তখন শহরের গাছপালাগুলোর ডালপালা থেকে পথে পথে পাতা ঝরে পড়ছে, অমন নিষ্ঠুর সুন্দর সময়ে শহর ছেড়ে প্রায় পালিয়ে যাওয়ার উপক্রম করেছিলেন এ-বংশের রাজপুরুষেরা, তাঁদের দুর্ধর্ষ রাজপুত্ররা–এতো ভয় তারা আর কখনো পান নি; কিন্তু পালানোর জন্যে বেরিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু, জেনারেল কেরামত, সোলায়মান হাওলাদার, বিশেষ করে অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু; এবং রুখে দাঁড়ানোর ফল পাওয়া গিয়েছিলো সঙ্গে সঙ্গে। জনগণমনের দুষ্কৃতিকারীগুলো তাদের তাড়া করে ভয় পাইয়ে দিতে চেয়েছিলো, কিন্তু যেই রুখে দাঁড়ালেন অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু, নিজেদের বাঁশের কেল্লা বানিয়ে ঘোষণা করলেন চোখের বদলে চোখ নাকের বদলে নাক ছিঁড়ে নেয়া হবে, তাদের দিকে একটুকু হাতপা বাড়ালে হাতপা গুড়ো করে দেয়া হবে, তখন থমকে দাঁড়ালো জনগণমনের দুষ্কৃতিকারীগুলো, তারা ভয়ই পেয়ে গেলো; এবং এক বিকেলে অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু নতুন করে পরিণত হলেন নায়কে।
আমরা জনগণরা কোনো দিন বুঝতেই পারি নি যে অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টুর থলথলে বুকে এতো সাহস, গলা এতো উচ্চ, কণ্ঠে এতো বজ্র। সুযোগ থাকলে নতুন কোনো দেশের তিনি জাতির পিতা হতে পারতেন; এক গর্জনে তিনি দেশছাড়া করতে পারতেন দখলদার বাহিনীকে।
অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু কেল্লায় ওঠেন প্রথম বক্তৃতা দিতে, বা তাকেই প্রথম বক্তৃতা দেয়ার জন্যে কেল্লায় ওঠানো হয়; এবং তার প্রথম কথায়ই সবাই গর্জন করে ওঠে তার সাথে, বিকেল ও সন্ধ্যে ভরে তিনি একলাই বক্তৃতা দেন। তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেন। তার বজ্রকণ্ঠের পর আর কারো বক্তৃতা দেয়ার সাহস হয় না, দরকারও হয় না; অন্যরা শুধু তার সাথে শ্লোগান দিতে থাকেন চারপাশ কাপিয়ে, আর শহরের নানা দিক থেকে শক্তির উৎসবাদী দলের প্রজারা এসে পথের উত্তর থেকে দক্ষিণ কোণ পর্যন্ত কানায় কানায় ভরে ফেলে নিজেদের ঝকঝকে জিনিশগুলো জামার নিচে নিয়ে দৌড়ে আসতে থাকেন দলের দুর্ধর্ষ ক্যাডার বা রাজপুত্ররা, যারা দুপুরেও শহর ছেড়ে চুপচাপ পালিয়ে গিয়ে জনগণমন রাজবংশে যোগ দেয়ার কথা গভীরভাবে বিবেচনা করছিলেন। তাঁরা জানেন ক্যাডারদের কোনো দিন অমর্যাদা হয় না, ক্যাডার সর্বত্র পূজিত।
অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু প্রথম গলা খুলেই বলেন, উৎসবাদী রাজবংশের দুর্ধর্ষ বীরেরা, বুলডজারের মতো সিপাহিরা, তোমরা রুইখ্যা দারাও।
সঙ্গে সঙ্গে গর্জন করে ওঠে সবাই, আমরা রুইখ্যা দারাইছি, আমরা রুইখ্যা দারাইছি। তাদের গর্জন দশ মিনিট ধরে চলতে থাকে।
তিনি বলেন, এই দিকে অরা এক পাও বাড়াইলে তোমরা অগো হাত পাও মাথা ছাতু কইরা দিবা, মগজ ভর্তা কইর্যা দিবা, চউক্ষের বদলে চউক্ষু নিবা, নাকের বদলে নাক নিবা, অগো শহর থিকা বাইর কইর্যা দিবা।
তাঁর বক্তৃতা শুনে উত্বাদী দলের রাস্তায় নোক উপচে পড়ে, দুর্ধর্ষ ক্যাডাররা আকাশের দিকে তুবড়ি ছুঁড়তে থাকে, দূর থেকে শুনে ভয়ে আমরা জনগণরা কাঁপতে থাকি; আর এ-সংবাদ দুই মাইল দূরে জনগণমন বংশের রাস্তায় ও কেল্লায় গিয়ে পৌঁছলে জনগণমন বংশের রাজপুরুষরা ও ক্যাডাররা ডরে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। খুব ভয় পান তারা, তাই কয়েক মুহূর্ত তারা বরফের মতো জমে থাকেন, গলা দিয়ে তাদের গর্জন বেরোতে চায় না। জমাট গর্জন তাঁদের গলায় আটকে থাকে। জনগণমন গণতান্ত্রিক রাজবংশের ভয়টা, আমাদের মনে হয়, দু-রকম: প্রথম ভয়টা হচ্ছে ক্যাডারে ক্যাডারে লাগলে তারা হয়তো পেরে উঠবেন না, তাদের ক্যাডারগুলোরে ভালো করে তৈরি করা হয় নি, আর দ্বিতীয় ভয়টা হচ্ছে এ-সময় যদি কোনো গোলমাল হয়ে যায়, যদি দেশের বড়ো ক্যাডাররা নেমে পড়ে, তাহলে তাদেরও পালাতে হবে, সব মাটি হয়ে যাবে। বড়ো ক্যাডাররা নামলে তো আবার দশ বছর। সব মাটি করার জন্যে কি তারা তিন বছর ধরে এতো দামি দামি ঘাম ফেললেন? তাদের মাথার ঘামের বড়ো বড়ো ফোঁটায় শহরের পথঘাট ভিজে গেছে, তাই তারা এমন সময়ে এমন কাজ করতে পারেন না, যাতে সব কিছু বাঙলাদেশের মাটির থেকেও মাটি হয়ে যায়।
রুখে দাঁড়ানোর কয়েক দিন আগে অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু, জেনারেল কেরামতউদ্দিন, আর সোলায়মান হাওলাদারের মাথায় আরেকটি অব্যর্থ বুদ্ধিও এসেছিলো, কিন্তু সেটি তারা বাস্তবায়িত করতে পারেন নি; পারলে আর রুখে দাঁড়ানোর দরকার হতো না, তারাই এখনো থাকতেন রাজা; জনগণমনদের লেজ নামিয়ে পথ থেকে সরে যেতে হতো। আমরা মূর্খ জনগণরা রাজনীতির আর কী বুঝি? রাজনীতির রয়েছে দশ কোটি কানাগলি, পাঁচ কোটি উপগলি, সাতাশ লক্ষ ষড়যন্ত্র, বত্রিশ লক্ষ বদমাশি, আরো কতো রাজকীয় ব্যাপার; রাজকীয় কারবারে সবই সুন্দর যদি শুধু ক্ষমতা হাতের মুঠোয় থাকে। জনগণমন রাজবংশের রাজপুরুষরা যখন কেল্লা বানিয়ে রাস্তা জুড়ে গোলমাল করে চলছেন, তিন চারটা মোটাগাটা আমলা যখন কেল্লায় উঠে বড়ো বড়ো বক্তৃতা ঝাড়ছেন গণতন্ত্রের জন্যে, তখন অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু, জেনারেল কেরামতউদ্দিন, সোলায়মান হাওলাদার বুঝতে পারেন গোলমালের মূল কোনো মোটাগাটা আমলা নয়, কোনো বড়ো রাজপুরুষ নয়, মূল হচ্ছে একটি রোগাপটকা দারোয়ান। ওই দারোয়ানটাই সব নষ্টের মূল, সবচেয়ে শক্তিমান।

চমৎকার খুব ভাল লাগলো