মহাজননেত্রী ওই রাতেই ঘুমনাখোয়াবে দেখেন কোটি কোটি মানুষ মুকুট আর সিংহাসন মাথায় করে আসছে তার বাড়ির দিকে, তারা খুঁজছে রাজকন্যাকে, এবং তাঁর মাথায় পরিয়ে দিচ্ছে মুকুট, এমন সময় এক ডাইনি এসে ছোঁ মেরে নিয়ে যায় তার মুকুট ও সিংহাসন। আমরা বুঝতে পারি আগামী বছরগুলোতে বারবার বিদেশভ্রমণে অন্যরা যাবেন।
মহাদেশনেত্রী জাগনাখোয়াবে দেখেছেন ইরিক্ষেতের পর ইরিক্ষেতে (অবশ্য কোনো দিন বাস্তবে তিনি ইরিক্ষেত বা পাটক্ষেত বা কোনো ক্ষেতই দেখেন নি, তাঁর উঁচু হিলে মাটি লাগবে ব’লে, তবে দেশকে ভালোবাসেন বলে ক্ষেত জাতীয় ব্যাপারগুলোকে দেখার কাজ তিনি স্বপ্নেই সম্পন্ন করেন) সোনার গাছে হীরের পাতা আর মুক্তোর শীষ দেখা দিয়েছে। আমরা বুঝতে পারি আগামী বছরগুলোতে টেলিভিশনে আর সংবাদপত্রে দিনরাত শুধু তাকেই দেখা যাবে।
তিনি ঘুমনাখোয়াবে দেখেছেন ইরিক্ষেতের পর ইরিক্ষেতে এবং আর যতো ক্ষেত (কী কী ক্ষেত আছে সে সম্পর্কে তার ধারণা রাজকীয়ভাবে অস্পষ্ট) আছে আর শীষ আছে, তাতে পোকা লেগেছে, সব শীষ পচা পোকার মতো পড়ে আছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত (তিনি অবশ্য স্বপ্নে দেখা এলাকা সম্পর্কে নিশ্চিত নন, কেননা দেশটির পুব বা পশ্চিম উত্তর দিকে না দক্ষিণ দিকে এ সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন), পঙ্গপালে ঢেকে গেছে সূর্য। আমরা বুঝতে পারি আগামী বছরগুলোতে টেলিভিশনে আর সংবাদপত্রে দিনরাত অন্য একজনকেই দেখা যাবে।
মহাজননেত্রী জাগনাখোয়াবে দেখেছেন পদ্মা মেঘনা যমুনা ব্ৰহ্মপুত্ৰ কর্ণফুলি বুড়িগঙ্গা কাঁকড়া কারাঙ্গি ইছামতি মধুমতি সুরমা শীতলক্ষা গোমতি কপোতাক্ষ করতোয়া তুরাগ আরো যতো নদী আছে সব নদী দিয়ে প্রবল বেগে বইছে জলধারা, আর নদীতে পুকুরে খালে বিলে ভাসছে লাখ লাখ সোনার তরী। আমরা বুঝতে পারি আগামী বছরগুলোতে এ-বংশের রাজপুরুষেরাই পথে পথে স্থাপন করবেন ভিত্তিপ্রস্তর, উদ্বোধন করবেন সেতু সিনেমা হল মুদিদোকান।
তিনি ঘুমনাখোয়াবে দেখেছেন পদ্মা মেঘনা যমুনা ব্ৰহ্মপুত্ৰ কর্ণফুলি বুড়িগঙ্গা কাঁকড়া কারাঙ্গি ইছামতি মধুমতি সুরমা শীতলক্ষা গোমতি কপোতাক্ষ করতোয়া তুরাগ আরো যতো নদী আছে সব শুকিয়ে সাহারা হয়ে গেছে, ছাইয়ের মতো বালিতে ঢেকে গেছে সুন্দরবন থেকে সাজেক, একদা নদী পুকুর খাল বিলে পড়ে আছে তরীর অজস্র অদ্ভুত ভাঙাচোরা বিশ্লিষ্ট কঙ্কাল। আমরা বুঝতে পারি আগামী বছরগুলোতে অন্য বংশের রাজপুরুষেরাই পথে পথে স্থাপন করবেন ভিত্তিপ্রস্তর, উদ্বোধন করবেন সেতু সিনেমা হল মুদিদোকান।
মহাদেশনেত্রী জাগনাখোয়াবে দেখেছেন তিনি ফুলবনে দখিনা মলয়ে ছন্দে ছন্দে বনফুলের মতো আনন্দে দুলছেন; তার ওপর ঝরে পড়ছে শিউলি বকুল পারুল বেলি মল্লিকা। আমরা বুঝতে পারি আগামী বছরগুলোতে তার বংশের রাজপুত্ররা ব্যাংক থেকে যত খুশি ততো কোটি ডলার তুলে নিয়ে শিল্পপতি হবেন।
তিনি ঘুমনাখোয়াবে দেখেছেন তার চারদিকে আগুন লেগেছে, দাউদাউ দাবানলে কাগজের মতো পুড়ছে বন আর ফুলবন আর দোলনা। আমরা বুঝতে পারি আগামী বছরগুলোতে অন্য বংশের প্রিয়রা আর রাজপুত্ররা ব্যাংক থেকে যতো খুশি ততো কোটি ডলার তুলে নিয়ে শিল্পপতি হবেন।
মহাজননেত্রী জাগনাখোয়াবে দেখেছেন দেশের ৭২৯জন আধুনিক, উপাধুনিক, প্রাগাধুনিক, পরাধুনিক, গলাধুনিক, স্তবাধুনিক কবিয়াল.তার ও তার বংশের নামে ১২৫টি নতুন ছন্দ আবিষ্কার করে পাঁচ হাজার টন পদ্য উৎপাদন করেছেন, আরো তিন হাজার টন পাইপলাইনে রয়েছে, কয়েক দিনের মধ্যেই উৎপাদিত হয়ে গলগল করে পথে পথে ঝরে পড়বে। আমরা বুঝতে পারি আগামী বছরগুলোতে তাঁর বংশের মহারাজের নামে নামকরণ করা হবে দেশের সব পথঘাট বিমানবন্দর সেতু সারকারখানা খেলার মাঠ বিশ্ববিদ্যালয়।
তিনি ঘুমনাখোয়াবে দেখেছেন কবিয়ালদের পদ্যগুলো স্তব নয়, প্রচণ্ড শ্লোগান, কাঁপছে পথঘাট শহর গ্রাম দালানকোঠা গাছপালা। আমরা বুঝতে পারি আগামী বছরগুলোতে সব পথঘাট বিমানবন্দর সেতু সারকারখানা খেলার মাঠ কাঁচাবাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করা হবে অন্যবংশের রাজাধিরাজের নামে।
এই সব স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্নের মধ্যে আছেন আমাদের রাজারা, আছি আমরা; চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে খোয়াবের কলেরা।
আমরা শুনতে পাই শক্তির উৎসবাদী রাজবংশের অধ্যক্ষ রুস্তম আলি পন্টু, জেনারেল কেরামতউদ্দিন, সোলায়মান হাওলাদার খুবই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন, নিশ্বাস নেয়ার, এমনকি উপপত্নীদেরও এক-আধঘণ্টা দেয়ার মতো সময় পাচ্ছেন না, সময়ের বড়োই অভাব; কিছুটা ছিন্নবিচ্ছিন্ন রাজবংশটিকে গুছিয়ে আনার জন্যে তারা মহান জেনারেলকে মনে ও তার আদর্শে অবিচল আস্থা রেখে আপ্রাণ সাধনা করে চলছেন। কিছু দিন আগেও তারা রাজা ছিলেন, তারপর এমন হলো যে মনে হচ্ছিলো পাজেরো আর মার্সিডিস ফেলে পালিয়ে যেতে হবে শহর থেকে পালাতে গিয়ে মনে পড়লো পালাবেন কেনো? তারা কি জনগণের হৃদয়ের ধন ছিলেন না? কিছু দিন আগেও কি তাঁরা দশ কেজি বিশ কেজি ওজনের ফুলের মালা গলায় পরেন নি জনগণের হাত থেকে? দু-মাস আগেও কি একটা সফল, গণতান্ত্রিক নির্বাচনে জয়ী হয়ে তারা দেশকে বাঁচান নি? তাঁরা দেশ না বাঁচালে কে বাঁচাতো? না হয় আর কোনো দল নির্বাচনে অংশ না-ই নিয়েছিলো, সেগুলো গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না বলে অমন সুন্দর নির্বাচনটিতে অংশ নেয় নি; কিন্তু তারা কি নির্বাচন করে জয়লাভ করেন নি? এখন কি জনগণ তাদের শহর থেকে বের করে দিতে চায়? জনগণকে অবশ্য বিশ্বাস করা যায় না; হারামজাদারা কখন কারে মালা দিবো, কোন নাঙ্গের লগে ঘুমাইবো, কারে সিংহাসনে বসাইবো তার ঠিক নাই। তবে আসল বদমাইশ ওই জনগণমন রাজবংশের শয়তানগুলো, জনগণ যাদের চায় না, যাদের তিনশো বছরের মধ্যেও রাজা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, কিন্তু রাজা হওয়ার জন্যে যারা কার্তিকের কুত্তার মতো পাগলা হয়ে উঠেছে, তারাই নানা মিথ্যে কথা বলে বাস্ট্রাক ভেঙে আগুন লাগিয়ে ক্ষেপিয়ে তুলেছে জনগণকে। আর আছে হাড্ডিতে হাড়িতে শুয়ারের বাচ্চা আমলাগুলো;–ওইগুলোকে সকালে বিকেলে মাগরেবে এশায় এতো প্রমোশন দেয়া হলো, কোটি কোটি টাকা চুরি করার সুযোগ দেয়া হলো, পরস্পরের বউ ভাগানোর জন্যে এতো পুরস্কার দেয়া হলো, তবু বাঞ্চতগুলো রাস্তার দিকে ছুটলো, জনগণমন রাজবংশের বাঁশের কেল্লায় লাফিয়ে উঠে গলা ফুলিয়ে চিল্লাপাল্লা শুরু করে দিলো। দেখে নেয়া হবে সময় এলে, একটাকেও ছাড়া হবে না।

চমৎকার খুব ভাল লাগলো