এটা তো কারও বাড়ি বলে মনে হচ্ছে।
বাড়িই তো। কিন্তু কাম রেস্টুরেন্ট। পাবলিকের জন্য নয়। বাঁধা খদ্দের। যারা চেনে তারাই আসে।
লোক কই?
আসবে। খেতে হলে এসব জায়গাই ভাল। এরা ঠিক প্রফেশনাল নয়, তাই যত্ন করে খাওয়ায়।
পুরনো বাড়ি বলেই বোধহয় ঘরটায় তেমন গরম নেই। একটা আদ্যিকালের ডি সি পাখা ঘুরছে ওপরে। একটু ধূপকাঠির গন্ধও রয়েছে।
দীপনাথ জিজ্ঞেস করল, এরা কি চিনে?
দো-আঁশলা। খাঁটি চিনেম্যান এখানে পাবেন কোথায়?
কথা বলতে বলতেই এক বয়স্কা চিনে মহিলা এসে নিঃশব্দে দাঁড়ায়। মোটাসোটা, হাসিখুশি, স্তনহীন, স্বর্ণদন্তী। পরনে কামিজ আর ঢোলা পাজামা। পায়ে রবারসেলের খড়ম! সুখেন অল্প কথায় অর্ডার দিলেন।
মহিলা চলে গেলে দীপনাথকে জিজ্ঞেস করলেন, শুয়োরের মাংস খান তো?
দীপনাথ খায়। একটু ঘেন্না হলেও খায়। হেসে মাথা নাড়ল।
সুখেন বলেন, এর ওইটে ভাল করে।
খাবার এল একটু বাদেই। প্ৰন-চাউমিন আর পর্ক চপ। পরিমাণে প্রচুর এবং অত্যন্ত সুন্দর গন্ধ। ও স্বাদ। সঙ্গে দু’ বোতল বিয়ার। কাঁচা পেঁয়াজ এবং স্যালাড। দীপনাথ খেয়ে বুঝল, বহুকাল সে এত ভাল খাবার খায়নি।
সুখেন ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করেন, ভাল নয়?
দারুণ।
ভাল খেতে চাইলে আমাকে বলবেন। এরকম আরও বহু খাওয়ার জায়গা আছে কলকাতায়।
আমার জানা ছিল না।
অনেকেই জানে না।
দীপনাথ হাসল।
সুখেন খেতে খেতেই বলেন, আমার বিয়ের কথা জিজ্ঞেস করছিলেন না? তখন আপনাকে সত্যি কথাটা বলিনি।
কী কথা?
আমার একজন মহিলা আছেন।
দীপনাথ ভ্র তুলে বলে, মহিলা?
বিবাহিতা। ছেলেমেয়েও আছে।
সে কী?
সুখেন একটু হাসলেন। ঠোঁট চাউমিনের তেলে মাখা। চকচক করছে। চোখে বিয়ারের উজ্জ্বলতা। এতক্ষণে লোকটাকে হঠাৎ বদমাশের মতো দেখাল। শান্ত লাজুক নিরেট মুখ-চোখে একটা পাপবোধের আবিলতাও ফুটে উঠল। বললেন, বিয়েতে একটু আটকাচ্ছে। সামাজিকতাই বাধা।
দীপনাথ অল্প ভড়কে গিয়ে বলে, বিবাহিতা মহিলা মানে তো স্বামী আছে।
সে ব্যাটা এক নম্বরের পাজি। বদমাশ দি গ্রেট। এখন জেল খাটছে। বউটাকে দেখার কেউ নেই। ছেলেমেয়েগুলো একেবারে অনাথ।
ছেলেমেয়ে ক’জন?
তিনটে।
ভদ্রমহিলার বয়স?
বয়স আছে।
এ ব্যাপারটা সুখেন ভাঙতে চান না বুঝে দীপনাথ আর প্রশ্ন করে না। শুধু বলে, ও।
আপনার সঙ্গে এ ব্যাপারে একটু পরামর্শ করতে চাই।
দীপনাথ সতর্ক হয়ে বলে, ওটা আপনার পার্সোনাল ব্যাপার। থাক না।
আরে গোপনীয়তা কিছু নেই। আপনি তো আমার বন্ধু, আপনাকে বলতে বাধা কী?
বিয়ে কি ঠিক হয়ে গেছে?
ঠিক কিছুই নয়। আমি তেমন ইন্টারেস্টেডও নই। তবে একটু ফেঁসে গেছি। ওই মহিলার কাছে আমি ইনডেটেড। অসময়ে আমার অনেক উপকার করেছে। এখন ওর একটা পার্মানেন্ট আশ্রয় দরকার।
তা হলে আর আমি কী বলব বলুন!
চলুন না একবার মহিলাটির কাছে নিয়ে যাই আপনাকে এখন।
এখন!—বলে দীপনাথ ভড়কায়। একদিনে এত ঘনিষ্ঠতায় হাঁফ ধরে যাচ্ছে তার। বলল, আজ থাক।
বেশি দূর নয়। রিকশায় মিনিট দশেক।
আবার রিকশা!—আঁতকে ওঠে দীপনাথ।
সুখেন হেসে বলেন, আপনার টানা রিকশা ভাল লাগে না, না? আমার কিন্তু বেশ লাগে। মনে হয়, কলকাতার ভিড়ের ওপর দিয়ে যেন নৌকোয় ভেসে ভেসে চলেছি।
সে তো বুঝলাম। কিন্তু আমি গিয়ে করবটা কী?
কিছুই নয়। একটু বসবেন, চা-টা খাবেন। বীথি খুশি হবে।
ভারী অস্বস্তি বোধ করে দীপনাথ। রবি ঠাকুর জীবনে জীবন যোগ করার কথা বলেছেন বটে, কিন্তু বেমক্কা এই অদ্ভুত পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়তে তার একদম ইচ্ছে করছিল না। ভয়-ভয় করছিল। সে বলল, কোথায় বাড়ি?
গড়পাড়। আমাদের বোর্ডিং থেকে বেশি দূরও নয়।
খাওয়া হতেই টক করে উঠে পড়লেন সুখেন। চিনে মহিলার সঙ্গে পাশের রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে গুনগুন করে কী একটু কথা বলে এলেন।
চলুন।
দীপনাথ জড়তা কাটিয়ে উঠল। লোকটা খাইয়েছে, বন্ধু হতে চেয়েছে, একটু রিটার্ন সার্ভিস দেওয়া উচিত। তবে সে মনে মনে স্থির করে ফেলল এরপর থেকে সুখেনকে আর বেশি পাত্তা দেবে না।
রিকশায় উঠে আবার দীর্ঘ রাস্তা পেরিয়ে নিজেদের বোর্ডিং-এর সামনে দিয়েই গড়পাড়ের দিকে চলল তারা। সুখেন গুনগুন করে একটা নজরুলগীতি গাইছিলেন। শেষ পর্যন্ত সুখেন দু’ বোতল বিয়ার টেনেছেন, দীপনাথ কষ্টেসৃষ্টে এক বোতল। বেশ ঝিম ঝিম করছে শরীর।
গড়পাড় দীপনাথের অচেনা নয়। তবু আজ কেন যেন গা ছমছম করছিল।
সুখেন একটা নতুন দোতলা ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে রিকশা থামালেন। আবার রিকশাওয়ালার সঙ্গে একটু বচসা। এবং আবার দোতলায় ওঠা। তবে এ বাড়িটা ঝকঝকে নতুন। চওড়া সিঁড়ি।.উজ্জ্বল আলো। দোতলার বাঁদিকে ফ্ল্যাটের দরজায় বোম টিপতে ভিতরে পিয়ানোর মতো আওয়াজ হল। দরজা খুলল একটি উনিশ-কুড়ি বছরের মারকাট যুবা। তার চোখ-মুখে ছমছমে স্মার্টনেস। শরীরখানা বেতের মতো মেদহীন এবং শক্তসমর্থ, কিন্তু মোটাসোটা নয়। গায়ে একটা স্যান্ডো গেঞ্জি, পরনে গাঢ় খয়েবি রঙের বেলবট, মাথায় লম্বা চুল, গালে কোমল দাড়ি-গোঁফ, চোখে চশমা। খুব ভদ্র ও নরম গলায় বলল, আসুন, আসুন। মা এইমাত্র ফিরল।
সুখেন বললেন, তুমি বেরোচ্ছ নাকি?
হ্যাঁ।
এই ইনি হচ্ছেন দীপনাথ চ্যাটার্জি। আমার বন্ধু।—বলে দীপনাথের দিকে ফিরে বললেন, বীথির বড় ছেলে স্বস্তি। সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়ে।
দীপনাথ খুবই হতভম্ব হয়ে গেছে। বীথির ছেলে এত বড়? তবে বীথির বয়স কত?
