খেজুরগাছের দেশ থেকে কিছুক্ষণ আগে তিনি এক মুরুব্বির ফোন পেয়েছেন; ফোন রাখার পরই তিনি খোয়াবটি দেখতে শুরু করেন। কয়েক রেকাত সালাতের ইচ্ছে ছিলো, কিন্তু মধুর খোয়াবটি এসে তাঁকে সালাতের কথা ভুলিয়ে দেয়।
আলি গোলাম প্রথম টগবগ টগবগ টগবগ টগবগ শব্দ শুনতে পান, তারপর চিঁহিঁ চিঁহিঁ চিঁহিঁ চিঁহিঁ চিঁহিঁ শব্দ শুনতে পান, পরে তলোয়ারের ঠনঠন শব্দ শুনতে পান, আরো পরে শুনতে পান ট্রা ট্রা ট্রা ট্রা ট্রা ট্রা ট্রা ট্রা।
আলি গোলাম দেখতে পান তার অশ্বারোহীরা আসছে, সপ্তদশ নয় হাজার হাজার, আকাশ থেকে বাতাস থেকে সড়ক দিয়ে গলি দিয়ে ধানক্ষেত মাড়িয়ে অ্যাভিনিউ ভেঙেচুরে তারা চানতারা পাক ঝান্ডা উড়িয়ে আসছে; ঘোড়ার খুরের শব্দে তিনি চান-তারা চান-তারা চান-তারা আওয়াজ শুনতে পান। পথে পথে কল্লা খসে পড়ছে বিধর্মীর, কাফেরের ময়লা রক্তে মাটি কালো হয়ে যাচ্ছে, চানতারা উড়ছে গাছে গাছে বাড়ির ছাদে ছাদে; পবিত্র হচ্ছে বাঙলাস্তান। একটু পরে চোখের কেতুর মুছে দেখতে পান ওগুলো অশ্ব নয়, তার সালেহিনরা ঘোড়ায় চড়ে আসে নি, আজকাল ঘোড়া নেই, ঘোড়ায় চড়ে কিছু দখল করা যায় না, তারা আসছে জিপে, ট্রাকে, আসছে ট্যাংকে কামান দাগিয়ে। তাদের হাতে তলোযার নেই, আজকাল তলোয়ারে চলে না; তারা আসছে মেশিনগান এসএলআর হাতে, মর্টার ছুঁড়ে, বেয়নেট চার্জ করতে করতে; আর তাদের পবিত্র পায়ের নিচে আত্মসমর্পণ করছে বিধর্মীরা। দিকে দিকে আহাজারি উঠেছে, ওই আহাজারি কাফেরদের, কাফেরদের আর্তনাদ তার কানে মধুর শ্লোকের মতো লাগছে; তার সালেহিনরা ভেঙে ফেলছে কাফেরদের দুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, বেলেহাজ মেয়েলোকগুলোকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পরিয়ে দিচ্ছে কাফনের মতো কালো বোরখা; তিনি দেখতে পান একটি চানতারা সিংহাসন এগিয়ে আসছে তার দিকে, তিনি গিয়ে বসছেন। চারদিকে শব্দ উঠছে জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।
আলি গোলাম উল্লাসে লাফিয়ে উঠে বলেন, দ্যাশে আর কাফের থাকিবে না, অন্য কোনো বহি থাকিবে না, আবু আলার রাষ্ট্র স্থাপিত হইল।
তার এমন উল্লাস আগে কেউ দেখে নি, তাঁকে পাহারা দেয় যে সালেহিনরা তারাও দেখে নি। তাঁর উল্লাস দেখে তারা ভয় পায়।
তারা দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করে, হে আমির, আপনি এমন করতেছেন ক্যান? আপনার মৃগীরোগটি কি আবার দ্যাখা দিয়াছে?
আলি গোলাম বলেন, মৃগীরোগ নহে, সালেহিনরা পাক ওয়াতান কায়েম করিয়াছে, তোমরা বন্দুক ফুটাও।
তারা বলে, হে আমির, আপনে খোয়াব দেখিতেছেন, কোনো পাক ওয়াতান কায়েম হয় নাই, বন্দুক ফুটাইলে আমাদের বিপদ হইবে।
আলি গোলাম বেদ্বীন বাস্তবে ফিরে এসে সালাত কায়েম করতে বসেন।
আলি গোলামের জাগনাখোয়াবের থেকে ঘুমনাখোয়াব অনেক বেশি আকর্ষণীয়; তার ওই খোয়বে আমাদের বাজার ছেয়ে গেছে, কয়েক দিন আমরা অন্য খোয়াব খরিদ না করে তাঁর ঘুমনাখোয়াব খেয়েই দিন কাটাই। ওই খোয়াবের মাজেজা আমরা বুঝতে পারি না, বোঝার আগেই আমরা ভয়ে চিৎকার করে উঠি, তারপর আবার ওই খোয়াব নিয়ে ফিসফিস করে আলাপ করি।
আলি গোলাম দুটি আতরমাখা কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে শুয়ে ছিলেন শুক্রবার রাতে, একটু দেরিই হয়ে গিয়েছিলো তাঁর; কে যেনো তাকে ধমকে বলে, ঘুমাও আলি গোলাম। ধমক খেয়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন।
ঘুমিয়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি খোয়াবটি দেখতে শুরু করেন।
আলি গোলাম দেখতে পান তিনি চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন, পরেছেন শুধু শালোয়ার, আর কিছু নেই। বুকের দিকে তাকিয়ে তার চোখে পড়ে পাকা পাকা পশমগুলো দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, প্রথম বেশ মজা পান তিনি; শীত লাগে নি অথচ পশম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, বুকটিকে তাঁর একটি খেজুরবাগান বলে মনে হয়, কিন্তু বুকে হাত দিতেই কয়েকটি লোম তার হাতে সুচের মতো বিধে যায়। তিনি তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে আনেন। তিনি উপুড় হতে গিয়ে পারেন না, সুচের মতো পশমগুলো বিধে যেতে থাকে; তিনি আবার চিৎ হয়ে শোন। পেটটি তার জন্মসূত্রেই স্ফীত, কিন্তু পেটের দিকে তাকিয়ে দেখেন পেটটি আস্তে আস্তে ফুলে উঠছে। তিনি বেশ তাজ্জব বোধ করেন, পেট ফোলার কোনো কারণ নেই, সেই সকালে দুটি মুরগি আর দশখান রুটি ছাড়া বিশেষ কিছু তিনি আহার করেন নি। অকারণে পেট ফুলে ওঠায় পেটটিকে তিনি কমিন কমজাত বলে তিরস্কার করেন, কিন্তু পেটটি তার ফুলে উঠতেই থাকে একটু একটু করে।
আলি গোলাম কয়েকটি শ্লোক আবৃত্তি করেন, কিন্তু তাতে পেটের ফোলা থামে না, বরং ধীরে ধীরে বাড়তেই থাকে। তিনি দু-হাতে পেটটিকে চেপে ধরেন যাতে আর ফুলতে না পারে, কিন্তু নদীর জোয়ার কেউ চেপে দমাতে পারে না, তার পেটও বাড়তেই থাকে। একবার তিনি উঠে বাথরুমে যেতে চান, কিন্তু নিজেকে এতো ভারি লাগে যে উঠতে পারেন না; আবার চিৎ হয়ে পড়েন। এখন পেটটি বেশ উঁচু হয়েছে, মোসাম্মৎ গোলাম বিনতে মর্জিনা খাতুনের জন্মের আগে বিবির উদর দেখতে যেমন মরা ভোলা ছাগলের মতো হয়েছিলো তেমন দেখায় তার পেটটি; তিনি বলে ওঠেন, ইহা হইতে পারে না, আমি পুরুষপোলা, আমার পেট হইতে পারে না, আমি সহবত করি নাই।
আলি গোলামের পেট বাড়তে থাকে, ভেতরে একটা খচ্চরের লাশ ঢুকে গেছে বলে মনে হয় তার; তিনি দেখেন সেটি বড়ো বস্তার মতো হয়ে উঠেছে, দু-হাতে বেড় পাচ্ছেন না; চিমটি কাটতে গিয়ে দেখেন চিমটি কাটতে পারছেন না, একবার ঘুষি দিয়ে দেখেন পেটটি লোহার সিন্দুকের মতো শক্ত পেটটি খুবই ভারি হয়ে উঠেছে; এখন তার মনে হয় পেটের ভেতর কী যেনো খটখট ট্রা ট্রা ভোম ভোম করছে, খচ্চর দৌড়াইতেছে, ভেতরে বিস্ফোরণ হচ্ছে। ওই শব্দে তার পেট আর দেহ আর খাট কেঁপেকেঁপে উঠছে। এমন বিস্ফোরণ রাস্তায় হ’লে তার শান্তি লাগতো, কিন্তু পেটের ভেতর হচ্ছে বলে তিনি কষ্ট পাচ্ছেন।

চমৎকার খুব ভাল লাগলো