এক জন্মে মানুষ, আর ওই ছাগল ভেড়া গরু গাধা, বহুবার জন্ম নেয়; বাঁশের কেল্লায় মোঃ হামিদ মিয়ারও নতুন জন্ম হয়; তিনি আমলাপল্লীর নেতা থেকে জননেতা হয়ে ওঠেন।
নিজামউদ্দিন আহমদ ও মোহাম্মদ আবদুল হাই বিশাল সম্ভাবনা আর বিকট ভয় দেখতে পান মোঃ হামিদ মিয়ার মধ্যে।
বাঁশের কেল্লার সভা শেষ হলে নিজামউদ্দিন আহমদ ও মোহাম্মদ আবদুল হাই পাজেরোতে উঠিয়ে মোঃ হামিদ মিয়াকে নিয়ে আসেন গুলশানে নিজামউদ্দিন আহমদের ভবনে।
নিজামউদ্দিন আহমদ বলেন, ভাই হামিদ মিয়া, চল্লিশ পাঁচপল্লিশ বচ্ছর ধইরা পলিটিক্স করতেছি, পাকিস্থানিগো বকতিতা দিয়া কাঁপাই দিতাম; কিন্তু ভাই আপনের মতন বকতিতা আইজও দিতে পারি না।
মোঃ হামিদ মিয়ার পাঁজরের হাড়গুলো অনেকখানি ফুলে ওঠে, তাঁর সামনের নেতা দুটিকেও তার মনে হয় তুচ্ছ; সাজানো ড্রয়িংরুমটিকেই তাঁর মনে হয় বাঁশের কেল্লা, তাঁর গলা থেকে গলগল করে বক্তৃতা বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু হামিদ মিয়া বক্তৃতা দেন না, কথা বলেন।
মোঃ হামিদ মিয়া বলেন, বকতিতা দেওন কোনো কামই না, ছার, পান্তাভাত খাওনের মতন, আমি বকতিতা দিয়া রোডে বিল্ডিংয়ে আগুন লাগাই দিতে পারি। আপনেগো বকতিতা হুইন্যা হুইন্যাই বকতিতা শিকছি, ছার।
নিজামউদ্দিন ও আবদুল হাই টের পান লোকটি বেশ নির্বোধ অহমিকাপূর্ণ, শস্তা রাজনীতিবিদ হওয়ার জন্যে সর্বাংশে উপযুক্ত; সে শক্তির উৎসবাদীদের জন্যে যেমন বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে তেমনি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে তাদের জন্যেও। তাই তাকে তৃপ্ত রাখতে হবে, এবং রাখতে হবে সন্ত্রস্ত; আর রাখতে হবে পরোক্ষভাবে বন্দী। তাকে তৃপ্ত, ব্ৰস্ত, বন্দী রাখা বিশেষ কঠিন হবে না; মনে হচ্ছে সহজেই সে ফুলে ওঠে, পাজেরোতে উঠতে গৌরব বোধ করে, আর তাদের সঙ্গলাভে জাতীয় নেতার মহিমা লাভের সুখ পায়।
আবদুল হাই বলেন, হামিদ ভাই, আপনে যে কী কন; আইজ আপনের বকতিতা শুইন্যা ত মনে হইল আপনের কাছেই আমাগো শিখনের অনেক কিছু আছে; এক বকতিতায়ই ত আপনে জাতীয় ন্যাতা হইয়া গ্যাছেন, আমাগো লাগছে চল্লিশ পাঁচচল্লিশ বচ্ছ।
মোঃ হামিদ মিয়া বলেন, আইজ, ছার, গলাটায় একটু ব্যাদনা আছিলো, নাইলে আরও আগুন জ্বালাই দিতে পারতাম, আরও পোরাইতে পারতাম, কাইল সব ঠিক হইয়া যাইবো দেইখ্যেন, ছার।
নিজামউদ্দিন বলেন, আপনের ভবিষ্যৎ খুবই ভাল, হামিদ ভাই, জনন্যাতা ত আপনে হইয়াই গ্যাছেন, আমাগো দিন আইলে আপনে মন্ত্রী নাইলে হাউজ বিল্ডিংয়ের চ্যায়ারম্যান নাইলে অ্যামবাসাডারও হইতে পারেন।
হামিদ মিয়া বেশ ফুলে ওঠেন, সামনের খাবার গোগ্রাসে গিলতে থাকেন, বাঁশের কেল্লায় এই মুহূর্তেই আবার তাঁর লাফিয়ে উঠতে ইচ্ছে করে।
হামিদ মিয়া বলেন, রাজনীতি ত করি, ছার, জনগণের লিগা, মন্ত্রী আর চ্যায়ারম্যান হওনের লিগা না; তয় মন্ত্রীগো গাড়ি আর ফ্যালাগ দেইখ্যা দেইখ্যা মাঝে মইধ্যে মন্ত্রী হওনেরও মন চায়।
নিজামউদ্দিন ও আবদুল হাই এততক্ষণ পড়ছিলেন লোকটিকে, এবার তাদের পড়া শেষ হয়; শেষ পাতা পর্যন্ত পড়ে লোকটিকে তারা মুখস্থ করে ফেলেছেন; লোকটির কোনো বানান আর বাক্য তাঁদের ভুল হবে না।
আবদুল হাই বলেন, আমরা পাওয়ারে আসলে মন্ত্রী আপনে অবশ্যই হইবেন, হামিদ ভাই, তবে আপনের একটু সাবদানে থাকতে হইবো। আমরা যা খবর পাইছি, তাতে খুব চিন্তার মইধ্যে আছি, সেইজইন্যেই ত আপনেরে সাথে কইরা লইয়া আসলাম, একলা ছাইর্যা দিতে পারলাম না।
কথাটি শুনে ভয় পেয়ে কেঁপে ওঠেন মোঃ হামিদ মিয়া।
মোঃ হামিদ মিয়া কেঁপে কেঁপে জিজ্ঞেস করে, ক্যান সাবদানে থাকতে হইবো, ছার, কী খবর পাইছেন, ছার?
নিজামউদ্দিন বলেন, শক্তির উৎসআলারা লোক লাগাই দিছে, আপনেরে দুনিয়া থিকা সরাই দিতে চায়।
ভয় পেয়ে চিৎকার করে ওঠেন মোঃ হামিদ মিয়া।
আবদুল হাই বলেন, হামিদ ভাই, আমাগো স্পাইরা সারাদ্যাশ ভইর্যা কাম করতেছে, দ্যাশের কোন জায়গায় কোন কন্সপিরেসি হইতেছে কোন চক্রান্ত হইতেছে সব খবর আমরা পাইতেছি; আমাগো মহাজননেত্রীরে তারা যেমুন সরাই দিতে চায়, আপনেরেও সরাই দিতে চায়। আপনে অগো টার্গেট।
হামিদ মিয়া কাতর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন, আমি এখন কী করুম, ছার?
নিজামউদ্দিন বলেন, ডরাইবেন না, হামিদ মিয়া, আপনে আমার বাড়িতেই থাকবেন খাইবেন, আমাগো লগেই যাওয়া আসা করবেন, আমাগো বডিগার্ড আছে, বডিগার্ড ছাড়া আমরা বাইর হই না, আপনেও হইবেন না।
মোঃ হামিদ মিয়া বেশ নিরাপদ বোধ করেন; চারদিকে বডিগার্ড দেখার জন্যে তাকান, দেখেন কয়েকটি শক্ত পেশি দূরে বসে আছে, দেখে তিনি শান্তি পান।
আবদুল হাই বলেন, আইজ রাইতে আপনের বাসায় লোক পাঠাইয়া খবর নিমু অগো কোনো লোক আপনের বাসায় গ্যাছে কি না? গ্যালেই ব্যাপারটা ভাল কইর্যা বোঝতে পারুম, আরো সাবধান হমু।
হামিদ মিয়া বলেন, দ্যাহেন, ছার, আমি আপনেগো লগেই থাকুম, আমারে আপনেগো লগেই রাইখেন। আমার খুব ডর লাগতেছে।
নিজামউদ্দিন বলেন, তয় বকতিতা দেওনের সময় ডরাইবেন না, ভাই, কোনো ব্যাডা য্যান বোঝতে না পারে আপনে ডরাইছেন; আপনে অগোই ডর লাগাই দিবেন। ডরাইলে রাজনীতি করন যায় না, রাজনীতি করতে হয় ডর দ্যাখাইয়া। ডরাইলেই ডর।

চমৎকার খুব ভাল লাগলো