হামিদ মিয়া বলেন, কাউলকা আমি অগো কইলজার ভিতরে ডর লাগাই দিমু। চাইরপাশ পোরাইয়া দিমু; অরা আমারে সরাই দিতে চায়, মানুষ চিনে নাই।
মোঃ হামিদ মিয়া উত্তেজিত হয়ে ওঠেন, গলায় তার আগুন জ্বলতে থাকে, বস্ত্র গমগম করে উঠতে চায়, তিনি বাঁশের কেল্লার দিকে এখনই পা বাড়াতে চান।
রাতেই খবর নিয়ে জানা যায়
রাতেই খবর নিয়ে জানা যায় কয়েকটি লোক মোঃ হামিদ মিয়ার বাসায় বেশ কয়েকবার তার খোঁজ করেছে; তাদের চোখমুখ দেখে ও কথা শুনে ভালো লাগে নি। হামিদ মিয়ার স্ত্রী ছমিরন বেগমের, তাদের ফিসফিস কথাও তার কানে এসেছে; এবং তিনি খুব উদ্বেগে আছেন। হামিদ মিয়া কোথায় আছেন, তা দেখার জন্যে ছেলেকে নিয়ে তিনি নিজেই চলে এসেছেন স্পাইদের সাথে। তিনি এখন একজন নেতার স্ত্রী, তার উদ্বেগ আর রাজনীতিবোধও নেতার স্ত্রীর মতোই তাঁর কিশোর ছেলেটি ও তিনি এই প্রথম পাজেরোতে উঠেছেন, তাঁদের বাসা পর্যন্ত পাজেরো যেতে পারে নি বলে কষ্ট পেয়েছেন ছমিরন বেগম ও তার ছেলেটি–লোকরা দেকতে পাইল না তারা কোন গাড়িতে চরছে; কিন্তু পাজেরোতে বসে রাস্তা দেখতে তাদের ভালো লাগে, পথের মানুষগুলোকে ময়লা পোকামাকড় মনে হয়, এবং নিজামউদ্দিন আহমদের বাড়িতে ঢোকার সময় তাদের মনে একরকম অলৌকিক আবেগ জন্মে, যার ভার বহন করা তাদের পক্ষে বেশ কঠিন হয়, তাঁদের বক্ষে বেদনা অপার হয়ে ওঠে।
নিজামউদ্দিন আহমদ ও মোহাম্মদ আবদুল হাই খুব সম্মানের সাথে মোঃ হামিদ মিয়ার স্ত্রী ছমিরন বেগম ও তাদের পুত্রটিকে ড্রয়িংরুমে এনে বসান, বডিগার্ডরা তাঁদের ঘিরে থাকে, বডিগার্ডদের দেখতে ভালো লাগে ছমিরন বেগমের ভেতর থেকে তাদের। জন্যে প্রচুর খাবার আসে। আবার অলৌকিক আনন্দের আর কোন স্বর্গ থেকে ভেসে এসে যেনো তাদের শরীরে ভর করে।
নিজামউদ্দিন আহমদ বলেন, ভাবী সাহেব, ভাল মন্দ খবরাদি কন; আপনেরা ক্যামুন আছেন? আপনেগো লিগা আমরা চিন্তায় আছি।
ছমিরন বেগম বেশ সপ্রতিভ রাজনীতিবিদের স্ত্রী, আয়তনে মোঃ হামিদ মিয়ার দ্বিগুণ, তিনিই আমলাপ্লীর নেত্রী হলে ভালো মানাতো।
ছমিরন বেগম বলেন, উনি ন্যাতা হওনের পর থিকা ত দিনরাইত চিন্তার মইদ্যেই আছি, ভাইজান, অহন আবার নতুন চিন্তা বাড়ছে।
আবদুল হাই জিজ্ঞেস করেন, বুঝাইয়া কন, ভাবীসাব, নতুন চিন্তার কী হইল?
ছমিরন বেগম বলেন, লোকজন ওনারে মাজেমইদ্যেই বিচরাইতে আইতাছে, তাগো চোখমোখ দেইখ্যা ভাল ঠ্যাকতাছে না, হেরা আবার ফিসফিস কইর্যাও কতা কয়, ক্যামুন কইর্যা চায়।
স্ত্রীর বর্ণনা শুনে মোঃ হামিদ মিয়া বিচলিত বোধ করেন।
নিজামউদ্দিন আহমদ বলেন, ভাবীসাব, সেইজইন্যেই ত হামিদ মিয়াভাইরে আমরা লইয়া আসলাম, তারে অরা সরাই দিতে চায়।
শুনে চিৎকার করে ওঠেন ছমিরন বেগম।
আবদুল হাই বলেন, ভাবীসাব, চিন্তা করবেন না, পলিটিক্সে অনেক রিক্স আবার অনেক মজা, হামিদ ভাই এখন থেকে আমাগো লগেই থাকবো, বডিগার্ড ছাড়া বাইর হইবো না, হামিদ ভাই কই আছে ভুলেও কারে কইবেন না।
ছমিরন বেগম বলেন, না, ভাইজান, সেই কথা কি কইতে পারি, তয় একটু দেইখ্যা শুইন্যা রাইখেন।
নিজামউদ্দিন আহমদ দশ হাজার টাকার একটি বান্ডিল তুলে দেন ছমিরন বেগমের হাতে, এবং বলেন, ভাবীসাব, এইটা রাখেন, কখন কী লাগবো বলন ত যায় না, দুই এক দিন আরেকটা বান্ডিল পাঠামু।
আবদুল হাই বলেন, ভাবীসাব, হামিদ ভাই ন্যাশনাল লিডার হইয়া গ্যাছেন, তার গলার আওয়াজে তোপখানায় আগুন ধইরা যায়, আমরা পাওয়ারে আসলে হামিদ ভাই মন্ত্রী নাইলে অ্যামবাসাডার হইবো।
ছমিরন বেগম জিজ্ঞেস করেন, এই দুইবার মইদ্যে কোন বড়, ভাইজান?
মোঃ হামিদ মিয়া বলেন, দুইডাই বড়, দাকতে পাইবা।
নিজামউদ্দিন বলেন, তয় অ্যামব্যাসাডার হইলে ভাবীরে ইংরাজি কইতে হইব।
ছমিরন বেগম বলেন, না, ভাইজান, এই বয়সে আর ইংরাজি কইতে পারুম না, শরম লাগবো, তয় হিন্দি কইতে পারি দুই একটা।
অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টুর পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় নি বলেই সব ভণ্ডুল হয়ে গেছে; কিন্তু তিনি রুখে দাঁড়িয়ে টিকিয়ে দিয়েছেন রাজবংশটিকে, না রুখে না দাঁড়ালে নিজেকে টেকানো যায় না, ভেঙে পড়তে দেন নি মহাদেশনেত্রীকে, তাই তিনি এখনো নিজেকে ভাবছেন দেশের প্রধান মন্ত্রী–ভেবে সুখে আছেন, এটা রাজবংশের জন্যে একটি প্লাস পয়েন্ট; তিনি ভেঙে পড়লেই সব কিছু মাইনাস হয়ে যেতো। তার একটু অসুবিধা হচ্ছে যে তিনি জেগেই সিংহাসনে বসতে পারছেন না, বেরোলেই একশোটা যানবাহন আর সেপাই তাঁকে ঘিরে থাকছে না, নামলেই দুশোটি মাথা তার পদধূলি নিচ্ছে না। কয়েক মাস এটা তাকে সহ্য করতে হবে, উপায় নেই। বংশের রাজপুরুষদের নিয়ে অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু সব কিছু গুছিয়ে তুলছেন; যেমন অন্যান্য বংশের রাজপুরুষরাও দিনরাত গোছাচ্ছেন; গোছাতে গোছাতে তারা সময় পাচ্ছেন না; পত্নীদের সাথে দেখা করার দরকার তো অনেক আগেই ফুরিয়ে গেছে, এমনকি উপপত্নীদের সাথেও দেখা করার মতো সময় করে উঠতে পারছেন না (এটা শুধু ভাগ্যবানদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)। নিষ্পাপ দেবদূতরা দেশ শাসন করছেন, সব কিছু অবাধ নিরপেক্ষ জাতিসংঘভাবে হবে; ওই অফসেটে ছাপা ব্যাপারগুলো দেখবেন সোনালি ডানার দেবদূতরা, নির্বাচন কমিশনের পাকপবিত্র অপাপবিদ্ধ ফেরেশতারা, আন্তর্জাতিক সত্যদর্শীরা; কিন্তু ওই সবে রাজনীতিবিদদের চলে না, তাদের দেখতে হবে তাদের ব্যাপার।

চমৎকার খুব ভাল লাগলো