চার বছর পর ওই মনিবের কারখানা থেকে তারা বেরিয়ে পড়ে। তাদের সবার চোখে একটি করে স্বপ্ন আছে, সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্ন, টাকার স্বপ্ন। তারা বেশ কিছু টাকা করেছে, বুদ্ধি করে দেশেও টাকা পাঠিয়েছে, এমপি সাহেবের মাধ্যমে পাঠায় নি–মনে হয় তারা কী যেনো বুঝতে পেরেছে; আরো বুঝতে পারে দাস হয়ে থাকলে টাকা হয়, আর দাস হয়েই যদি থাকতে হয়, তাহলে কোরিয়ায় কেননা, তার চেয়ে ভালো জাপান। বাঙলাদেশে ফিরতে তাদের ইচ্ছে করে না, মাঝেমাঝে শুধু স্বপ্নে দেশে ফেরে, মাবাবাকে, ভাইবোনকে দেখে, এবং হঠাৎ দুঃস্বপ্ন দেখে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। তাই দেশকে তারা স্বপ্নেও দেখতে চায় না। জাপান হয়ে ওঠে তাদের স্বপ্ন, দাসদের স্বপ্নের দেশ জাপান। তাদের চেনা কয়েকজন এর মাঝে জাপান চলে গেছে, মাসে লাখ টাকা রুজি করছে; তারা আর কোরিয়ায় চল্লিশ হাজার রুজি করতে চায় না। তাদের গলাকাটা পাসপোর্ট আছে, তাদের মতো দাস স্বপ্নের দেশে যাওয়ার অনুমতি পেতে পারে না। কোরিয়াই কি তাদের অনুমতি দিয়েছিলো, তারা অনুমতি চেয়েছিলো? তবু কি তারা কোরিয়ায় আসে নি, মাসে মাসে চল্লিশ হাজার রুজি করে নি; সুন্দর সুন্দর রঙিন ছবি তোলে নি; দুই চার পাইন্ট বিয়ার খায় নি? অনুমতি চাইলে আর সীমা মানলে এখন তারা কোথায় থাকতো? কেউ তাদের অনুমতি দেবে না, তারাও অনুমতি নেবে না, শুধু তারা সীমা পেরিয়ে যাবে–স্বাধীন হওয়ার জন্যে নয়, বিশ্ব আবিষ্কার করার জন্যে নয়, শুধু দাস হওয়ার জন্যে।
সেই ছেলেরা জানতে পারে জাপানে যাওয়ার উপায় আছে, মানুষ হিশেবে নয়, মাল, হয়ে তারা জাপান যেতে পারে। তাদের চেনা কয়েকজন বাঙালি বাঙলাদেশি মাসখানেক আগে মাল হয়েই জাপানে পৌঁছে গেছে, কোনো অসুবিধা হয় নি, ফোন করে তারা জানিয়েছে, তারা ইয়ামাগুচির জেলেদের কারখানায় মাছ প্যাক করছে, মাসে লাখখানেক থাকবে। মাস তিনেকেই জাপানে আসার খরচটা উঠে যাবে, তারপর শুধু জমবে। স্বর্গ ভরেই টাকা ছড়ানো, দিনে আঠারো ঘণ্টা ধরে কুড়োতে হবে, চাইলে আরো বেশি সময় ধরেও কুড়োতে পারে। তারাও জাপান যাবে, মাল হয়েই যাবে; দাস তো মানুষ না, মালই, মালের থেকেও খারাপ; মালের দামই আজকাল বেশি, মাল ছাড়া অন্য কিছুরই দাম নেই, তাই মাল হ’তে তাদের কোনো কষ্ট নেই, শুধু বেহেস্তে গিয়ে পৌঁছতে পারলেই হয়, লাখখানেক থাকলেই হয়। পুসানের সাগর পার থেকে উঠতে হবে ট্রলারে, যাত্রী হিশেবে নয়, মাল হিশেবে, তারপর তিনশো কিলোমিটারের মতো সাগর, ইয়ামাগুচির সাগর পারে গিয়ে ট্রলার ভিড়তে লাগবে সাত আট ঘণ্টা; আর ওই সময়টা, ট্রলার ছাড়ার ঘণ্টাখানেক আগে থেকে ট্রলার ভেড়ার ঘণ্টাখানেক পর পর্যন্ত, দশ ঘণ্টার মতো সময় তাদের থাকতে হবে মাছের বিশাল কন্টেইনারের ভেতর ভ’রে কন্টেইনার আটকে দেয়া হবে, মাছের মতো থাকবে তারা, তবে ব্যবস্থাটা বেশ আধুনিক, কোরিয়া জাপানের মতো উন্নত দেশেই সম্ভব, স্মাগলারাও এখানে বিজ্ঞান জানে কন্টেইনারের ভেতর দশ বারোঘণ্টার জন্যে অক্সিজেনেরও ব্যবস্থা করা হবে, বাতাসের থেকেও ভালো, কোনোই অসুবিধা হবে না। একটু অন্ধকার লাগবে, প্রচুর মাছের গন্ধের স্বাদ পাবে, ইচ্ছে করলে ঘুমিয়েও পড়তে পারে তারা, কোনো বাধা নেই; ঠিক সময়ে দেখতে পাবে কন্টেইনার খুলে বের করা হচ্ছে তাদের, ছেড়ে দেয়া হচ্ছে সাগর পারের নির্জন জঙ্গলে।
সে-রাতে ট্রলার পোঁছতে দেরি হয়ে যায়, মাঝপথে ইঞ্জিন বিকল হয়ে কয়েক ঘণ্টা দেরি হয়; ইয়ামাগুচিতে যখন কন্টেইনার খুলে আমাদের সেই ছেলেদের বের করা হয়, তখন তারা মাছের মতোই মৃত। অক্সিজেন ফুরিয়ে গিয়েছিলো।
তাদের লাশ ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয় কোরীয় উপসাগরে। তারা তাদের স্বপ্নের দেশ জাপানে পৌঁচেছিলো; তাদের আর দুঃস্বপ্নের দেশে ফিরতে হয় নি।
আমরা খোয়বের দেশের মানুষ; রোজ দুই তিন বেলা আমরা ভাত খাই, অনেকে একবেলাও খেতে পাই না, কিন্তু দশ বিশ বেলা আমরা খোয়াব দেখি, তার থেকে বেশিও দেখি হাতে কোনো কাজ না থাকলে, অনেকে সারাজীবনটাই খোয়াবের মধ্যে কাটিয়ে দিই। আমাদের পথেঘাটে বিরাট বিরাট খোয়াবির দেখা মেলে; ওই খোয়াবিদের মহৎ জীবনকাহিনী আমরা দুই হাতে লিখে ছেলেমেয়েদের বইতে পাঠ্য করে দিই। খোয়াব আমাদের দুই রকম, জাগনাখোয়ব আর ঘুমনাখোয়াব; দুই খোয়াবে দু-রকম জিনিশ দেখি আমরা; আর জেগে দেখা স্বপ্ন ও ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্নের গোলমালে আমাদের রক্ত শহরের বস্তির ড্রেনের পানির মতো ময়লা হয়ে যেতে থাকে।
গাদিঘাটের আলালদ্দির খোয়াবের কথাই প্রথম মনে আসছে।
কয়েক দিন আগে আলালদ্দি বাড়ির পুবপাশের জামগাছটির নিচে বসে ছিলো, ছেঁড়া লুঙ্গির ভেতর থেকে বেরিয়ে ঢলঢল করছিলো তার হোল দুটি, কেনো সে বসে ছিলো। সে জানতো না; শুকনো পুকুরটির দিকে তাকিয়ে তার কেমন লাগছিলো, তা সে বুঝতে পারছিলো না; এমন সময় সে খোয়াব দেখে সে বিলের দিকে যাচ্ছে, আর তার সামনে হালটের ওপর লাফিয়ে ওঠে দুটি লাল রুইমাছ। দু-পাশেই পানি টলমল করছে কচুরিপানা আর দলঘাসের ভেতর, মাঝখানে সরু হাটের ওপর লাফাচ্ছে দুটি রুইমাছ; আলালদ্দি দুটির ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়ে, একটি ধরতে গেলে আরেকটি পিছলে যায়, হাতে একটি দুটি আঁশ আর সারা শরীরে অপূর্ব গন্ধ লেগে থাকে, আর দু-একটি লাফ দিতে পারলেই মাছ দুটি পানিতে গিয়ে পড়বে, আলালদ্দি মাছ দুটির ওপর বারবার লাফিয়ে পড়তে থাকে, কিছুতেই একটিকেও আর পানিতে ফিরে যেতে দেবে না, সে দেয় না, দুটি মাছেরই কানসার ভেতর দিয়ে সে হাত ঢুকিয়ে দেয়, হাত ঢুকোতে গিয়ে হাত তার কেটে যায়, কিন্তু সে মাছ দুটিকে ছাড়ে না, মাছ দুটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আনন্দে সে তার ছেলের নাম ধরে চিৎকার করে ডেকে ওঠে।

চমৎকার খুব ভাল লাগলো