ওই রোগাপটকা দারোয়ানটির নাম মোঃ হামিদ মিয়া।
মোঃ হামিদ মিয়া দারোয়ান, তবে তিনি শুধু দারোয়ান নন। মোটাগাটাচ্যাপ্টা আমলাদের জন্যে দেয়াল দিয়ে ঘিরে যে একটি বিশাল প্রাসাদপল্লী বানিয়ে দেয়া হয়েছে, হামিদ মিয়া সেখানকার দারোয়ান; তবে তিনি নেতা, ওই প্রাসাদপল্লীর নিম্নবর্ণের কর্মচারীদের তিনি এক নম্বর নেতা। তিনি বিদ্রোহ করেছেন বলেই ওই প্রাসাদপল্লী ভেঙে পড়েছে, তাঁর আদেশেই নিম্নবর্ণের কর্মচারীরা গলা ধাক্কা দিয়ে প্রাসাদপল্লী থেকে বের করে দিয়েছেন শক্তির উৎসবাদী রাজবংশের রাজাদের। তিনি দেখা দিয়েছেন প্রচণ্ড শক্তিমান রূপে। মোঃ হামিদ মিয়া নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রাসাদপল্লী, তাঁর কথায় সবাই উঠছে বসছে, এবং তিনি গিয়ে উঠেছেন জনগণমন রাজবংশের বাঁশের কেল্লায়। বাঁশের কেল্লায় দাঁড়িয়ে মোঃ হামিদ মিয়া অগ্নিগিরির মতো বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছেন, আর তাতে কেঁপে উঠছে নগর।
অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু, জেনারেল কেরামতউদ্দিন, সোলায়মান হাওলাদার খোঁজ নিতে থাকেন, বুঝতে পারেন মোঃ হামিদ মিয়াই মূল শক্তি; তাঁকে বশ করা গেলে থেমে যাবে ওই বাঁশের কেল্লার বিপ্লব।
দ্রুত পান করতে করতে তাঁরা তাঁদের কর্মপদ্ধতি স্থির করছিলেন।
অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু বলেন, হামিদ মিয়াটাই নষ্টের মূল, ওই ব্যাটাই খ্যাপাইয়া তোলছে সচিবালয়, কুত্তারবাচ্চারে আমিই ঢুকাইছিলাম।
জেনারেল কেরামতউদ্দিন বলেন, কয়টা ক্যাডার লাগাই দেই, দে উইল সলভ দি প্রব্লেম বিফোর ডন।
সোলায়মান হাওলাদার বলেন, ক্যাডাররা আরেকটা নতুন গোলমাল পাকাইয়া তোলতে পারে, ক্যাডার দিয়া কাম হবে না।
অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু বলেন, মিলিটারি অ্যাকশনে এখন হইবো না, এখন দরকার পলিটিক্যাল অ্যাকশন। হামিদ মিয়া আইজকাল একটা বড় ন্যাতা হইছে, জনগণমনআলাগো বড়ো বড়ো ন্যাতার লগে ওঠছে বসছে, তাই তারে পলিটিক্যালি ট্যাকেল করতে হইবো।
জেনারেল কেরামতউদ্দিন গেলাশটি শেষ করে আরেক গেলাশ ভরতে ভরতে জিজ্ঞেস করেন, হাউ উইল ইউ ট্যাকেল দি বাস্টার্ড?
অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু বলেন, অর লগে আইজ রাইতেই যোগাযোগ করতে হইবো, লাখ পাঁচেক ট্যাকা গছাইয়া দিতে পারলে ও চুপ কইর্যা যাইবো।
সোলায়মান হাওলাদার জিজ্ঞেস করেন, ব্যাটারে পাওন যাইব কই? অইটা তো জনগণমনআলাগো বড়ো বড়ো ন্যাতাগো পাশই ছাড়ে না।
অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু বলেন, হাওলাদার সাব, আপনে ত আর পলিটিক্সে জ্যানারেল ভাইর মতো নিউকামার না, এত বামপন্থী ডাইনপন্থী পলিটিক্স কইরাও আপনে হোল টুথটা বোঝতে পারতেছেন না।
সোলায়মান হাওলাদার গেলাশটা শূন্য করতে করতে বলেন, অধ্যক্ষ ভাইর মতন পলিটিশিয়ান আইজও হইতে পারলাম না, অধ্যক্ষ ভাই হইছেন আমাগো পলিটিক্সের প্রিন্সিপাল, পলিটিক্সের ভাইচচ্যাঞ্চেলার। এখন হোল ট্ৰথটা বুঝাইয়া বলেন।
অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু বলেন, মোঃ হামিদ মিয়া আইজকাল ক্ষমতার স্বাদ পাইছে, কেল্লায় উইঠ্যা সামনে এত মানুষ দেইখ্যা পাগল হইয়া গেছে, প্রত্যেক পলিটিশিয়ানই সামনে মানুষ দেইখ্যা পাগল হইয়া যায়। মদ খাওনের মতন লাগে। বড়ো বড়ো ন্যাতাগো লগে থাইক্যা সেও নিজেরে বড়ো ন্যাতা ভাবতেছে। আর আমার মনে হয় ওই জনগণমনআলারাও তারে ছাড়তেছে না, সে যাতে ভাইগ্যা না যায় সেই কারণে হামিদরে সব সময় পাশে পাশে রাখতেছে। তবে আইজ রাইতেই তার লগে কন্টাক্ট করতে হইবো।
মোঃ হামিদ মিয়ার সাথে কন্টাক্ট করার জন্যে অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু রাতেই জনপাঁচেক দূত নিয়োগ করেন।
অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু দক্ষ রাজপুরুষ; তিনি দূত হিশেবে কোনো পরিচিত রাজপুরুষকে পাঠান না; সাংবাদিক হিশেবে পাঠান দুজনকে, পাঠান আমলাপল্লীর দুজন নিম্নবর্ণের কর্মচারীকে, এবং আরো দু-একজনকে।
কিন্তু তারা কোথাও মোঃ হামিদ মিয়ার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন না। মোঃ হামিদ মিয়া রাতে বাসায় ফেরেন না; কেল্লার মঞ্চে তাঁকে দেখা যায়, কিন্তু তাঁর কাছে যাওয়া সম্ভব হয় না। কেল্লা থেকে নেমেই মোঃ হামিদ মিয়া জনগণমন রাজবংশের দুই রাজপুরুষের সাথে কোথায় যেনো মিলিয়ে যান।
বুদ্ধিটা কয়েক দিন আগে আসে জনগণমন গণতান্ত্রিক রাজবংশের নিজামউদ্দিন। আহমদ ও মোহাম্মদ আবদুল হাইয়ের মাথায়। মোঃ হামিদ মিয়া আমলাপল্লীতে যেদিন তোলপাড় সৃষ্টি করে ফেলেন, নিজের হাতে গ্রহণ করেন আমলাপল্লীর শাসনভার, সেদিনটিকে লাল অক্ষরে লেখা দিন হিশেবে গণ্য করেন নিজামউদ্দিন আহমদ ও মোহাম্মদ আবদুল হাই; তারা দ্রুত গিয়ে দেখা করেন মোঃ হামিদ মিয়ার সাথে, এবং তাকে এনে তোলেন তাঁদের বাঁশের কেল্লায়।
মোঃ হামিদ মিয়া বাঁশের কেল্লার মঞ্চে দাঁড়িয়ে সামনে জনসমুদ্র দেখে প্রথম ঝাঁপিয়ে পড়তে চান, পরে তিনি শক্ত হন; তার মনে হয় তিনি ওই জনগণের মাথার ওপর তার পা দুটি রেখে দাঁড়িয়ে আছেন।
বক্তৃতা দিতে উঠে আরো বদলে যান মোঃ হামিদ মিয়া। তার মনে হতে থাকে তার কণ্ঠ থেকে একটির পর একটি ঠাঠা গর্জন করতে করতে গিয়ে পড়ছে বড়ো বড়ো আমগাছের ওপর, জামগাছের ওপর, ধানক্ষেতে পাটক্ষেতে; আর চারদিক দাউদাউ করে জ্বলে উঠছে। তাঁর মনে হতে থাকে তিনি সাপুড়ে, সাপ খেলা দেখাচ্ছেন; তাঁর বাঁশিতে সাপের মতো দুলছে সামনের জনগণ। তাঁর মনে হতে থাকে ওগুলো মানুষ নয়, ওগুলো তাঁর হাতের পুতুল; তিনি যেভাবে আঙুল নাড়ছেন সেভাবেই নাচছে ওই পুতুলগুলো।

চমৎকার খুব ভাল লাগলো