দীপনাথ ঘড়ি দেখে বলল, একটু আগে বেরোতে যদি পারিস তবে আমিও সঙ্গে যেতে পারতাম।
তুমি যাও না বাসায়! ও তো একা আছে, তোমাকে পেলে ভীষণ খুশি হবে। আমি ছুটি হলেই তাড়াতাড়ি চলে যাব।
দীপনাথ ভাবতে লাগল। ব্যাংকের লোহার শাটার নেমে এল সদর দরজায়। লেনদেন বন্ধ। কোথায় যাবে বা কোথাও যাবে কি না তা আজ ঠিক করতে পারছিল না দীপনাথ। সে কি সত্যিই মণিদীপার কাছে রঞ্জনের কথা নিয়ে চুকলি করছিল? ভাবলে এখনও কান লাল হয়ে ওঠে যে!
না রে যাই। আজ অন্য কাজ আছে।
বলে দীপনাথ কাউন্টার ছেড়ে চলে আসতে আসতেও একবার কী ভেবে বিলুর দিকে ফিরে দেখল। বিলুকে একটু অন্যরকম লাগছে না? কেন লাগছে? কয়েকদিন ধরেই যেন একটু অন্যরকম! না? বিলুর চুল আর রুক্ষ নয়। একবেণীতে বাঁধা। ক্রু কি প্লাক করে বিলু আজকাল? হতে পারে। তবে ঠোঁটে ন্যাচারাল কালারের লিপস্টিক যে দিযেছে তা স্পষ্টই বোঝা যায়। মুখের উজ্জ্বল রং প্রমাণ করে মুখেও আজকাল কোনও দামি মেক-আপ ব্যবহার করে সে। চোখে কি একটু আবছা কাজলও দিয়েছে?
দীপনাথের ফিরে তাকানো দেখে বিলুও চেয়ে ছিল। দীপনাথ তাই চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে চলে আসে। মনটা খারাপ লাগে। খুব খারাপ লাগে। হয়তো চাকরি করতে গেলে মেয়েদের একটু সাজতেই হয়। এর পিছনে হয়তো অন্য কারণ নেই। তবু কেন মনটা খারাপ হল আজ দীপনাথের?
বিলুর ভাবনাটা শেষ করেনি দীপনাথ। ভাবতে ভাবতেই প্রচণ্ড রোদের রাস্তায় ছায়া দেখে দেখে হাঁটছিল। বিলু আজকাল আগেকার মতো গোমড়ামুখী নয়। বেশ কথাটথা বলে। হাসে-টাসেও। বয়সটাও যেন যথেষ্ট কমে গেছে।
এসব থেকে অবশ্য কোনও পাকা সিদ্ধান্তে আসতে পারে না দীপনাথ। কিন্তু বুকের মধ্যে একটা মনখারাপের বাতাস বইতে থাকে।
এই জনকোলাহল, মানুষে-মানুষে বিচিত্র সব সম্পর্ক, সংসারে জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে হরেক জটিলতা, অপমান, দুঃখ ও অভাববোধ, এসব ছাড়িয়ে ওই বহু দুরে এক মহান শ্বেতবর্ণের পর্বত দাঁড়িয়ে আছে তার জন্য। শুধু তারই জন্য। দীপনাথ বরফকাটা কুটুল নেবে না, নাল লাগানো জুতো পরবে না, সঙ্গে নেবে না অক্সিজেন সিলিন্ডার, দড়ি বা তাঁবু। সে একদিন এমনি সাদামাটা ভাবে রওনা দেবে সেই উত্তুঙ্গ প্রেমিক ও প্রভুর কাছে। নিজের তুচ্ছতাকে বিসর্জন দেবে সেই মহিমময়ের অতুলনীয় মহত্ত্বের মধ্যে। একদিন কি পাহাড় ডাকবে না তাকে?
আজ হঠাৎ সেজদা ব্যাংকে এসেছিল।–বিলু একটু দুশ্চিন্তার সঙ্গে বলে।
অরুণ গাড়ি চালাচ্ছিল। মুখ না ফিরিয়েই বলল, সো হোয়াট?
সেজদা কখনও আসে না তো।
তাই বলেই কি আসতে নেই? তোমার সব অদ্ভুত-অদ্ভুত প্রবলেম। সেজদা ব্যাংকে এসেছিল কেন তা নিয়েও মাথা ঘামাতে হবে নাকি?
অরুণ ঠিক এসব ব্যাপার বুঝবে না। ওদের পরিবার সম্পূর্ণ অন্য ধরনের। ওরা অন্য রকম মানুষ। অঢেল টাকা, অপার স্বাধীনতা। পরিবার থেকে কোনও বাধা নিষেধ নেই। বাপে-ছেলেতে একসঙ্গে বসে মদ খায়, একই ক্লাবে ফুর্তি করতে যায়, মেয়েমানুষ নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করে।
বিলু তাই দাঁতে ঠোঁট কামড়ে একটু ভেবে বলল, জিজ্ঞেস করছিল যে তুমি আমাকে লিফট দাও কি না!
দিই তো!
দাও সে তো ঠিকই। এখনও তো দিচ্ছ। বললাম যে, সেজদা কথাটা জানতে চাইছিল।
অরুণ গাড়িটা একটু আস্তে করে বলল, প্রবলেমটা কি একটু বলবে খোলাখুলি? সেজদা জানতে চাইল তো তাতে কী হল?
ভাবছি সেজদা আমাদের নিয়ে কিছু ভাবছে কি না।
কী ভাববে?
সন্দেহ করতে তো পারে কিছু!
লাভ অ্যাফেয়ার?
যদি ধরো তাই।
অরুণ হাসল, কথাটা তো মিথ্যেও নয়। আই লাভ ইউ।
ইয়ারকি কোরো না। সেজদা একটু সেকেলে। হয়তো ফ্রেন্ডশিপ বোঝে না। উল্টোপাল্টা কিছু ভেবে বসে আছে।
সেটা কি কোনও অ্যাংজাইটির ব্যাপার আমাদের? তুমি যেমন আছে তেমনি থাকবে। লোকে যা খুশি ভাবতে পারে। আমরা তো বাচ্চা ছেলেমেয়ে নই। ভালমন্দ বুঝি।
বোঝো?–বিলু একটু হাসে।
আলবাত বুঝি।
তা হলে বলো তো, এই যে আমাকে লিফট দিচ্ছ, এটা ভাল না মন্দ?
রাবিশ, বিলু। এসব নিয়েও তুমি ভাবো নাকি আজকাল? তুমি একদম পাল্টে গেছ।
কী রকম?
আগে তোমার এত সংকোচ ছিল না। কত ফ্রি ছিলে!
আজকাল ফ্রি নই?
একদম নও। সেজদার সঙ্গে সঙ্গে তুমিও একই লাইন অফ থটস ধরে ফেলেছ।
সংসারে, বিশেষ করে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত সংসারে বেশি ফ্রিডম ভাল নয়, অরুণ।
কে তোমাকে এসব শেখাচ্ছে বলো তো!
কে শেখাবে! নিজেই বুঝতে শিখছি।
বিলু, পৃথিবী তো পিছিয়ে যাচ্ছে না। চারদিকে চেয়ে দেখো কত মুক্ত হয়ে যাচ্ছে সমাজ, কত অবাধ হচ্ছে। নিজের মনের মধ্যে মাথা কুটে মরার সংস্কার থাকলে স্বাধীনতার অর্থই থাকে না। তোমাকে স্বাধীন করবে কে?
বোকো না তো! বকবকানি একদম ভালবাসি না।
অরুণ খুব হাসল। বলল, কেমন দিলাম আস্ত একখানা ভাষণ ছেড়ে!
কলেজের ডিবেটিং-এ বলতে, সে একরকম ছিল। এখন তো দামড়াটি হয়েছ।
আচ্ছা, নাউ আই শ্যাল হোল্ড মাই টাং অ্যান্ড লেট ইউ লাভ।
বিলু খানিকক্ষণ থম ধরে রইল। তারপর হঠাৎ বলল, তুমি একটা ব্যাপার লক্ষ করেছ, অরুণ?
কী বলো তো!
আমার ভুল হতে পারে। আগে বলল, প্রীতমকে আজকাল তুমি কেমন দেখছ?
কেমন মানে?
মানে প্রীতমকে আগের মতোই রুগ্ন লাগে কি তোমার?
অরুণের মুখে হাসি নেই। গম্ভীর মনোযোগে খানিকক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, হয়তো খুব খুঁটিয়ে লক্ষ করিনি। ইজ দেয়ার এনি ইমপ্রুভমেন্ট?
