আপনি তো কাল ডিভোর্সের কথা বলছিলেন।
ডিভোর্স একটা সোশ্যাল স্ক্যান্ডাল। জবাবদিহি করতে করতে জিব বেরিয়ে যাবে পাঁচজনের কাছে। আমি চাইছিলাম স্নিগ্ধর ক্লাচ থেকে ওকে বের করে বাংগালোরে নিয়ে যেতে।
দীপ একটু ভাবল। বলল, উনি বোধ হয় রাজি নন।
না।
তা হলে কী হবে?
ও যদি শেষ পর্যন্ত রাজি হয় তবে আমি নিশ্চয়ই এ চাকরি ছেড়ে বাংগালোরের অফারটাই নেব। ইট অল ডিপেন্ডস অন হার।
বুঝলাম। বলে দীপ বিরস মুখে উঠে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত মিসেস বোসের অনিশ্চিত ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপরেই তার ভাগ্য নির্ভরশীল। ব্যাপারটা খুবই অপমানজনক নয় কি?
বোস একটু ঠান্ডা হয়েছে। হাফ-ধরা ভাবটাও আর নেই। বলল, আমি কাল আপনাকে আর-একটা কথাও বলেছিলাম। সেটা কিন্তু ইমোশনের কথা নয়।
কী কথা?
আই রিয়েলি নিড ইউ। প্লিজ ট্রাই টু বি মাই ফ্রেন্ড।
দীপনাথের ভদ্রতায় বাধে। নইলে বলত, আপনার স্ত্রীর সঙ্গে প্রেম আছে সন্দেহ করেও বন্ধুত্ব চনি? না বলে দীপনাথ একটু কাষ্ঠহাসি হাসল। মাথা নাড়ল শুধু। তার অর্থ, ঠিক আছে।
বোস খুব তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে ছিল। হঠাৎ চোখ নামিয়ে টেবিলের একটা কাগজ খামোখা দেখতে দেখতে বলল, আমি জানি কাজটা আপনার পক্ষে বেশ শক্ত। ইন রিয়েলিটি, আপনার ওপর কিছু ইনজাস্টিস হয়েছে। কিন্তু সেগুলো মেরামত করা অসম্ভব নয়।
মিসেস বোসের মতামতটা কবে জানা যাবে?
জানি না। তবে আজ আমি আর-একবার ট্রাই করব।
একবার স্নিগ্ধদেবকে অ্যাপ্রোচ করুন না!
বোস এবার চোখ তুলে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে। তারপর ধীর স্বরে বলে, লোকটাকে আমি চিনি। প্রথম দিকে ওপেনলি কয়েকবার আমাদের বাসায় এসেছে। কথাবার্তায় ভীষণ ভদ্র, হাসিটাও খুব সুইট। কিন্তু অসম্ভব স্টাব্যের্ণ। ও যদি কোনও কিছু স্থির করে থাকে তবে তা মরলেও বদলাবে না। তা ছাড়া আপনি কি মনে করেন নিজের স্ত্রীকে কোনও ব্যাপারে রাজি করাতে অন্য কারও সাহায্য নেওয়াটা ওয়াইজ ডিসিশন?
সেটা অবশ্য ভেবে দেখিনি।
ম্লান হেসে বোস বলে, আমাকে ভাবতে হয়।
দীপনাথ বিনীতভাবে বলল, যদি অনুমতি দেন তবে আমি একবার এই রিমোট কন্ট্রোলটির কাছে অ্যাপ্রোচ করতে পারি।
রিমোট কন্ট্রোল!–বলে বোস অবাক হয়ে তাকায়।
ওই যে স্নিগ্ধদেব। যিনি আড়াল থেকে মিসেস বোসকে চালাচ্ছেন।
রিমোট কন্ট্রোল!–বলে হঠাৎ হেসে ওঠে বোস। খুব জোরে নয়। তবু সেটা হাসিই। মাথা নেড়ে বলে, রিমোট কন্ট্রোল! একজ্যাকটলি। কিন্তু আপনারও তার কাছে যাওয়ার দরকার নেই। স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারে ঠিক ওভাবে ফয়সালা হয় না। তবু আপনার অফারের জন্য ধন্যবাদ। আপনি আজ চলে যেতে পারেন। আমার আজ আর আপনাকে দরকার হবে না। কল ইট এ ডে।
দীপনাথ বেরিয়ে এল।
বাইরে হা হা করছে রোদ। ফুটকড়াই ভাজা গরম। টেরিলিনের নিচ্ছিদ্র শার্টের তলায় গা ভিজে গেল ঘামে।
আনমনে রাস্তা পার হল দীপনাথ। হাতে অনেকটা সময় আছে। এই খর গ্রীষ্মের দুপুরে তার কোথাও যাওয়ার নেই। বোস যদি বাংগালোরে না যায় তবে সে এই কোম্পানির অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হবে কোনওদিন। কিন্তু অতটা ভাবতে একটু কষ্ট হয় তার। বোস সাহেব যতই বলুক, লোকটা ধুরন্ধর। কোনও না কোনও দিক থেকে লোকটার ওপর প্রেশার রাখতে হবে। কিন্তু বোসকে প্রভাবিত করার কোনও পথ পায় না দীপ।
স্নিগ্ধদেব। একবার স্নিগ্ধদেবের কাছে খুব যেতে ইচ্ছে করে দীপনাথের। সে হয়তো এক ছদ্মবেশী ট্রটস্কি। সে-ই হয়তো ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী। স্নিগ্ধদেবই হয়তো সেই মানুষ যার জন্য পৃথিবী অপেক্ষা করছে। আবার হয়তো বা সে একটা ফ্রড! একটা সাইকিক কেস। স্রেফ ধোঁকাবাজ।
যাই হোক, একবার স্নিগ্ধদেবের কাছে যেতে খুব ইচ্ছে করে।
বিলু যে ব্যাংকে কাজ করে সেটা খুব দূরে নয়। প্রীতমটা কেমন আছে জানতে গুটি গুটি সেদিকেই রওনা দিল দীপ। বেলা দুটো বাজবার মুখে মুখে পৌঁছেও গেল।
বিলু কাউন্টারে বসে। চোখাচোখি হতেই চোখ তুলে বলল, সেজদা!
প্রীতম কেমন?
ওই রকমই।
লাবু?
আর কী, দিন দিন দুষ্টু হচ্ছে।
তুই কখন বাড়ি ফিরিস?
দেরি হয়। সন্ধের মুখে মুখে। কেন বলো তো?
না এমনিই জিজ্ঞেস করলাম। অনেকটা সময় প্রীতম একা থাকে।
কী করব বলো! সবই তো বোঝে।
বুঝি, আবার বুঝিও না। চাকরিটা না নিলেই পারতিস।
পারতাম না। জোরে বোলো না, সবাই শুনবে। কোত্থেকে এলে হঠাৎ?
আমার অফিস তো দূরে নয়।
তাই তো। মনেই ছিল না।
অরুণ আসে-টাসে?
বিলু যেন চোখটা ফিরিয়ে নিল একটু। বলল, আসে। ওর বাবা এই ব্যাংকের ডিরেক্টর।
বিলু কি সত্যিই অরুণের সঙ্গে প্রেম করে? দীপনাথ সাহস করে বলল, কীসে ফিরিস বিকেলে?
লেডিজ ট্রামে। কখনও মিনিবাসে।
অরুণ লিফট দেয় না?
বিলু কি একটু ভয় পেল? কেমন যেন দেখাল মুখখানা। ধরা পড়া ভাল। নিচু স্বরে বলল, কালেভদ্রে। যখন আসে তখন পৌঁছে দেয়।
বিলু অরুণের সঙ্গে প্রেম করলেই বা তার কী? ভেবে পায় না দীপনাথ। সে নিজেও কি মণিদীপার প্রেমে পড়েনি? ওটাও পরস্ত্রী, এটাও পরস্ত্রী। তবু মানুষ এমনই অন্ধ, এমনই নিকৃষ্ট যে, নিজের বেলা আর পরের বেলা দু’রকম চোখ নিয়ে দেখে। দীপনাথও অবিকল তাই। নিজেকে একদিন দীপনাথ হয়তো এ জন্যই ঘৃণা করতে শুরু করবে। নিজেকে ঘৃণা করার অনেকগুলো কারণ ঘটতে শুরু করেছে।
দীপনাথ উদাস মনে জিজ্ঞেস করল, আজ কখন ফিরবি?
দেরি আছে। পাঁচটার আগে তো নয়।
