মা’র নামে পাঠালে পারেন।
তাতে বাবার প্রেস্টিজে লাগে।
দীপনাথ হাসছিল। দেখাদেখি সুখেনও হাসলেন। আসনপিড়ি হয়ে নিজের চৌকিতে জুত করে বসে ছিলেন, এবার একটা বালিশ কোলে টেনে নিয়ে আরও আরামে বসলেন। বালিশ বিছানা সবই অবশ্য তেলচিটে নোংরা। বললেন, আপনি খুব বড় চাকরি করেন শুনেছি।
দীপনাথ ম্লান হেসে বলল, বড় চাকরি কিছু নয়। কোনও রকম একটা।
কেন, বড় সায়েবের নাকি ডান হাত? ম্যানেজার বলছিল, দীপনাথবাবু মাসে আড়াই হাজার টাকা বেতন পান। ইচ্ছে করলে যাকে খুশি চাকরি দিতে পারেন।
দীপনাথ সত্যি কথাটা বলতে একটু ইতস্তত করে। অনেক সময়ে মানুষকে তার ভুল ভাবনা নিয়ে থাকতে দেওয়াটা স্ট্র্যাটেজির দিক দিয়েও দরকার। তবে আবার একেবারে নির্জলা মিথ্যেটাও স্বীকার করতে বাধে। সে বলল, ম্যানেজার বাড়িয়ে বলেছে।
তবু আমার মতো উঞ্ছবৃত্তি তো নয়।
উঞ্ছবৃত্তি কেন? আপনারও তো ভাল চাকরি।
কোন দিক দিয়ে? গালভরা নামের সরকারি চাকরি, এইমাত্র। যা পাই তাতে দশ দিনও চলে না।
তা হলে চালান কী করে?
এদিক সেদিক করতে হয়। ডান হাত বাঁ হাত।
দীপনাথের একটা ব্যাপার আছে। সে কখনও ঘুম-টুষের কথা ভাবতেই পারে না। সে বোসের কাছে উঞ্ছবৃত্তি করে বটে, তবু কখনও হিসেবের বাইরের টাকা ছায়নি। সে যে সচেতনভাবে সৎ তা নয়, ডান হাত বাঁ হাতের কথা তার মনেই আসে না আসলে। তার চারপাশের বেশির ভাগ লোকই যে এই অপকর্মটি করে তা জেনেও তার নিজের কখনও ইচ্ছে হয়নি।
দীপনাথ একটু হেসে বলল, সবাই আজকাল করছে।
সুখেনও বিনা জবাবে একটু হাসলেন। প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন, আপনাকে তো এ সময়ে বড় একটা দেখতে পাই না। শুনি নাকি অফিসে আপনার অনেক রাত পর্যন্ত কাজ থাকে।
প্রায়ই থাকে। কাজ না হোক, পার্টি-ফার্টি থাকেই।
আজ কি সেসব নেই?
না, আজ একটু ছুটি পেয়েছি।
সন্ধেবেলাটা কী করবেন?
কিছু করার নেই। ভাবছি বই-টই পড়ব।
দূর। বই পড়ে কী হয়? আমি লাস্ট বইটই পড়েছি সেই কলেজে-ইউনিভার্সিটিতে। এখন শুধু খবরের কাগজখানা সকালে একবার দেখি।
দীপনাথ বইয়ের পোকা। আজকাল অবশ্য বোস সাহেবের হ্যাপা সামলে বোর্ডিং-এ রাত করে ফিরে পড়তে ইচ্ছে করে না। রাতে বাতি জ্বেলে রাখলে রুমমেটদেরও অসুবিধে।
কথাটা শুনে একটু বিরক্ত হল দীপনাথ। তবে কিছু বলল না।
সুখেন বললেন, আজ আমার সঙ্গে চলুন। একটু খাওয়াদাওয়া করে আসি। আমি খাওয়াব।
দীপনাথ একটু ইতস্তত করে। সুখেনকে সে প্রায় চেনেই না। এত অল্প পরিচয়ে এ লোকটার পয়সায় খাওয়া কি উচিত?
তার দ্বিধা দেখে সুখেন একটু করুণ মুখ করে বললেন, আপনার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল তো, তাই। বলছিলাম। কলকাতায় ফ্র্যাংকলি স্পিকিং আমার কোনও বন্ধু নেই। বলতে কী আপনিই আমার প্রথম বন্ধু।
এত চট করে বন্ধুত্ব পাতাতে দীপনাথের আপত্তি আছে। তবে সুখেন লোকটা বোধহয় বাস্তবিকই একা এবং বন্ধুহীন। নইলে দু-চারটে কথাবার্তার পরই কেউ অত হ্যাংলার মতো বন্ধুত্ব পাতাতে চায় না। তাই দীপনাথ বলল, ঠিক আছে। তবে আমি কিন্তু মদ-টদ বেশি খাই না।
বেশি নয়। একটুখানি। জাস্ট ফুর্তি করা আর কী!
চলুন।
তা হলে আর দেরি নয়। উঠে পড়ুন।
দীপনাথ ওঠে।
এ কথা ঠিক যে কলকাতা শহরটা দীপনাথের নখদর্পণে নয়। এখনও এর অনেক কানাগলি, গোলকধাঁধা তার চেনা নেই। সুখেন একটা টানা রিকশা ডেকে ঘরের দরজায় পঁড় করিয়ে বলল, ট্যাক্সি পাওয়ার বহুত ঝামেলা। যেখানে যাব সেখানে ট্যাক্সি ঢোকেও না।
সুখেনের সঙ্গে টানা রিকশায় খুবই চাপাচাপি বোধ করছিল দীপনাথ। সুখেন বেশ স্বাস্থ্যবান। দীপনাথও নেহাত কম যায় না। ফলে চাণে মাজা ভেঙে যাওয়ার জোগাড়। সুখেন তার মধ্যে বসেই মহানন্দে গুন গুন করে ‘দুঃখ আমার প্রাণের সখা…’ গাইতে লাগলেন।
রিকশা হ্যারিসন রোড ধরে গিয়ে চিত্তরঞ্জন অ্যাভেনিউতে পড়ল। খানিক এগিয়ে ডান হাতে যে গলিতে ঢুকল সেটায় কস্মিনকালে আসেনি দীপনাথ। তারপর আরও গলি। আরও সরু ও অন্ধকার গলির পর গলি। সুখেন হাপসে-পড়া রিকশাওয়ালাকে এমনভাবে পথ চেনাচ্ছিলেন যে, মনে হয় উনি চোখ বুজে সব দেখতে পান। পশ্চিমা রিকশাওয়ালাটির ন্যাড়া মাথায় পর্যন্ত ঘাম জমে গেছে। কষ্ট হচ্ছিল দীপনাথের। বলল, চলুন না বাকি পথটা হেঁটে যাই?
দরকার কী! প্রায় এসে গেছি।
রিকশাওয়ালাটার জন্য মায়া হচ্ছে।
মায়া করবেন না। ওরা খুব হার্ডি। আমাদের মতো নয়।
এই নিষ্ঠুরতা ভাল লাগল না দীপনাথের। চুপ করে রইল।
রিকশাকে অবশেষে থামালেন সুখেন। সামনে একটা এঁদো বাড়ি। সেটা কত উঁচু তা এই সরু গলিতে সন্ধের আবছা আলোয় ঠাহর করা মুশকিল।
সুখেন নেমে ভাড়া দিতে গিয়ে রিকশাওয়ালার সঙ্গে একটু বচসা বাধালেন। তারপর দীপনাথকে বললেন, আসুন।
এখানে কি কোনও রেস্টুরেন্ট আছে?— দীপনাথ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল। বলতে কী বাড়িটার চেহারা দেখে সে একটু হতাশও হয়েছে। একেবারে অবাঙালি পাড়া। নর্দমা আর রোদহীন বাতাসের ভ্যাপসা গন্ধ আসছে। কম আলোর ভুতুড়ে গলি।
আমি ফুড ইন্সপেক্টর। সব ঘাঁটি চিনি। নিশ্চিন্তে আসুন।
সরু সিঁড়ি বেয়ে বাড়ির দোতলায় সুখেনের পিছু পিছু উঠে এল দীপনাথ। সুখেন একটা ফ্ল্যাটের দরজার পর্দা সরিয়ে গট গট করে ঢুকলেন।
কোনও রেস্টুরেন্ট বলে মনেই হয় না। সামনের ঘরটা ঠিক যেন কারও বাড়ির খাওয়ার ঘর। একটা মাত্র ডাইনিং টেবিল ঘিরে গোটাছয়েক চেয়ার। স্টিক লাইট জ্বলছে। চারিদিকে ফানুসের মতো আকৃতির আরও কয়েকটা ঘর-সাজানোর বাতি ঝুলছে সিলিং থেকে। দেয়ালে মুখোশ, তির-ধনুক, বিদ্ধ এবং মরা প্রজাপতি সাজানো। বাড়িটা চুপচাপ। শুধু ভিতরের কোনও ঘর থেকে ক্ষীণ রেডিয়োয় বিবিধ ভারতীর শব্দ আসছে! কেউ তাদের রিসিভ করল না। সুখেন গিয়ে ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে বললেন, বসুন। ওই কৈাণে বেসিন আছে, হাত ধুয়ে আসতে পারেন।
