রাতে তিনি দেখেন তাঁর ঘুমনাখোয়াবটি।
তিনি দেখতে পান অপরূপ অরণ্যের ভেতর দিয়ে বয়ে চলছে এক অপরূপবতী নদী, সেই বনে সেই যমুনার পারে সেই ব্রজে তিনি বেড়াচ্ছেন, তাঁর বাহুতে পাঁচতারার মতো ঝলমল করছে এক অপরূপসী; তিনি যেই ঠোঁটে চুমো খেতে যাবেন, একপাল রাক্ষস হৈহৈ করে এসে জোর করে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় তার অপরূপসীকে। তিনি তাদের পেছনে ছুটতে গিয়ে দেখেন দুই দিক থেকে লাঙলের মতো দাঁত উঁচিয়ে বল্পমের মতো নখ খাড়া করে কোদালের মতো ঠোঁট ঝুলিয়ে তার দিকে আসছে দুই রাক্ষসী। দূরে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি বুড়ী রাক্ষসী। তিনি দৌড়োতে গিয়ে পিছলে পড়েন; এক রাক্ষসী তাঁর দুই হাত ছিঁড়ে পান্তাভাতের সাথে মুখে গোঁজে আরেক রাক্ষসী তার দুই পা ভেঙে জর্দা বানিয়ে হাতির কানের সমান পানের সঙ্গে খায়, এক রাক্ষসী তাঁর মাথাটি খুলে নিয়ে মারবেল খেলে আরেক রাক্ষসী তার দেহটি ভেঙেচুরে ভর্তা বানিয়ে পোড়া মরিচ দিয়ে আহার করে।
রাক্ষসীরা যখন তাকে আহার করে তখনো তিনি খোয়াব দেখতে থাকেন।
মহাগণনেতার খোয়ব দুটি আলোড়ন তোলে এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে; খোয়াববিদরা বলতে থাকেন এই প্রথম তিনি মৌলিক খোয়াব দেখেছেন, এর মধ্যে কোনো ভেজাল, জোড়াতালি, পচা গন্ধ নেই।
আমরা মহাগণনেতা বাবর মুঘলের খোয়াব নিয়ে এক দিনের বেশি ব্যস্ত থাকতে পারি না, তার খোয়বে মৌলিকত্ব থাকলেও কোনো ভবিষ্যৎ নেই, আমরা গরিবেরাও এটা বুঝতে পারি, তার সবই অতীত; আমরা মৌলিক ও ভবিষ্যসম্পন্ন খোয়াবের জন্যে অধীর অপেক্ষা করতে থাকি, এবং পর দিন ভোরবেলার মধ্যেই ঝাঁকে ঝাঁকে ট্রাকে বাসে বিপুল পরিমাণ সম্ভাবনাপূর্ণ খোয়াব আমাদের হাটেবাজারে মাঠেঘাটে জমিতে বাড়িতে এসে পৌঁছোতে থাকে। সবচেয়ে মৌলিক মূল্যবান ভবিষ্যৎগর্ভ খোয়ব হচ্ছে দুই মহারানীর, কুইন ভিক্টোরিয়া ও সুলতানা রাজিয়ার–মহাদেশনেত্রী ও মহাজননেত্রীর খোয়াব, তাদের গিঁটেই বাধা আমাদের জীবন, বিশেষ করে মৃত্যু–এটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ, মৃত্যুই আমাদের জীবন; তাদের নখের লালের ওপর নির্ভর করে আমাদের জীবন–এটা আমাদের জন্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটাই আমাদের মৃত্যু, তাঁদের–পায়ের আঙুলের ব্যথার ওপর নির্ভর করে আমাদের মৃত্যু, তাঁদের ঘোমটার পরিধির ওপর নির্ভর করে আমাদের জমির শস্য, তাদের ঘুম থেকে জাগার ওপর নির্ভর করে আমাদের নদীর জল। তারা অবশ্য নিজেদের জন্যে খোয়াব দেখেন না, দেখেন আমাদের জন্যে; আমরা শুনতে পাই দিনরাত তারা খোয়াব দেখছেন, জাগনা আর ঘুমনাখোয়াবের তাণ্ডবে তাদের চোখ লাল নীল সবুজ বেগুনি হলদে কালো হয়ে আছে।
তাদের জাগনাভোয়াব আর ঘুমনাখোয়াবের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকছে না; যা দেখতে পারতেন তারা দুপুরবেলা তা তারা দেখছেন মধ্যরাতে; যা দেখতে পারতেন মধ্যরাতে তা দেখছেন সকাল সাড়ে সাতটায় বা দশটায় দুপুর দেড়টায় বিকেল পাঁচটায়। আমরা টের পাই তাদের ঘুম আর জেগে থাকার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, ঘুম তাদের জন্যে জেগে থাকা আর জেগে থাকা তাদের জন্যে ঘুম। যাদের স্যান্ডেলের নিচে ভবিষ্যৎ তাদের মগজ ঘুম জানে না জাগা জানে না।
মহাদেশনেত্রী জাগনাভোয়াবে দেখেছেন–(এটা ঘুমনাখোয়ব হওয়ারই কথা, তবে ঘুম হচ্ছে না বলে জাগনাখোয়বেই তিনি দেখে ফেলেছেন, ফাইভের বইতে এমন খোয়াবের কথা তিনি হয়তো পড়েছিলেন বা দাদীর কাছে শুনেছিলেন কোনো সন্ধ্যায়, দীর্ঘকাল পরে সেটা তাঁর ভেতর থেকে সহজে জেগে উঠেছে)–আকাশে দশটি নীল আর লাল নতুন তারা উঠেছে, ধীরেধীরে সেগুলো একটি মুকুটে পরিণত হলো, অজস্র শাদা তারারা নেচে নেচে ওই মুকুট পরিয়ে দিলো তার মাথায়, আর আকাশের পশ্চিম থেকে উঠে এলো একটি সিংহাসন, তারারা তাকে সিংহাসনে বসিয়ে নত হয়ে চুম্বন করলো পদতলে।
খুবই উত্তম রাজকীয় ফিলিস্তিনি খোয়াব এটি, তাঁর রাজবংশের রাজপুত্ররা এতে গভীর ইঙ্গিত পেয়ে উল্লসিত হয়ে উঠলেন, আমরাও হৈচৈ শুরু করলাম। আমরা বুঝতে পারলাম হেলিকপ্টারে চড়ে আগামী বছরগুলোর বন্যা আর তুফানের সুন্দর দৃশ্যরাশি তারাই দেখবেন।
কিন্তু ঘুমনাখোয়াবে তিনি দেখলেন আকাশে বিশটি লাল আর সবুজ নতুন তারা উঠেছে, সেগুলো ধীরধীরে একটি অপূর্ব মুকুটে পরিণত হলো, অজস্র তারারা সেই তারার মুকুট তার মাথায় পরানোর জন্যে এগিয়ে আসছে, অমন সময় এক ডাইনি রাহু এসে ছোঁ মেরে সেই মুকুট নিয়ে নিজের মাথায় পরলো, তাঁর দিকে ছুঁড়ে দিলো মেঘ ঝড় অন্ধকার; তিনি অন্ধকারে চিৎকার করে উঠলেন।
খোয়াবটি কয়েক ঘণ্টা গোপন ফাইলে চেপে রাখা হয় পাথর দিয়ে, কিন্তু খোয়াবেরও নিজস্ব প্রাণশক্তি আছে বলে কেঁচোর মতো লিকলিক করে প্রকাশ পেয়ে যায়; তাঁর রাজপুত্ররা এতে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন, আমরাও উদ্বিগ্ন হই। আমরা বুঝতে পারি হেলিকপ্টারে চড়ে আগামী বছরগুলোর বন্যা আর তুফানের সুন্দর দৃশ্যরাশি অন্যরা দেখবেন।
মহাজননেত্রী জাগনাখোয়াবে দেখেছেন কোটি কোটি মানুষ মুকুট আর সিংহাসন মাথায় করে আসছে তার বাড়ির দিকে, তারা খুঁজছে তাদের প্রাণপ্রিয় রাজকন্যাকে, এবং তাঁর মাথায় পরিয়ে দিচ্ছে মুকুট, নাচতে নাচতে তাঁকে বসাচ্ছে সিংহাসনে। আমরা বুঝতে পারি আগামী বছরগুলোতে বারবার বিদেশভ্রমণে তিনি ও তাঁরাই যাবেন।

চমৎকার খুব ভাল লাগলো