চেষ্টা করলেই ডিটাচড হওয়া যায়। তুমি চেষ্টা করছ না। দিনে দিনে তুমি আরও বেশি জেবড়ে জড়িয়ে পড়ছ।
বেশ করছি।
অরুণ হাসল, কদিন পর দেখব তুমি হয়তো তারকেশ্বরে মানত করতেও যাচ্ছ।
বিরক্ত হচ্ছিল বিলু। নীরস গলায় বলল, যদি বুঝি তাতে কাজ হবে তা হলে তাও করব। একজন মানুষের জন্যই করব তো!
একটা শ্বাস ফেলে হতাশ গলায় অরুণ বলে, করো। মেয়েরা কোনওদিনই সংস্কারমুক্ত হতে পারে না, এ তো জানা কথা।
আবার ভাষণ!
ভাষণ কেন হবে! তোমাকে তো অন্যরকম জানতাম বিলু। তুমি ছিলে ঠান্ডা, লজিক্যাল, আনইমোশনাল। প্রীতমের এই অসুখ যখন হল তখনও তোমাকে ইমোশনাল হতে দেখিনি। হঠাৎ আজকাল তোমার ভিতরে একটু আবেগ-টাবেগ দেখছি।
বিলু চুপ করে থাকে। এ কথার জবাব হয় না। অরুণ দীর্ঘকালের বন্ধু। বিলুর স্বভাব, বিলুর চরিত্র সবই অরুণের নখদর্পণে। সে যদি আজ কোনও কথা বলে তবে সেটা বাজে কথা হবে না। কথাটা মিথ্যেও নয়। বিলুর ভিতরে কোনওদিনই কোনও আবেগ ছিল না। কোনও কিছুতেই সে উত্তেজিত হয়নি কখনও। এমনকী জ্ঞানত কোনওদিন বিলু কোনও কারণেই কাদেনি। অথচ কান্না নাকি মেয়েদের বড় সহজেই আসে। প্রীতম সম্পর্কে বিলু কোনওদিন তেমন কোনও টানও বোধ করেনি, আবার বিরূপতাও নয়।
কিন্তু এই সেদিন যখন লাবুর জন্মদিনে রোগা লোকটা বিছানায় বসে প্রাণপণে বেলুন ফোলানোর চেষ্টা করছিল তখন হঠাৎ সেই সামান্য দৃশ্যটা দেখে হঠাৎ বিলুর ভিতরে খান খান শব্দে কী যেন ভেঙে গেল। হঠাৎ এল আবেগ, হঠাৎ এল ভয়। প্রীতম মরে যাবে, এই সত্যটাকে সে শান্ত বিমাদে গ্রহণ করে নিয়েছিল। কিন্তু রোগা কাঠির মতো হাতে বেলুনটা ধরে কাপতে কাপতে যখন নিজের মহার্ঘ শ্বাসবায়ু তার মধ্যে ভরে দেওয়ার চেষ্টা করছিল প্রীতম তখনই যেন বিলু টের পেল একটা মানুষের কাছে তার নিজের বেঁচে থাকাটা কত জরুরি।
আজকাল আমার মধ্যে একটু-আধটু আবেগ আসছে ঠিকই।–বিলু অনেকক্ষণ বাদে বলল, কিন্তু তার মানে তো এ নয় যে, সেটা ইললজিক্যাল।
অরুণ নিস্পৃহ গলায় বলে, আমি ইমোশন জিনিসটা বুঝি না। আমার নিজের তো কোনও সেন্টিমেন্ট নেই, বুঝব কী করে? আমার মা যেদিন মারা গেল সেদিন এক ফোটাও কঁদিনি। কোনও দুঃখ বা অভাব বোধ করিনি। আমি বিকেলে একটা পার্টিতেও গিয়েছিলাম। আমি হচ্ছি আলবিয়ার কামুর নায়কদের মতো। ভেরি মাচ কোন্ড-ব্লাডেড।
বিলু চিমটি কেটে বলে, তোমার পরিবারকে জানি। বেশি বোকো না। মায়ের জন্য কাদবেই বা কেন, তুমি মাকে তো ভাল করে চেনোইনি। মানুষ হয়েছ গভর্নেসের কাছে। একটু বড় হতেই চলে গেলে বিদেশে। ওরকম পরিবারে কোনও ইমোশনাল সম্পর্কই গড়ে ওঠে না।
তা অবশ্য ঠিক।
কিন্তু তোমার ভিতরে যে ইমোশন টসটস করছে তা একদিন টের পাবে, দেখো। নিজেকে যত আধুনিক ভাবছ, ততটা নও।
বাড়ির গলিতে গাড়ি ঢোকাবার আগেই বিলু নেমে গেল। অরুণ গাড়ি ব্যাক করিয়ে ঢোকাবে। অন্য দিন এই অবস্থায় বিলু গলির মুখে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে ওর জন্য। আজ করল না। এক্ষুনি প্রীতমকে একবার দেখবার জন্য সে কিছুটা অস্থির বোধ করছিল।
দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে উঠে ঘরে ঢুকে দেখল, প্রীতম শান্তভাবে শুয়ে ঘুমোচ্ছে।
বিলু হাতের ব্যাগটা ড্রেসিং টেবিলে রেখে লঘু নিঃশব্দ পায়ে বিছানার কাছে আসে। তারপর খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে প্রীতমের হাত পা মুখ। একটু কি রং বদল হয়েছে চামড়ায়? সামান্য স্বাস্থ্যের ঝিকিমিকি কি দেখা যাচ্ছে না?
ঠিক বুঝতে পারল না।
২৬. গর্তের মধ্যে পড়ে গেছে দীপনাথ
এই এখন নিজের মনের ভিতরে একটা গর্তের মধ্যে পড়ে গেছে দীপনাথ। কিছুতেই উঠতে পারছে। অনেক চোড়-পাঁচোড় করে যাচ্ছে। কিন্তু মনটা একবার হেঁচড়ে গেলে খুব সহজে তাকে আবার দু’পায়ে দাঁড় করানো যায় না। এই পৃথিবীতে সে কি সবচেয়ে বোকাদের দলে? যদি বা সে বোকাই, তবে কেন মণিদীপার মতো অমন চনমনে চালাক তুখোড় এক মহিলার সঙ্গে তার একটা হোক-না-হোক সম্পর্ক হল?
এক সময়ে বকুলের প্রেমে পড়েছিল দীপনাথ। কলকাতার জল বছরখানেক পেটে যেতে না যেতেই কৌটোর কারখানায় সব রস নিংড়ে নিল। তখন নারীদেহ মনে পড়লেও নারীপ্রেম কথাটা ভসকা লাগত। এই কিছুদিন আগেও তার নারীপ্রেম নিয়ে ভাবনা-চিন্তা আসত না। এখনও কি আসে? বলা যায় না ঠিক। তবে মণিদীপা যখন এসেছে, তখন ওগুলো আসতেই বা বাধা কী? ব্যাপারটা কতদূর গড়াবে তাও জানা নেই। কিন্তু ইতিমধ্যেই মনে একটা তেতো স্বাদ আসছে। একটা কিছু বদলাবে। একটা কিছুর বদল দরকার। কখনও প্রেমিকা, কখনও চাকরি।
মনটা আজ আরও বিগড়ে গেছে বিলুকে দেখে। বিলুর সঙ্গে অরুণের একটা খুব আধুনিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক আছে। দীপনাথ সম্পর্কটার ওপরসা চেহারাটা মানে না। তলে তলে কী হচ্ছে সেটাই তার জিজ্ঞাসা। প্রীতম কিছু টের পায় হয়তো। কিন্তু কেটে ফেললেও বলবে না।
গোঁয়ার দীপনাথ তাই বিলুর অফিস থেকে বেরিয়ে খানিক দূর গিয়েও আবার ফিরে এল। অফিসে ঢুকল না। তবে উল্টোদিকের ফুটপাথে একটা দোকানের শেডের তলায় দাঁড়িয়ে রইল। দাঁড়াতে হল বহুক্ষণ। খামোখা এতক্ষণ দাঁড়ানোরও মানে হয় না বলে সে খানিক চিনেবাদাম, কাটা পেঁপে আর আখের রস খেল, এক বিষহরি ওষুধওলার বক্তৃতা শুনল। দোকানে দোকানে শো-কেস দেখে বেড়াল। চারটের কিছু বাদে একখানা টয়োটা লাল রঙের মোটরে চড়ে এল অরুণ। দোষের কিছু নয়, আসতেই পারে।
