আমাদের কয়েকটি ছেলের কথা মনে পড়ছে; যদিও ওদের কথা মনে না পড়াই ভালো; আর আমরা মনে করতেও চাই না।
আমাদের ওই ছেলেরা নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো, আমরা তাই ভাবতাম, আমাদের ছেলেরা তো নষ্ট হবেই, ওদের আমরা জন্মই দিই নষ্ট হওয়ার জন্যে, আমাদের ধাতু আর জরায়ুতেই দোষ আছে, পচন লেগেছে ওই দুই জিনিশে; ওরা ইস্কুল থেকেই পাশ করে বেরোতে পারে নি; আর আমাদের, অর্থাৎ ওদের বাবাদের বড়ো দোষ হচ্ছে তাদের এতো টাকা কই যে ওদের নিউইয়র্ক বা দিল্লি পাঠিয়ে দেবে সভ্য শিক্ষিত হতে, বা কিনে দেবে সাগর ১, ২, ৩, মহাসাগর ৪, ৫, ৬, উপসাগর ৭, ৮, ৯, ১০ নামের পাঁচ দশটা তেতলা লঞ্চ, যেগুলো চলবে ঢাকা থেকে ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপের পথে, বা দোকান নিয়ে দেবে ঢাকার সুপারমার্কেটে, পাজেরো কিনে দেবে; আর এতো শক্তি কই যে ব্যাংক লুঠ করে এনে দেবে পঞ্চাশ কোটি টাকা। হতো ওরা রাজাদের ছেলে, ওরা নষ্ট হতো না, রাজা হওয়ার জন্যে প্রস্তুত হতো। ওদের তখন কিছুই করার ছিলো না, তাই ওরা একটি কাজই করতে পারতো, নষ্ট হতে পারতো। নষ্টই বলি কী করে? ওই এলাকার এলাকার নামও কি বলতে হবে?–বলার দরকার নেই, যে-কোনো এলাকার নাম নিলেই চলবে, এমপি সাহেব যেভাবে এমপি হয়েছেন, ওরা সেই কাজ শুরু করে, টিকে থাকলে ওরাও একদিন এমপি হতো; ওরা প্রথম এমপি সাহেবের রাজবংশে যোগ দেয়। মাননীয় এমপি সাহেবের এমপি হওয়ার জন্যে ওদের খুব দরকার ছিলো।
এমপি সাহেব তখন, আরো অনেক মাননীয় এমপি সাহেবের মতো, এক রাজবংশ থেকে আরেক রাজবংশে এসেছেন; তিনি রাজাদের রাজবংশেই থাকতে পছন্দ করেন। যে-রাজবংশ সিংহাসনে নেই, তিনি সেই রাজবংশে থাকেন না; তাতে পাপ হয়, তাঁর। বিশ্বাস রাজার বিরুদ্ধে থাকা আর আল্লার বিরুদ্ধে থাকা একই কথা। তিনি ইমান নষ্ট করতে চান না; তিনি সব সময় রাজা আর আল্লার পক্ষে থাকতে চান।
এতে তাঁর মঙ্গল হয় এটা আমরা সব সময়ই দেখতে পাই। রাজা আর আল্লা দুই হাতে ঢেলে তাকে সব কিছুই দেন।
কিন্তু ইমানদার লোকেরও শক্রর অভাব হয় না, অন্য রাজবংশে যোগ দেয়ার পর তারও শত্রু বাড়ে; এবং তিনি আমাদের ওই সাতজন ছেলেকে নিজের বুকে টেনে নেন। নেবেন না কেনো, তিনি ওদের দুঃখ বোঝেন; তিরিশ বছর আগে তাঁর দুঃখ বুঝে সেই কালের এমপি সাহেবও তাকে বুকে টেনে নিয়ে একখানি জিনিশ ধরিয়ে দিয়েছিলেন। ওই জিনিশটা তাকে এতো দূর নিয়ে এসেছে। তিনি ওদের সবখানেই নিয়ে যেতেন, তার সাথে ওরা পাজেরোতে চলতো, তিনি গাড়ি থেকে নেমে কোলাকোলি আর দু-হাত মেলানোর সময় ওরা তাকে ঘিরে থাকতো, আমরা দেখতাম ওদের জামা উঁচু হয়ে আছে, পকেট ফুলে আছে, মাঝেমাঝে ওরা কালো জিনিশটি নিয়ে নিজেরাই একলা একলা খেলতো, দেখে আমরা মুগ্ধ হতাম। এমপি সাহেব ওদের আদর করতেন, সবখানেই পরিচয় করিয়ে দিতেন ওরা আমার ছেলে।
এমপি সাহেব মহান পিতা; নিজের দুই পুত্রকে তিনি আমেরিকায় পাঠিয়ে দিয়ে বুকে খুব শূন্যতা অনুভব করতেন, ওরা তার সেই শূন্য বুক ভরে রাখতো। ফ্রি টেলিফোনে তিনি নিজের পুত্রদের সাথে সব সময়ই কথা বলতেন, পুত্ররা লেখাপড়া শিখে মানুষ হচ্ছে শুনে বুক তার ভরে উঠতো; কিন্তু টেলিফোনের কথায় কি পিতৃস্নেহ মেটে, পিতার বুক ভরে? তাই তো তিনি আমাদের ওই সাতটি ছেলেকে নিজের ছেলে করে নিয়েছিলেন।
এমপি সাহেবের ছোটো ছেলে বলতো, আব্বা, আমি দেশে আসতে চাই।
এমপি সাহেব কাতর হয়ে উঠে চিৎকার করতেন, না, বাবা, এখন দ্যাশে আসবা না, এইটা কি দ্যাশ নাকি, এইখানে আসলে তোমার শরিল টিকবো না। আমেরিকারে বাপমায়ের দ্যাশ ভাইব্যা সেইখানেই থাকো।
ছেলেটি বলতো, আব্বা, বিদেশে আমার মন টিকছে না; এখানে আমি একটা থার্ডক্লাশ সিটিজেন হয়ে আছি, এখানে আমি নিগ্রোর থেকেও খারাপ আছি।
এমপি সাহেব বলতেন, বাবা, বোঝ না আমেরিকায় থাডক্লাশ সিটিজেন থাকনও ভাল, নিগ্রোর থাইকা খারাপ থাকনও ভাল। এই বাংলাদ্যাশ একটা দ্যাশ না, এইখানে আইজ আসলে কাইল তুমি খুন হইয়া যাইবা, নাইলে অ্যাকসিডেন্টে মইরা যাইবা, দ্যাশে আসনের কাজ নাই।
ছেলেটি বলতো, কেনো, আব্বা, দেশে অনেক মানুষ তো বেঁচে আছে।
এমপি সাহেব বলতেন, সবগুলি ত একলগে মরতে পারে না, তাই বাইচ্যা আছে, কিন্তু কোনটা কোন সময় মরবো কেউ জানে না। তুমি দ্যাশে আসবা না, বাবা। মন চাইলে তুমি ফ্রান্সে আর অস্ট্রেলিয়ায় মাসখানেক ব্যাড়াইয়া আসো, তোমার নামে দশ হাজার ডলার পাঠাইতেছি।
এমপি সাহেবের বড়ো ছেলে সম্পূর্ণ বিপরীত; তাকে টেলিফোন করতে মনে মনে ভয় পান এমপি সাহেবও। ছেলেটি চিঠি তো লেখেই না, কখনো ফোনও করে না; আর এমপি সাহেব ফোন করলে সে বিরক্ত হয়।
ওই ছেলে বলতো, আব্বা, কাজে অকাজে ফোন করে তুমি পয়সা নষ্ট কোরো না, এদেশে কেউ এভাবে পয়সা নষ্ট করে না।
এমপি সাহেব বলতেন, বাবা, পয়সা আমি নষ্ট করি না, এইটা আমার ফ্রি ফোন, এমপি হিশাবে পাইছি, কোনোদিন বিল দিতে হইবো না। দ্যাশবিদাশে বিজনেস আমি এই ফোনেই করি।
ছেলেটি বলতো, এভাবে তো তুমি ট্যাক্স পেইআরস মানির অপচয় করছো, এখানকার ওরা তা করে না।
এমপি সাহেব হা হা করে উঠতেন, হা হা হা হা, বাবা, অইটা হইলো আমেরিকা, আর এইটা হইলো বাংলাদ্যাশ, এইখানে কেউ ট্যাক্সো দ্যায় না, আর আমরা ট্যাক্স পেয়ারগো মানি নষ্ট করি না, দ্যাশটা চলে লোনের টাকায়।

চমৎকার খুব ভাল লাগলো