পেটটি আরো ফুলছে আলি গোলামের, ফুলে ফুলে সিলিংয়ে ঠেকে গেছে, সেলিং হয়তো ভেঙে পড়বে, একবার তার মনে হলো পেটটি এক বিশাল উট হয়ে গেছে, যার আট-দশটা কুঁজ, সামনে পেছনে ডানে বাঁয়ে বেড়ে ঘর ভরে ফেলেছে; আলি গোলাম কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না, বিশাল পেটের নিচে তিনি মাছির মতো পড়ে আছেন। আমি কি মাছি, আমি কি তেলাপোকা, আমি কি ইন্দুর, আমি কি টিকটিকি, আমি কি মুরগির ছাও, আমি কি পোটকামাছ? এরকম ভাবনা আসে তার মাথায়, জট পাকিয়ে যায়। ভাবনাগুলো; তিনি একটি দীর্ঘ শ্লোক পড়তে চান, তবে তার মনে আসে না। আমি কাহা, নিজেকে প্রশ্ন করেন আলি গোলাম, আমি কি আছি, আমি কি ছিলাম, আমি কি থাকবো? তাঁর মনে হয় পেটের নিচে তিনি তিনশো চান্দ্র বছর ধরে চাপা পড়ে আছেন; তার পেট আরো ফুলে উঠছে, দেয়াল সিলিং ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে, পোটকামাছের ভেতর অনেকগুলো উট ঠেলাঠেলি করছে। আলি গোলাম চিৎকার করতে চান, পেটের নিচে তাঁর মুখ চাপা পড়ে আছে বলে পারেন না।
তাঁর পেট ফাটে না, অদ্ভুত পেট, ভেতরে ঘড়ঘড় শব্দ শুরু হয়, তিনি ওই শব্দ শোনার চেষ্টা করেন, ঠিকমতো শুনতে পান না। তিনি ট্রাট্রাট্রাট্রা শুনতে চান, কিন্তু ঘড়ঘড় শব্দ উঠতে থাকে পেট থেকে। আলি গোলাম হঠাৎ বমি করে ফেলেন; বমি বেরোতে না পেরে পেটের নিচে মুখের ওপর ঘন হয়ে জমে থাকে। আলি গোলাম একটি পরিচিত দুর্গন্ধ পান; ওই গন্ধটিকে তাঁর অদ্ভুত মধুর লাগে। একটু পর মুক্তি ঘটতে শুরু হয় আলি গোলামের পেছনের দিক দিয়ে প্রবল বেগে শুরু হয় নিঃসরণ, প্রচণ্ড শব্দ হতে থাকে, তীব্র বেগে তরলতা উৎক্ষিপ্ত হতে থাকে দিগ্বিদিক; তরল পদার্থের সাথে বেরোতে থাকে একটি দুটি তিনটি চারটি হাজার হাজার লাখ লাখ কোটি কোটি চানতারা, তিনি দেখতে পান, এতে চানতারা নেই আকাশে, চানতারায় তাঁর ঘর ভরে যেতে থাকে, তার শরীর আর মুখের ওপর দিয়ে প্লাবনের মতো প্রবাহিত হতে থাকে তরল চানতারার ঘন স্রোত; আলি গোলাম হাত দিয়ে মুঠো মুঠো চানতারার তরলতা তুলে চিৎকার করেন, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।
আলি গোলামের ঘুম ভেঙে যায়, শুনতে পান বাইরে একপাল কুকুর ডাকছে।
আলি গোলামের খোয়াব, ওই খোয়াবের ইতিবৃত্ত, অভিনবত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে যখন মশগুল ছিলাম আমরা, তখন আমাদের কাছে এসে পৌঁছে খোজারাজবংশের বাবরের খোয়াবের বিবরণ। বাবর সাহেব অনেক বছর আগে শ্রেষ্ঠ খোয়বি হিশেবে নাম করেছিলেন, তাকে আমরা খোয়াববন্ধু, খোয়াবপতি, খোয়াবশিল্পী, খোয়াবকৃষ্ণ প্রভৃতি উপাধিতে বিভূষিত করেছিলাম। তখন তিনি শক্তিশালী ছিলেন, আমাদের খোয়াববিজ্ঞানীরা তার খোয়বাবলি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন যে বিশ্বখোয়াবের ইতিহাসে খোজাবংশের বাবর শ্রেষ্ঠ খোয়াবি; পরে আবার তারাই দেখিয়েছিলেন যে তার খোয়াবগুলো খুবই নিকৃষ্ট, চামাররাও এর থেকে উৎকৃষ্ট খোয়াব দেখে, কেননা ওইগুলো খোয়াব দেখার সাতদিন আগে থেকে পুরোনো সিংগার মেশিনে পুরোনো কাপড়ে শেলাই করা, তালিমারা, জোড়া দেয়া, আঠালাগানো, জংধরা ও পচা। আজকাল তার নাম শুনলেই আমরা হাসি; তার খোয়াবের কথা শুনলে খোয়াব না শুনেই আমরা অতিশয় তৃতীয় শ্রেণীর হাসাহাসি করি।
আমাদের স্বভাবই এই; এককালে যাকে নিয়ে আমরা কাদাকাটি করতাম তাঁকে নিয়ে আজকাল আমরা হাসাহাসি করি। আজকাল যাঁদের নিয়ে আমরা কাদাকাটি করছি আগামীকাল তাঁদের নিয়েও আমরা অতিশয় চতুর্থ শ্রেণীর হাসাহাসি করবো।
খোজারাজবংশের মহাগণনেতা কারাকক্ষের এক কোণে বসে আছেন, এমন সময় খোয়াবটি এসে তাঁকে সরাসরি ধাক্কা দেয়।
কক্ষটি জুড়ে বেশ অন্ধকার, যদিও দুপুরবেলা; দেয়ালের এখান সেখান থেকে চুনকাম খসে পড়েছে, কয়েকটি মাকড়সা সিলিং থেকে সার্কাসের তরুণীদের মতো রগরগে খেলা দেখাচ্ছে, দুটি টিকটিকি হঠাৎ লাফিয়ে পড়ে তার পা মাড়িয়ে চলে গেলো। একটু দূরে মিলিত হয়েছে দুটি নির্লজ্জ তেলাপোকা।
এমন সময় খোয়াবটি এসে তাকে চাষার মতো সজোরে আক্রমণ করে।
মহাগণনেতা শুনতে পান নগর জুড়ে উৎসবের শব্দ উঠছে, অজস্র বাদ্য বাজছে, লা লাখ কণ্ঠস্বর কী যেনো ধ্বনিত করছে; প্রথম তিনি বুঝতে পারেন না, পরে বুঝতে পারেন নগরের জনগণ তাঁর নাম ধরে উচ্চকণ্ঠে শ্লোগান দিচ্ছে, বাদ্য বাজিয়ে তারা শ্লোগান দিতে দিতে এদিকে আসছে; তিনি স্পষ্ট শুনতে পান তারা জেলের তালা ভাঙবো মহাগণনেতাকে আনবো, তোমার নেতা আমার নেতা মহাগণনেতা মহাগণনেতা, ফুল এনেছি তাজা বেরিয়ে আসো রাজা শ্লোগান দিতে দিতে তারা এদিকে এগিয়ে আসছে। মুহূর্তের মধ্যে জনগণের বন্যার স্রোতে ভেসে যায় জেলখানা, লাখ লাখ মানুষ ঢুকে পড়ে জেলের ভেতরে। জেলের সব প্রহরী পালিয়ে বাঁচে। জনগণ তাঁকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে ঘোষণা করে ‘হে আমাদের রাজা, তুমি আমাদের চিরকালের রাজা; আমরা সব জালিমকে পুড়িয়ে মেরেছি, তোমাকে নিতে এসেছি আমাদের চিরদিনের রাজা করার জন্যে; তুমি আমাদের সম্রাট।’ তিনি দেখতে পান শহরের শ্রেষ্ঠ সুন্দরীরা (বয়স ৪৫ থেকে ৫৫) চুম্বন করছে তার পদতলে; তারা বলছে, তুমি শুধু দেশের রাজা নও, আমাদের বুকেরও রাজা।
তিনি লাফিয়ে উঠতে গিয়ে দেখেন একটি টিকটিকি ঝুলছে তার কানে (স্থানটি সম্পর্কে বিভিন্নজন বিভিন্ন মত পোষণ করেন)।

চমৎকার খুব ভাল লাগলো