বললাম তো, আমার চোখের বা মনের ভুল হতে পারে। তাই তোমাকে জিজ্ঞেস করছি।
আমি লক্ষ করিনি। তুমি কিছু দেখেছ?
মনে হয়। খুব সামান্য একটু যেন, ভুলই হবে হয়তো, তবু—
বিলু আর বলল না। বোধহয় ভাল কথা বলতে নেই বলেই।
অরুণ গম্ভীর মুখেই বলল, ঠিক আছে, আজ লক্ষ করে দেখব।
দেখার কিছু নেই। তেমন কিছু হলে তোমার নজরে এমনিতেই পড়ত।
তার কোনও মানে নেই। প্রীতমের সঙ্গে দেখা হয় বটে। কিন্তু খুব ইনটেনসিভভাবে তো ওকে লক্ষ করি না। মনটা হয়তো নানা রকম চিন্তায় ব্যস্ত থাকে। মানুষ তো কত সময়ে একটা জিনিস দেখেও দেখে না।
বিলু ভ্রু কুঁচকে সামনের কাচের ওপাশে গতিশীল রাস্তাঘাট দেখছিল। বলল, কদিন আগে লাবুর জন্মদিনে কী কাণ্ড করেছিল সে তো জানো।
হুঁ।–অরুণ মাথা নাড়ল। তারপর বলল, দেয়ার মে বি সাম ইমপ্রুভমেন্ট।
ডাক্তার কি তোমাকে কিছু বলেছে?
ডাক্তাররা তো সব সময়ে প্রফেশনাল কথাবার্তাই বলে।
ইদানীং কিছু বলেনি?
না। তেমন কিছু নয়।
ডাক্তারকে একবার জিজ্ঞেস করবে?
আজই তো যাচ্ছি প্রীতমকে নিয়ে। জিজ্ঞেস করব।
আজই আকুপাংচারের ডেট নাকি?
অরুণ বিস্ময়ে ভ্রু তুলে বললে, না তো আজ আচার্যি কবিরাজের ডেট। ভুলে গেছ?
আমি আজকাল ভুলে যাই। এত চিন্তা মাথায়, অথচ অনেক কিছু মনে রাখতে পারি না।
ন্যাচারাল। তোমার অবস্থায় যে কারও হত।
বিলু একটু স্মিত মুখে বলল, তুমি তো মনে রেখেছ! আমার ভরসা যে তুমিই।
এ কথায় অরুণের ফর্সা রং রাঙা হল, বাজে কথা বোলো না।
কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি বলে ভেবেছ নাকি?
কখনও ওসব জানিয়ো না। তাতে রিলেশনটা হালকা হয়ে যায়।
কী মুশকিল! কৃতজ্ঞতা জানাইনি তো! তবু বকছ কেন?
অরুণ চুপচাপ কিছুক্ষণ গাড়ি চালাল।
বিলু বলল, মুডটা হঠাৎ খারাপ করে ফেললে নিজের দোষেই।
অরুণ হঠাৎ হেসে ফেলল এবং চমৎকার দেখাল তাকে। বলল, লিভ ইট। প্রীতমবাবুর যদি কোনও ইমপ্রুভমেন্ট হয়ে থাকে তবে সেটাই আপাতত বড় কথা।
ময়দানের ভিতর দিয়ে খুব আস্তে গাড়ি চালাচ্ছে অরুণ। অন্যমনস্ক। গম্ভীর।
বিলু নিজের মনে মনে আর-একবার সম্মোহিত হয়। এই একটি লোককে সে চেনে যে নিজের প্রশংসা একটুখানি শুনলে লজ্জায় রাঙা হয় এবং কখনও-কখনও রেগে যায়। অরুণের অনেক গুণের মধ্যে এই একটা গুণ সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে বিলুকে। অথচ অরুণ কত ব্যাপারে কতই না প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু সেসব বলার কথা বিলুর মনেও থাকে না। অরুণ অরুণের মতোই, সেটা আবার তাকে বলার কী? আজ হঠাৎ মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল।
বিলু খানিকক্ষণ ভেবেচিন্তে বলল, প্রীতমকে বাইরে থেকে যেমন মনে হয়, ও মোটেই সে রকম নয়। ওর মনের জোর সম্পর্কে আমার এতদিন কোনও ধারণাই ছিল না।
আজকাল খুব স্বামীর প্রশংসা করে বেড়াচ্ছ যে!
যেটুকু বলার সেটুকু বলব না কেন?
অরুণ আবার সিরিয়াস হয়ে বলে, কথাটা মিথ্যে নয়। হি ইজ এ ফাইটার। এ টাফ ফাইটার।
হয়তো সেই জোরটার জন্যই লড়তে পারছে। তোমার কি মনে হয় না মনের জোর থাকলে অসুখ সেরে যেতে পারে?
আই বিলিভ ইন সায়ান্স। মনের জোর জিনিসটা ফ্যালনা নয়! কিন্তু তার ক্ষমতার সীমা আছে।
প্রীতম পারবে না বলছ?
পারতে পারে। নট ইমপসিবল।
কিন্তু তুমি চাইছ না যে আমি ওর মনের জোরের ওপর নির্ভর করে কোনও আশার কথা ভাবি।
অরুণ প্রথমে জবাব না দিয়ে মলিন মুখ করে হাসল একটু। তারপর বলল, কথাটা অবশ্য তাই দাঁড়ায়।
কেন চাইছ না, অরুণ?
প্রীতম যদি ভাল হয়ে ওঠে তো লক্ষ বার ওয়েলকাম। কিন্তু তুমি যে-কোনও ইভেনচুয়ালিটির জন্য তৈরি থাকলেই ভাল। তাতে কোনও শকই তোমাকে ভেঙে ফেলতে পারবে না।
ডাক্তাররা যে রুগিদের মনের জোর রাখতে বলে, সেটা তা হলে কী?
সেটাও দরকার। কিন্তু মনের জোরটাই সব নয়। একবার আমার ইস্কুলের অ্যানুয়াল পরীক্ষার আগে টাইফয়েড হয়েছিল। দিন চারেক টেম্পারেচার ঠায় একশো চারে দাঁড়িয়ে। তখনও টাইফয়েডের মডার্ন ট্রিটমেন্ট বেরোয়নি। চারদিনের দিন রক্ত পরীক্ষা করে টাইফয়েড ধরা গেল। আমি যেই বুঝলাম যে এ অসুখ সহজে সারবে না আর অ্যানুয়াল পরীক্ষাও দেওয়া হবে না, তখন গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসে মনের খুব জোর করতে লাগলাম। বছর নষ্ট হওয়ার আতঙ্কে জোরটা বেশ ভালই দিয়েছিলাম। সন্ধেবেলা টেম্পারেচার সাতানব্বইতে নেমে গেল। ডাক্তাররা পর্যন্ত হাঁ। কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য। তারপরই তেড়ে জ্বর উঠল। আবার একশো-চার। ত্রিশ দিনের দিন ভাত খাই।
খুবই স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে বিলু। ঠোঁটদুটো লিপস্টিক সত্ত্বেও ভারী শুকনো দেখায়।
অরুণ কয়েকবার ফিরে ফিরে দেখল বিলুকে। তারপর বলল, হতাশ হলে বোধহয়!
বিলু কিছু বলল না। কিন্তু একটা বড় শ্বাস ফেলল।
অরুণ গাঢ় আন্তরিক গলায় বলে, তোমাকে মিথ্যে কোনও স্তোক দেওয়াটা উচিত হত না বিলু। তার চেয়ে বাস্তববাদী হওয়া ভাল।
আমি স্তোক চাইনি তো।–বিলু একটু অবাক হয়ে বলে।
তবু বলছি প্রীতমের মনের জোরের ওপর নির্ভর করে খুব একটা বেশি আশা করে বোসো না।
বিলু আবার একটু বড় শ্বাস ফেলে বলল, দিনরাত তো কেবল নেগেটিভ চিন্তাই করে যাই অরুণ! আমাকে সেটা আর শিখিয়ো না তুমি।
নেগেটিভ চিন্তা করতেও বলিনি। যে-কোনও অবস্থার জন্য মনটাকে নিরপেক্ষ রাখা।
হঠাৎ বিলু ঝাঁঝালো গলায় বলে, কেন বাজে বকছু অরুণ, মনকে নিরপেক্ষ রাখা কথাটাই ভণ্ডামি। কেউ কোনওদিন তা পারে না।
