আমাদের সেই ছেলেরা, এমপি সাহেবের সাত পুত্র, তার লম্বা শক্ত হাতেরা কোথায় গেলো?
আমরা দূরের মানুষ, আমরা কী করে জানবো? আমরা শুধু দেখতে পাই সেই সাত ছেলের বাপেরা আর ভাইয়েরা শুধু ঢাকা যাচ্ছে আর ফিরে আসছে, কারো সাথে বেশি কথা বলছে না, মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ছে পাঁচ সাতবার, মুখ খুব ভার। কয়েক দিন পর দেখতে পেলাম মুখ থেকে ভারটা নেমে গেছে, কিন্তু হাত পা কাঁপছে। কিন্তু আমরা কিছু জানতে পারি না, জানতেও চাই না। সেই ছেলেদের সংবাদটা আমরা পাই অনেক পরে।
শুনতে পাই এমপি সাহেব তাদের নিজের কারখানার গুদামে লুকিয়ে রাখেন; এবং চার দিনের দিন বলেন, পোলারা, ভাবছিলাম তোমাগো বাঁচাইতে পারুম, এখন। দ্যাখতেছি সেইটা সম্ভব হইবো না।
ছেলেরা জানতে চায়, আমাগো কী অইবো, ছার? আপনে আমাগো বাঁচান; আপনের লিগাই তো আমরা ওই কাম করলাম।
এমপি সাহেব বলেন, কামটা তোমরা ভালই করছে, তবে সেই কথা কোনো দিন কারে বইলো না; কিন্তু দ্যাশে থাকলে তোমাগো বাঁচান যাইবো না।
ছেলেরা জিজ্ঞেস করে, আমরা তয় কই যামু? যামু কেমনে?
এমপি সাহেব বলেন, আমি তোমাগো কোরিয়া পাঠাই দিতেছি, আমার ম্যান পাওয়ার কম্পানিই তোমাগো পাঠানের ব্যবস্থা করবো, কেউ জানবো না।
তারা বলে, দ্যান, ছার, আমাগো পাঠাই দ্যান।
এমপি সাহেব বলেন, হ, তোমাগো কোরিয়া পাঠাই দিমু, আমার লোকরা তোমাগো এয়ারপোর্ট পার কইর্যা ছাইড়া দিব, তারপর তোমরা নিজেরাই কাজকাম খুইজ্যা লইতে পারবা। কোরিয়ায় কামের আইজকাইল অভাব নাই, জাপানরে হারাই দিতেছে, মালিকরা রাস্তাঘাটে বাংলাদেশি লেবারার খোঁজে।
তারা বলে, হ, পাঠাই দ্যান, ছার, কাম আমরা পামু। কাম করতে আমাগো কষ্ট অইবো না, দিনরাইত খাটুম।
এমপি সাহেব বলেন, এই গুদাম থেইক্যাই দুই তিন দিনের মইধ্যে তোমাগো রাইতে গিয়া প্লেনে উটতে হইবো, বাপমা ভাইবোনের লগে দেখা করতে পারবা না। তয় যাওনের আগে এয়ারপোর্টে একবার দ্যাখা করনের ব্যবস্থা কইরা দিমু। দূর থিকা তাগো দ্যাখতে পাইবা, তোমাগোও তারা দ্যাখতে পাইবো। কোরিয়ায় গিয়া তোমরা লাখ লাখ টাকা কামাই করবা, কোটিপতি হইয়া দশ পোনর বছর পর দ্যাশে ফিরবা।
ছেলেরা খুব কৃতজ্ঞ বোধ করে, এমপি সাহেবের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে, মনে হয় তিনিই তাদের বাবা।
এমপি সাহেব সাত ছেলের বাপভাইদের নিয়ে গোপনে বসেন।
এমপি সাহেব বলেন, দ্যাশে রাখলে অগো বাঁচান যাইবো না, তাই ভাবতেছি অগো কোরিয়া পাঠাই দিমু।
তারা বলে, দ্যান, ছার, অরা অইখানে গিয়া বাচুক।
তারা খুব কৃতজ্ঞ বোধ করে, এমপি সাহেব মহৎ মানুষ।
এমপি সাহেব বলেন, সব খরচ আমিই দিমু, কোরিয়ায় অগো কামের ব্যবস্থাও কইরা দিমু, তয় প্লেন ফেয়ারটা আপনেগো দিতে হইবো।
তারা সবাই চমকে ওঠে।
এমপি সাহেব বলেন, বেশি লাগবো না, সাতজনের আড়াই লাক তিন লাক হইলেই হইবো।
তারা বলে, এতো টাকা ত আমাগো হাতে নাই, ছার, এত ট্যাকা কই পামু?
এমপি সাহেব বলেন, অরা ত আর সাতরাইয়া যাইতে পারবো না, যাইতে হইবো প্লেনে চইর্যাই, আর তার জইন্যে ভারাও লাগবো। থাকলে আমিই দিতাম, আমার হাতে আইজকাইল ট্যাকা নাই।
তারা কিছু বুঝতে না পেরে এমপি সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
এমপি সাহেব বলেন, বাঁচতে চাইলে অগো দ্যাশ ছারনই লাগবো। দরকার হইলে জমিজমা কিছু বেইচ্যা দেন, ট্যাকা উশিল হইয়া যাইবো। কোরিয়ায় গিয়া অরা লাক লাক ট্যাকা কামাই করবো।
কিন্তু জমিজমা যা আছে, তা বেচলে তারা খাবে কী, থাকবে কোথায়; আর এতো তাড়াতাড়ি বেচবেই কার কাছে? তাদের মনে হয় তারা খুন হয়ে গেছে তাদের ছেলেদের হাতে; কিন্তু তাদের ছেলেরা খুন হয়ে যাক ফাঁসিতে ঝুলুক এটা তারা চাইতে পারছে না।
একজন বলে, ছার, যা জমিজমা আছে, তা বেচলে নিজেগো খাঅনই চলবো না, থাকনেরও জায়গা থাকবো না।
এমপি সাহেব বলেন, আল্লায় না খাওয়াই রাখবো না, আল্লায় থাকন খাঅনের একটা ব্যবস্থা কইর্যাই দিবো।
এক পিতা বলে, তাও না বেইচ্যাই দিলাম, তয় এত তরাতরি কিনবো কে, কার কাছে বেচুম?
এমপি সাহেব বলেন, হ, সেইটা একটা কথা; আর জানাজানি হইয়া গেলেও বিপদ আছে, লোকে জানতে চাইবো জমিজমা ব্যাচতেছেন কেন?
তারা কিছুক্ষণ ধরে উদ্ধারহীন সংকটে পড়ে, এবং তাদের উদ্ধার করেন এমপি সাহেবই।
এমপি সাহেব বলেন, আমি আপনেগো জইন্যে এইটা করতে পারি চাইলে আপনেরা আমার ছেলেদের কাছে বেচতে পারেন, তাগো নামে রেজিস্ট্রি কইর্যা দেন, তাগো ট্যাকা থিকা আমি আপনেগো ট্যাকাটা দিয়া দেই। অই ট্যাকা দিয়া টিকেট কিইন্যা দেই।
এমপি সাহেব মহৎ মানুষ; দু-তিন দিনের মধ্যেই তিনি সেই সাত ছেলেকে কোরিয়া পাঠিয়ে দেন, তার ম্যান পাওয়ার কোম্পানির লোকেরা সেই ছেলেদের এয়ারপোর্ট পার করে রাজধানির পথে ছেড়ে দেয়; বিমান ওঠার আগে দূর থেকে সেই ছেলেরা একবার দেখতে পায় তাদের পিতামাতাদের, আর পিতামাতারা দূর থেকে দেখতে পায় সেই ছেলেদের। তাদের বুক এই দেখায় ভরে আছে। আমাদের সেই ছেলেরা খুন করতে পারতো; তারা কি কাজ করতে পারতো না? দেশে কাজ নেই, তাই তারা কাজ করবে কোথায়, আর করবেই বা কী কাজ? দেশে খুন করা আছে, কাঁটা তুলে ফেলা আছে, পথ পরিষ্কার করা আছে, তাই তারা খুন করতো, কাঁটা তুলে ফেলতো, পথ পরিষ্কার করতো। কোরিয়ায় কাজ আছে, পলাতকের জন্যেও আছে; সেখানে তারা দিনরাত কাজ করে, লুকিয়ে থেকে কাজ করে, সেখানকার চুং চাং দুং দিং মনিবেরাও জানে কীভাবে ঠকাতে হয়, তারা তাদের ঠকায়, কারখানার জেলের মধ্যে অনেকটা আটকেই রাখে; কিন্তু আমাদের সেই ছেলেরা সেখানে কাজ করে। তাদের হাতে এক সময় পিস্তল ছিলো, সে-কথা তারা ভুলে যায়। দাস হিশেবে তারা ভালো।

চমৎকার খুব ভাল লাগলো