ছেলেটি বলতো, ওই লোনের টাকা তুমি এভাবে অপচয় করতে পারো না।
এমপি সাহেব ছেলের কথায় হো হো করে হাসতেন, বলতেন, বাবা, তুমি একটা গ্রেট ম্যান হইতেছে, তোমারে লইয়া আমি প্রাউড ফিল করি, আমি আমার এমপি ভাইগো তোমার কথা কই, তারা কয় তুমি জর্জ ওয়াশিংটন আর ইব্রাহিম লিংকনের মতন গ্রেট ম্যান হইবা, আমেরিকা আছো বইল্যাই এইটা হইতে পারতেছো, বাবা; আমাগো দেশে তোমার মতন গ্রেট ম্যান দরকার, গ্রেট লিডার দরকার; তুমি দ্যাশে আসবা, দ্যাশটা উদ্ধার করবা, বড় ন্যাতা হইবা।
এমপি সাহেব কথাগুলো বলে সুখ পান, নিজেকে তার ওয়াশিংটন লিংকনের বাপজান মনে হয়; তার আরো ভালো ভালো কথা বলতে ইচ্ছে হয়, এবং তিনি বলতে থাকেন, বাবা, আমরা সব এমপি ভাইরা, পলিটিশিয়ানরা, ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টরা আমাগো পোলামাইয়াগো আমেরিকা, ইংল্যান্ড, দিল্লি, দার্জিলিং পাঠাই দিছি তারা সেইখানে থাইক্যা লেখাপড়া শিখ্যা গ্রেট ম্যান হইয়া দ্যাশে ফিরবো, একদিন দ্যাশের ভার লইবো, তুমিও দ্যাশের ভার লইবা, বাবা।
ছেলেটি বলতো, আব্বা, আমি দেশে কখনো আসবো না, তোমাদের কাজ দেখে দেখে আমার ঘেন্না ধরে গেছে; আই হেইট দোজ করাপ্ট ইলিজিটিমেট এমপিজ অ্যান্ড রাসকল পলিটিশিয়ান্স।
এমপি সাহেব ভয় পেয়ে বলতেন, এইটা তুমি কী বলতেছো, বাবা; তুমি দ্যাশে না আসলে আমি এই মিলকারখানা বাড়িগাড়ি কাগো লিগা করলাম, আর আমি তোমার এমপি হওনের পথও তৈরি কইর্যা রাখছি। তুমি এমপি হইবা, মন্ত্রী হইবা, পারলে প্রধান মন্ত্রী হইবা, বাবা।
প্রধান মন্ত্রী কথাটি নিজের কানে শুনেই তিনি ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার মতো ভয় পান, তাকিয়ে দেখেন কেউ আছে কি না, কেউ শুনলে ভাবতে পারে তিনি ষড়যন্ত্র করছেন। সিআইএ, র, বা অন্য কারো সাথে। আমাদের অসাধারণ দেশগুলোতে প্রধান মন্ত্রী কি যে সে হতে পারে? একটি মরা বাপ দাদা নানা স্বামী শ্বশুর থাকতে হবে না? একটা বড়ো মাজার থাকতে হবে না? তিনি কে? তার কী আছে? তার বাপটার লাশ তো জংলা গোরস্থানে কুত্তায় খেয়েছে। হ্যাঁ, তিনি মরে গেলে তার নাম ভাঙিয়ে ছেলেমেয়েরা এমপি হতে পারবে, সে পথ তিনি পরিষ্কার করেছেন। এটাই ক-জন পারে?
ছেলেটি বলতো, এমপি আর মন্ত্রী হওয়ার থেকে আমি কুকুর হওয়াও বেশি পছন্দ করি, আব্বা।
এমপি সাহেব হায় হায় করে ওঠেন, এ কি কথা তুমি বলতেছো, বাবা, আমার বুক ভাইঙা যাইতেছে।
ছেলেটি একদিন বলে, আব্বা, আম্মা ফোন করেছিলো কালকে।
এমপি সাহেব কেঁপে উঠে জিজ্ঞেস করেন, তোমার আম্মায় আবার কী জইন্যো ফোন করলো? আমারে কইলেই ত পারতো।
ছেলেটি বলে, শি কমপ্লেইনড অ্যাগেইনস্ট ইউ, আব্বা।
ভয়ে ভয়ে এমপি সাহেব জিজ্ঞেস করেন, কী কমপ্লেন করলো, বাবা?
ছেলেটি বলে, তা বলতে আমার ঘেন্না হচ্ছে।
এমপি সাহেবের মনে হয় লাইনটা যদি এখন কাট হয়ে যেতো, তাহলে ভালো হতো; এই ঢাকার কলো লাইনই যখনতখন কাট হয়ে যায়, তারপর পাঁচ ঘণ্টা ঘোরালেও আর পাওয়া যায় না, কিন্তু এটা কাট হচ্ছে না, আমেরিকার সঙ্গে লাইন তো, তাই কাট হচ্ছে না। ঘেমে ওঠেন এমপি সাহেব।
ছেলেটি বলে, বাট আই মাস্ট টেল ইউ, আম্মা বলেছেন তুমি মেইড সার্ভেন্টগুলোর সাথেও থাকো, আবার হোস্টেলে অ্যাক্ট্রেস কলগার্লও ওঠাও।
এমপি সাহেব বলেন, তোমার আম্মা বুড়া হইতেছে, আর পাগল হইতেছে, আর আমার নামে যা তা বলতেছে, তার ভাল হইবো না, তারে আমি আইজই বুঝাই দিতেছি।
ছেলেটি বলে, তবে তোমার ওই কাজে আমি বিশেষ হার্ট হই নি, তোমরা পলিটিশিয়ানরা অল অ্যারাউন্ড দি গ্লোব এ-কাজই করছো, পিপলের টাকা চুরি করছো, ব্যাংক লুট করছো, কলগার্লের সঙ্গে রাত কাটাচ্ছো, পরের বউ ভাগাচ্ছো, তিন চারটা মিস্ট্রেস রাখছো, মাফিয়া পুষছে, আর মুখে বড়ো বড়ো কথা বলছো, সব কিছু করাপ্ট করাই তোমাদের কাজ, তা তোমরা করবেই, বাট নেভার ট্রাই টু হিট মাই মাদার অ্যান্ড নেভার থিংক অফ লিভিং হার, তাহলে বিপদে পড়বে, ইউ উইল বি ইন ডিপ ট্রাবল।
তার ছেলে টেলিফোন রেখে দেয়।
এমপি সাহেব হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করেন; আর মনে মনে বলেন, মাইয়ালোকটার সব কিছু যতই ঢিলা হইয়া যাইতেছে, তার মুখটাও ততই ঢিলা হইয়া যাইতেছ, পোলার কাছেও এইসব কয়।
বুকভরা এমন গভীর অসীম শূন্যতা নিয়ে এমপি সাহেব সেই সাতটি ছেলেকে নিজের করে নিয়েছিলেন; তারা তার সাতটি লম্বা শক্ত হাত, যে-হাত দিয়ে তিনি মাঝেমাঝে মগজ ও রক্ত খেতে পছন্দ করেন। একদিন তিনি তাদের একটি কাজ দেন; কাজটি খুবই জরুরি, পথ পরিষ্কারের কাজ; নিজের পথে কাঁটা থাকা তার ভালো লাগে না, তাই তিনি তাদের কাজ দেন দুটি কাটাকে–আপ্তাজদ্দিন ও তার ছেলেকে, তুলে ফেলার। কাঁটা দুটি খুব বেড়ে উঠেছে, পায়ে লাগছে। সেই ছেলেরা একরাতে পরিষ্কারভাবে দুনিয়া আর রাজনীতি থেকে তুলে ফেলে ওই দুজনকে; আমরা তা জানতে পেরে অল্প অল্প শিউরে উঠি, কিন্তু কোনো কথা বলি না। আপ্তাজদ্দিন ও তার ছেলে গেছে, তাতে আমাদের কী? সেও কি এমনভাবেই তুলে ফেলে নি শেখ আনসারুদ্দিনকে; আর পারলে সে কি তুলে ফেলতে না এমপি সাহেবকে? কাঁটা তুলে ফেললে পথে হাঁটা যায় কী করে? পুলিশ কয়েক দিন খুবই ঘোরাফেরা করলো গ্রামে, এমপি সাহেবের পেছনে পেছনে আমরা তাদের পোষা প্রভুভক্তগুলোর মতো হাঁটতে দেখলাম, ইস্কুলের দুটি ছেলে আর মাঠের তিনটি রাখালকে তারা ধরে নিয়ে গেলো, এমপি সাহেব কয়েক বার গিয়ে আপ্তাজদ্দিনের দুই বউকে ধরে কাদলেন, এবং সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে গেলো।

চমৎকার খুব ভাল লাগলো