তারপর বিলু আর অরুণ মিলে ভোকাট্টা হয়ে গেল।
বিলু তার আপন বোন হলেও ওর স্বভাবচরিত্র রুচি সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না দীপনাথ। তারা একসঙ্গে মানুষ হয়নি। ফলে বিলুকে তাব ধাধার মতো লাগে।
গরমে রোদে প্রচণ্ড ঘাম হচ্ছিল দীপনাথের। ক্লান্তি লাগছিল। ট্রাম ধরে সে বোর্ডিং-এ ফিরে আসে। ঘরে কেউ নেই। দুটো তালায় ইন্টারলক করা। দরজা খুলে ঘরে ঢুকল। জানালা দরজা বন্ধ ছিল বলে ঘরটা সহনীয় রকমের ঠান্ডা। দীপনাথ পাজামা পরে খালি গায়ে ফ্যানের নীচে শুতে না শুতেই ঘুমিয়ে পড়ে। বহুকাল পরে এই অসময়ের ঘুম।
সন্ধেবেলা ঘুম ভাঙতে দেখল, ফুড ইন্সপেক্টর ভদ্রলোক তার বিছানায় বসে খুব চোর-চোর চোখে তাকে দেখছে। রুমমেটদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় প্রায় নেই বললেই হয় দীপনাথের। তিনজন অচেনা লোক একটা ঘরে রাত কাটায় মাত্র। সারা দিন যে যার ধান্দায় ব্যস্ত থাকে। দীপনাথের মনে পড়ল, ফুড ইন্সপেক্টরের নাম সুখেনবাবু। একটু খাপছাড়া গোছের লোক। চল্লিশ-টল্লিশ বয়স হবে, এখনও বিয়ে করেননি। মোটাসোটা লম্বা ফর্সা আলিসান চেহারা। কিন্তু খুবই নম্র ও লাজুক। গুন গুন করে মাঝে মাঝেই রবীন্দ্রসংগীত ও অতুলপ্রসাদী বা রজনীকান্তের গান করেন। গলা যে সুরে বাঁধা তা গুন গুন থেকেই বোঝা যায়। বিছানার ওপর লম্বালম্বি একটা নাইলনের দড়িতে ঝোলানো সুখেনবাবুর রাজ্যের জামা-কাপড় পাহাড় হয়ে থাকে। জামা-কাপড় ময়লা হলে সেগুলো কাচাকাচির হাঙ্গামায় না গিয়ে উনি নতুন জামা প্যান্ট কিনে আনেন। পুরোনোগুলো ওইভাবে জমে যাচ্ছে। এরকমভাবে কত জামা হবে তা একবার জানতে ইচ্ছে হয় দীপনাপের। সুখেনবাবু রাতের দিকে সামান্য মদ খেয়ে আসেন, সেটা গন্ধেই টের পায় দীপনাথ। এ ছাড়া ভদ্রলোকের আর কোনও দোষের কথা তার জানা নেই।
আজ ঘুম ভেঙে দীপনাথ সূখেনবাবুর সুরেলা গুন গুন শুনতে পেল। ও চাঁদ চোখের জলে…
দীপনাথ টপ করে উঠে বসে বলল, বেশ গলা আপনার। শিখতেন নাকি?
সুখেনবাবু ভারী লজ্জা পেয়ে মুখ লুকিয়ে একটু হাসেন। চোখে ভারী চশমা, যেটা স্নানের সময়েও খোলেন না। খালি গায়ে রং ফেটে পড়ছে, কিন্তু বুক পিঠ, কাঁধ, এমনকী কানে পর্যন্ত প্রচুর লোম। মুখে প্রায় সর্বদাই পান। হেসে বললেন, এখনও শিখি।
একটু জোরে করুন। শুনি।
ভদ্রলোক আপত্তি করলেন না। আর একটু গুন গুন করে সুর এবং কথা ঝালিয়ে নিয়ে অনুচ্চস্বরে হঠাৎ গাইতে শুরু করলেন, ও চাঁদ চোখের জলে লাগল জোয়ার…
বড় প্রিয় গান দীপনাথের। চোখে জল এসে যাচ্ছিল। লোকটা গায় ভাল।
গোটা চার-পাঁচ গানের পর পাড়ার দোকানে চা আর টোস্টের কথা চাকরটাকে দিয়ে বলে পাঠাল দীপনাথ। জুত করে বসে বলল, বাড়িতে কে কে আছে?
বাবা আছেন। মা, মানে সৎমা আছেন।
বাড়ি কোথায়?
এই তো জয়নগর। যেখানকার মোয়া বিখ্যাত।
জানি। যাইনি কখনও।
কাছেই।
আপনি নিজে বাড়ি যান না?
কখনও-সখনও। খুব কম।
ভাই-টাইরা কী করে?
নিজের ভাই নেই। তবে সৎ ভাই-বোন আছে। তারা এন্ডিগেন্ডি অনেক। ছোট ছোট সব। এখনও কিছু কাজ-টাজ করার মতো বয়স হয়নি।
তা হলে তো আপনার লায়াবিলিটিজও আছে।
তা আছে। মাসে মাসে টাকা পাঠাতে হয়।
বাবা কী করেন?
কিছুই নয়। আগে কিছু জমিজমা ছিল। তা সে সব প্রায় সবই বেচে দিতে হয়েছে। এখন মেরেকেটে দু’-চার বিঘে আছে হয়তো।
আপনার টাকাতেই চলে?
চলে কি না কে খোঁজ নিচ্ছে? তবে চলে যায় নিশ্চয়ই কোনওরকমে। দেশের অবস্থা খুব খারাপ। লোকের যে কী করে চলছে সেটা একটা রহস্য।
দীপনাথ একটু অন্যমনস্ক হয়ে বলে, তা ঠিক।
সুখেন গম্ভীর হয়ে বলেন, মাসে তিরিশ-চল্লিশ টাকা আয় করে এমন লোকও যে কী করে বেঁচে আছে সেটা ভেবে পাই না। কিন্তু আছে।
আপনি বিয়ে করেননি?
সময়ই পেলাম না। আঠেরো বছর বয়স থেকে রোজগারের ধান্দায় বেরিয়ে পড়তে হল। বাবার দ্বিতীয় পক্ষের সংসার নইলে কে টানত বলুন?
সুখোবাবু এমনিতে লাজুক হলেও বোধ হয় নিজের কিছু কথা কাউকে বলতে চান। আজকাল লোকে প্রাণ খোলসা করে প্রাণের কথা বলার মতো লোক পায় না। কাউকে হঠাৎ পেয়ে গেলে পাকা ফোড়া ফেটে গেলে যেমন গলগল করে পুঁজ রক্ত বেরিয়ে আসে। দীপনাথ ঠিক করল লোকটার সঙ্গে ভাব করবে। বলল, আপনার বোধহয় বাবার সঙ্গে বনিবনা নেই!
সুখেন একটু লজ্জা পেয়ে বলেন, আমার কয়েকটা অ্যামবিশন ছিল। বাবা যদি বুড়ো বয়সে বিয়েটা না করত তা হলে আমার পক্ষে লেখাপড়া বা গানবাজনার শখ মেটানো অসম্ভব হত না।
আপনার তো এমন কিছু বয়স হয়নি। এখনও পারেন।
মনটাই বুড়ো হয়ে গেছে।
সৎ-মা’র সঙ্গে বনিবনা কেমন?
সুখেন একটু চুপ করে থেকে বলেন, বনিবনার প্রশ্ন নেই। বাবা যখন বিয়ে করেন তখন আমি বড় হয়ে গেছি। কাজেই সৎ-মা’র পক্ষে অত্যাচার করা সম্ভব ছিল না। বরং সৎ-মাই উলটে আমাকে ভয় পায়। তার বয়স বোধ হয় আমার মতোই। লোক খারাপ নয়। কিন্তু এই মহিলাকে মায়ের জায়গাটা দিতে পারিনি আর কী।
ভাইবোন ক’জন?
তিন বোন, দুই ভাই।
তারা আপনাকে মানে?
মানে। না মেনে উপায় কী? বয়সের তফাতটা তো বিরাট। কিন্তু কেবল আমাকেই মানে, আর কাউকে নয়। আমি বাড়িতে না থাকায় সেগুলি তেমন ভালভাবে মানুষ হচ্ছে না। অভাবও খুব।
আপনি তো আরও দিতে পারেন ইচ্ছে করলে।
দিয়ে লাভ নেই। বাবার দারুণ খরচের হাত। তার ওপর অভাবে থেকে থেকে এমন হয়েছে, টাকা পেলেই কাছা খুলে খরচাপাতি শুরু করে দেন। মাছ মাংস পোলাও লাগিয়ে দেন। দুদিনে হাত ফাঁকা।
