ছমিরন বলে, আফা, কী অইছে আপনের আমাগো কন; আপনে এমুন কইরা হাডাহাডি করতাছেন ক্যান?
মিস বিউটি বলে, বোম্বে থিকা ফটোগ্রাফার আসছে, এইবার আমার ড্রিম ফুলফিল হইলো। আমি মডেল হব, হিরোয়িন হব, বোম্বে যাব।
মিস বিউটি তার গেঞ্জি আরো নামিয়ে আনে, দুটি বেশ বড়ো বস্তুর অর্ধেকের বেশি দেখা যায়।
শেফালি বলে, হ আফা, মডেল অইলে আপনেরে বড়ো মানাইব, আপনের ওই দুইডা মইনশা কৈরেলার দুইডারে ছাড়াই গ্যাছে।
মিস বিউটি শেফালিকে জড়িয়ে ধরে বলে, ডারলিং, কথাটা ট্র বললি তো?
ছমিরন বলে, হ আফা, আপনের পাছাও আল্লার রহমতে বড়ো মাদুরির চাইতে, হাডনের সোম খালি ফাল ফারে।
মিস বিউটি খিলখিল করে হাসতে থাকে, আমি মাধুরী হইবো কাজল হইবো; আই অ্যাম হিরোয়িন।
মিস বিউটি ক্যাট ওয়াক করতে থাকে, নাচতে থাকে, গাইতে থাকে; একবার গাছের গুঁড়ি ভেবে কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে।
ছমিরন আর শেফালি রান্নাঘরে গিয়ে একে অন্যকে বলে, দ্যাকতে মুরগির মতন, আর হে অইব মাদুরি, হে অইবো কাজল।
মোসাম্মৎ বেনজির হাফসানা রুবাইয়াত বিউটি ঘুমনাখোয়াবে দেখে ভিন্ন রকম ব্যাপার, যা জানতে আমাদের বেশ দেরি হয়; কেননা তার ওই খোয়াবটিকে চুড়ান্ত গোপনীয় বস্তু বলে অনেক দিন আটকে রাখা হয়। কিন্তু আমাদের সত্যের দেশে কিছুই গোপন থাকে না, সত্য একদিন এখানে প্রকাশ পেয়েই যায়; আমরা সত্য থেকে কখনোই বঞ্চিত হই না। মোসাম্মৎ বেনজিরের ওই সমস্যাটি শুরু থেকেই ছিলো, যেমন আছে আমাদের অধিকাংশ দ্বিতীয় লিঙ্গের, অর্থাৎ তার মাসিক নিয়মিত ছিলো না। কখনো মাসের পর মাস বন্ধ থাকতো, আবার কখনো মাসে দু-বার দেখা দিতে, কখনো গলগল করে ঝরতো, কখনো দেখা দিতে সামান্য ইঙ্গিত। একরাতে সে খোয়াব দেখে তার শরীর খুব ব্যথা করছে, মাথা ফেটে পড়ছে, তলপেট ভারি হয়ে উঠেছে; সে বুঝতে পারে তার সময় এসে গেছে, তাই সে সেনিটারি টাওয়েল খুঁজতে থাকে। কিন্তু সে দেখতে পায় গলগল করে কালচে রক্ত বেরিয়ে আসছে তার মুখ দিয়ে, নাক দিয়ে, তার সারা শরীরের লোমকূপ দিয়ে; শুধু যেখানে দিয়ে বেরোনোর কথা সে-স্থানটি থাকে ঝামাপাথরের মতো শুষ্ক। মোসাম্মৎ বেনজির হাফসানা রুবাইয়াত বিউটি ময়লা রক্তের স্রোতের নিচে হারিয়ে যেতে থাকে; সে দেখতে পায় রক্তে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে খাটপালং, বাড়িঘর, তাদের চারতলা দালান, বারিধারা, গুলশান, বনানী, বাস, ট্রাক, ঢাকা শহর, বুড়িগঙ্গা, সারাদেশ; সে চিৎকার করে, তার চিৎকার কেউ শুনতে পায় না।
শুধু আমরা নই, আমাদের নদীনালা খালবিল পুকুর জমি গরুগাভী পথঘাট নৌকো। জাল মাছ কাক চিল চড়ই টুনটুনি দোয়েল ঘরবাড়ি গাছপালা সাপ ব্যাঙ কেঁচো শেয়াল কুকর বেড়াল রিকশা লঞ্চ বাস ট্রাক পোল ব্রিজের দিকে তাকালেও মনে হয় তারা সবাই খোয়াব দেখছে। তাদের খোয়াবের কথা আমরা জানতে পারি না তারা কথা বলতে পারে না বলে; কিন্তু তাদের দিকে তাকালে মনে হয় তারা দিনরাত দুঃস্বপ্ন দেখে চলছে।
আমাদের ওই বালাসুরের পুকুরটির কথাই ধরা যাক; ওটির দিকে তাকালে মনে হয় ওটি পুকুর নয়, এটি কোনো দুঃস্বপ্নগ্রস্ত বদ্ধ পাগলের চোখ।
পুকুরটিতে অনেক বছর ধরে নতুন পানি আসে না। এক সময় ছিলো যখন বোশেখ শেষ হতে না হতে জ্যৈষ্ঠ আসতে না আসতে হালট উপচে খাল দিয়ে ধান তিল আর পাটখেতের ভেতর দিয়ে খেলার মাঠের সবুজ ঘাস কাঁপিয়ে চারদিক উথালপাথাল করে আসতো জোয়ার, থইথই করতো পুকুর, কেঁপে কেঁপে উঠতো; আজ ওই পুকুর কাঁপে না, জোয়ার আর ঢেউ কাকে বলে জানে না। পুকুর অবাক হয়ে ভাবে তার ভেতরের সেই পুঁটি নলা খলশে শিং মাগুর বাইন রয়না ভেটকি বাউশ সরপুঁটি বোয়াল কই আইর রুই কাতল গরমা ফলি চিতল গজার শোল নামের আনন্দগুলো গেলো কই? সেই কম্পনগুলো কোথায়? কোথায় সেই ঘাই ডাব লাফ? কোথায় টাকির পোনার সোনালি ঝাঁক? কোথায় শোলের পোনার লাল নৃত্য? কোথায় পানি? তার বুকে যতোটুকু পানি আছে, তা আর তার কাছে পানি মনে হয় না; মনে হয় চোখ ভরে ছড়িয়ে পড়েছে ঘোলাটে কেতুর। তার চোখ চটচট করছে, বন্ধ হয়ে আসছে; সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।
পুকুরটির দিকে তাকালে বুঝতে পারি পুকুরটি জোয়ারের নতুন পানির উল্লাসের স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু জোয়ার আর আসবে না।
পুকুরটির দিকে তাকালে বুঝতে পারি পুকুরটি রুইমাছের লাল গতির স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু রুইমাছ আর আসবে না।
পুকুরটির দিকে তাকালে বুঝতে পারি পুকুরটি কেঁপে কেঁপে ওঠার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু পুকুর আর কেঁপে কেঁপে উঠবে না।
আমরা সবাই খোয়াব দেখছি, তবে এখন সবচেয়ে বেশি খোয়াব দেখছেন আমাদের রাজারা; খোয়াবে খোয়াবে তারা ঘেমে উঠছেন, খোয়াবে খোয়াবে তারা সুখে ভ’রে উঠছেন; এবং আমরা তাদের খোয়বের বিবরণ নিয়ে মেতে আছি। ঘর থেকে বেরোলেই আমরা একে অন্যকে জিজ্ঞেস করি, রাজারা আমাদের আজ কী খোয়াব দেখেছেন? আমরা তাদের খোয়াব নিয়ে দিনরাত আলোচনা করি, তাদের খোয়াবের ওপরই নির্ভর করে আমাদের জীবন, বিশেষ করে মরণ।
প্রথম আমাদের কানে আসে রাজাকার রাজবংশের অধ্যাপক আলি গোলামের খোয়াবের কথা; তাঁর জাগনাখোয়াব আর ঘুমনাখোয়ব দুটির কথাই আমরা জানতে পারি, জেনে আমরা উল্লাস আর ভয়ে কুঁকড়ে যাই।

চমৎকার খুব ভাল লাগলো