তো বইসা আছেন তাগোই লোক, আলহজ আলফাজ মাঝিরে তো সেইখানেই বসাই রাখা হইছে, এত দিন পর তরে রাজা কইর্যা দেয়া হয়েছে, খামখা রাখন হয় নাই, তিনি কলকাঠি লাড়বেন। দরকার হইলে এমন কলকাঠি লাড়াইবেন যে সব কিছু পইড়া যাইবো, নাদিরশারা দলে দলে দেখা দিবো, মঙ্গোলিয়ার ক্যাডাররা ছুটে আসবো।
ডঃ কদম রসুল মুক্তি পাওয়ার পর গাঁদাফুলে ঢেকে তাকে ছোড়োখালো শেক মজিবের মতো বের করে নিয়ে এলাম আমরা (এই দ্যাশে জাল থেকে যে-ই বাইর হয় সে-ই ছোডোখাডো শেক মজিবের মতো বাইর হয়, সে-ই সবার মডেল), অর্থাৎ আমরা যারা শক্তির উৎসবাদী রাজবংশের; শহরের দশটা না বিশটা রাস্তা বন্ধ করে। দিলাম, এর পর শহরের আর থাকে কী, মহাদেশনেত্রী আর তাঁর অমর সেনাপতি আর কদম রসুল আর অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পল্টর নামে শ্লোগান দিয়ে আমরা শহর ফাটিয়ে। জানিয়ে দিলাম যে তাদের আটকে রাখার মতো কোনো খোয়াড় নেই; আর এমন বেয়াদবি করলে সব কিছু উল্টেপাল্টে দেয়া হবে। তাঁহাদের গায়ে একটা ফুলের টোকাও দেয়া চলবে না।
ডঃ কদম রসুল তাঁর মন্ত্রণালয়ে পরিণত হয়েছিলেন কিংবদন্তিতে (তবে তিনি একা কিংবদন্তি নন, বাঙলাদেশি গিনিজ রেকর্ডসে আরো বহু সোনার নাম সোনার কালিতে ছাপা আছে)।
তিনি ছিলেন মাঝারি আর নিম্ন আমলাগুলোর নিরন্তর আলাপের আনন্দ।
স্যারেরা খান, খাওনের জন্যইতো স্যারেরা আসেন, কিন্তু এই বাস্টার্ডের পোর খাওন দেইখ্যা তাজ্জব হইয়া যাই, বোয়াল মাছের মতো খালি গিলে।
বাস্টার্ডটা বিশ বচ্ছর কলেজের মাস্টার আছিলো, কিন্তু খাওনে গিলনে চোরা পলিটিশিয়ানগুলিরে ছারাইয়া গেছে। মাস্টারগুলির খিদা বেশি, আগে তো খাওনের সুযোগ পায় নাই, পরেও পাইবো না।
বউর নামে তিনশো কোটি, মাইয়ার নামে একশো কোটি, পোলাগো নামে দুইশো কোটি; দুইটা মিস্ট্রেসের নামে দুই কোটি। গাজিপুরে দুইশো একর, সাভারে একশো একর। আর কয় দিন সময় পাইলে সবগুলি রেলগাড়ি, ইস্টিশন আর জংশনই খাইয়া ফেলবো।
ডঃ কদম রসুল সব খাওয়ার আগেই জনগণ তাদের ফেলে দেয়; অনেকের মতো কদম রসুল কয়েক দিন পালিয়ে থাকেন।
ডঃ কদম রসুলের মুক্তি উপলক্ষে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাস্তাভাঙা সংবর্ধনার পর জেনারেল। কেরামতউদ্দিন বিশেষ পার্টির আয়োজন করেছেন গাজিপুর রেস্টহাউজে। এখান থেকে তিনি তাঁর কলকারখানা ব্যবসাবাণিজ্য গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজগুলো দেখেন, এবং আরো অনেক কিছু দেখেন নিবিড় অন্তরঙ্গ উন্মুক্তভাবে; এবং বিশেষ রাজনীতি আলোচনা হয় এখানেই। পার্টিতে এসেছেন প্রধান রাজপুরুষেরা।
একটু পানাহার একটু নৃত্যগীত আর প্রচুর রাজনীতি পার্টির উদ্দেশ্য। বিবেচনা আলোচনার প্রধান বিষয় টাকাপয়সাগুলো–ওই যে পাঁচ বছরে সামান্য কয়টা পয়সা তারা করেছেন, যতোটা ইচ্ছে ছিলো ততোটা পারেন নি, ওই ময়লা সিকি আধলি আর ছেঁড়া এক টাকার নোটের ওপর শকুনের মতো চোখ পড়ে আছে শয়তানগো, তাগো মাঝেমইধ্যে খোয়াড়ে ঢোকানোর চেষ্টা চলছে, এই ব্যাপারটি ক্যামনে ট্যাকেল করা যায়, কীভাবে ওগুলোকে দেখিয়ে আর শিখিয়ে দেয়া যায়, তার ফর্মুলা বের করার জন্যেই এই পার্টি। ফর্মুলাটা বের করতে না পারলে দেশে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়বে, আসলে বিপন্ন হইয়া পড়ছে, দেশ বিক্রি হইয়া যাইবো হিন্দুগো কাছে; অবশ্য পাকিস্থানি মুসলমান ভাইগো কাছে হইলে অন্য কথা, তবে সেই বেচাকেনাটা তারা করবেন।
বাগানের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে লতা আর পুষ্পঘেরা একটি কুঞ্জের নাম লাইলি। তাঁরা শীততাপনিয়ন্ত্রণ যেমন পছন্দ করেন, লতাপুষ্পও পছন্দ করেন; এই কালে নেচারকে যারা ভালোবাসে না, তারা মানুষ না, তারা পৃথিবীর ওজনলেয়ার ফাটাইয়া দিতে চায়। জেনারেল কেরামতই লাইলি নামটি রেখেছেন; এবং গুল্মের অক্ষরে কুঞ্জের প্রবেশ পথেই নামটিকে পুষ্পিত গুস্মিত করে রেখেছেন তিনি। এটি জেনারেল কেরামতের কুঞ্জপানশালা।
সবাই অল্প অল্প পানাচ্ছেন, আর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করছেন।
ডঃ কদম রসুলের শরীরটা র্যাদনা করছে, একটু জ্বরজ্বরও লাগছে; সংবর্ধনার ফলে জ্বরটা একটু কমেছে, গাঁদা ফুলের রসে ব্যথাটাও একটু কমেছে, স্কচে আরেকটু কমছে; তবু তিনি জ্বরটা আর ব্যাদনাটা ভুলতে পারছেন না। তাঁর ভয় লাগছে রাত বাড়লেই হয়তো কেউ তাকে গুতোতে পিষতে ডলতে আসবে।
ডঃ কদম রসুল প্রথম মুখ খোলেন, বলেন, আমার শ্রদ্ধেয় ন্যাতারা, রেসপেক্টেবল ভাইরা, আপনেগো কাছে আমি এভার গ্রেটফুল অল্প সময়ের মইধ্যে আমারে বাইর কইর্যা আনছেন বইল্যা, কবর যাওন পর্যন্ত গ্রেটফুল থাকবো; দেরি হইলে আমার অসুবিধা হইতো, মইরা যাইতাম।

চমৎকার খুব ভাল লাগলো