সে কি খুব গরিব?
বেশ গরিব। কেন?
যদি গরিব হয় তবে তাকে আমার ভালবাসা জানিয়ে দেবেন। যে-কোনও গরিবেরই অধিকার আছে আমাকে ঘৃণা করার। কারণ দুর্ভাগ্যবশত আমি একজন ওপরওয়ালার স্ত্রী। কিন্তু যে-কোনও গরিবই আমার পরম শ্রদ্ধার পাত্র।
এ কথাও কি তাকে জানাব?
নিশ্চয়ই। কিন্তু জানানোর সাহস আপনার হবে না।
কেন?
কারণ চুকলি যারা করে তাদের সৎসাহস থাকে না।
তার মানে?
আপনি কার কথা বলছেন তা আমি জানি। রঞ্জন। সে যদি কোনও কথা আপনাকে বলেই থাকে তবে সেটা আমার কাছে ফাঁস করা আপনার উচিত হয়নি, দীপবাবু। একে সাদা বাংলায় চুকলি করা বলে।
দীপনাথের মাথা ঝা ঝা করছিল অপমানে। এই মেয়েটার কাছে সে কেন বারবার এ রকম হেরে যায়? এত নির্মমই বা কেন মণিদীপা?
মণিদীপার শান্ত স্বর ওপাশ থেকে শোনা গেল, শুনুন দীপবাবু, আমি আপনার ভাল চাই বলেই আপনাকে ছোট হতে দেখলে খারাপ লাগে। মনে রাখবেন আপনিও একজন গরিব, আর গরিবের জন্য সামনে বিশাল লড়াই পড়ে আছে। কূটকচালির মধ্যে জড়িয়ে পড়লে লড়াইটা করবে কে?
দীপনাথ অস্ফুটস্বরে বলল, মাপ করবেন। ঠিক চুকলির জন্য কথাটা বলা নয়।
তাও জানি। আপনি আমাকে একটু চিমটি কাটতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অত সহজে জব্দ হওয়ার মানুষ তো আমি নই। আমার ট্রেনিং আছে।
টেলিফোনটা কান থেকে নামিয়ে সভয়ে দীপনাথ সেটার দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। ওপাশে মণিদীপা এখনও কিছু বলছে। কিন্তু সেটা শুনল না দীপনাথ।
আস্তে টেলিফোনটা নামিয়ে রেখে বেরিয়ে এল।
অল্পের জন্য বেঁচে গেল দীপনাথ। বেরোতেই মুখোমুখি বোস সাহেব।
খুবই গম্ভীর মুখ বোস সাহেবের। দীপনাথের দিকে চেয়ে বলল, চেম্বারে আসুন। কথা আছে।
২৫. দীপ একটু থতমত খেয়েছিল
দীপ একটু থতমত খেয়েছিল ঠিকই। আবার বোসের সঙ্গে চলার দীর্ঘকালের অভ্যাসবশে সামলেও গেল।
চেম্বারে ঢুকে বোস সাহেবের মুখোমুখি বসল শান্তভাবে। মনে কিছু প্রত্যাশা। চাকরি বা পারমানেন্ট স্ট্যাটাস নিয়ে। দীপনাথ অবশ্য নিজে থেকে কিছু জিজ্ঞাসা করবে না। বোস নিজেই যদি বলে।
বোস সাহেবকে খুবই ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। ইদানীং দীপ লক্ষ করছে, এই অল্প বয়সেই বোসের গায়ের চামড়া অনেকটাই যেন ঝুলে ঝুলে পড়েছে। শরীরের কোনও বাঁধন নেই। মুখশ্রীতে কিছু শ্রীহীনতা। ফ্যামিলি অ্যাফেয়ার্সের জন্য হতে পারে। কিংবা কোনও অসুখ হওয়াও বিচিত্র নয়।
বোস নিজের চুলে অতি দ্রুত উত্তেজিত আঙুল চালাল কয়েকবার। একটু হাঁফাচ্ছেও। আজকাল অসম্ভব গরম পড়ে গেছে কলকাতায়। জুন চলে গেল। জুলাইয়ের আজ চার তারিখ। বৃষ্টি নেই। কলকাতায় আজকাল বৃষ্টি হয় কম। গরম ক্রমেই বাড়ছে। বৃক্ষহীন শহরের বাতাস বিষিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এই গরমে বোসের মতো আরামপ্রিয় নধরকান্তিদের হাঁফ ধরা স্বাভাবিক। তবু কেমন সন্দেহ হয় দীপনাথের। লোকটার শরীর হয়তো ভাল নেই।
বোস কিছু বলার আগেই তাই দীপনাথ হঠাৎ বলে ফেলল, ইদানীং কোনও মেডিক্যাল চেক-আপ করিয়েছেন মিস্টার বোস?
বোস সাহেব বেশ কষ্টকর একটা বড় শ্বাস ছেড়ে বলল, না তো! কেন?
আপনার বয়স বেশি নয় জানি। তবু একটা মেডিক্যাল চেক-আপ করিয়ে রাখা ভাল।
বোস একটু অবাক হয়ে চেয়ে থেকে বলে, কেন বলুন তো! আমি তো বেশ ভালই আছি।
আমি বলছি না যে, আপনি অসুস্থ। তবে চেক-আপের হ্যাবিট রাখা ভাল। বিশেষ করে যারা রেসপনসিবল পোস্টে কাজ করে তাদের জন্য এটা দরকার। অন্তত হার্ট, প্রেশার আর সুগার।
হেল উইথ দোজ থিংস। শুনুন, কোম্পানি আপগ্রেডেড হচ্ছে।
দীপনাথ অপমান হজম করে অভ্যস্ত। প্রথম কথাটা তাই গায়ে মাখল না। দ্বিতীয় কথাটা শুনে একটু নড়েচড়ে বসল। বলল, মালিকরা রাজি হয়ে গেল তা হলে?
ভারবালি। ফাইনাল ডিসিশন আমেদাবাদে গিয়ে জানাবে। তবে কথার নড়চড় বড় একটা ওদের হয় না।
তা হলে আপনি কি এই কোম্পানিতেই থাকছেন?
সম্ভবত। ওরা আমাকে আমেদাবাদে হেড অফিসে যাওয়ারও অফার দিয়েছে। সেকেন্ড অফার দিল্লির নতুন ব্রাঞ্চের চার্জ। আমি কোনওটাতেই রাজি হইনি। ইস্টার্ন জোনে আমার পাওয়ার অনেক বেশি।
সে কথাও ঠিক!
আগামী কয়েক মাসে এখানে অনেক রদবদল হবে। আমি যদি শেষ পর্যন্ত থাকি তবে আপনি একটা ভাল পজিশন পাবেন।
সাবধানে দীপনাথ মুখ তুলে জিজ্ঞেস করল, কীরকম পজিশন?
চারজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার নেওয়া হবে। আপনি ওই চারটে পোস্টের একটা পেতে পারেন। আবার বলছি, যদি আমি থাকি। আমার ডিসিশন এখনও ফাইনাল নয়।
আর যদি বাংগালোর যান, তা হলে?
তা হলেও ওপেন অফার আছে। কাল রাতেও বলছিলাম। আপনিও যেতে পারেন।
কিন্তু আপনারই যে কোনও নিশ্চয়তা নেই মিস্টার বোস।
বোস মাথা নাড়ল, না, আমার কোনও নিশ্চয়তা এখনও নেই। তবে হয়তো দিন সাতেকের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনি তো অনেকদিন অপেক্ষা করলেন। আর তোমোটে সাত আটটা দিন। মালিকরা ফিরে গিয়েই বোর্ডের মিটিং ডাকবে। তবে সে মিটিং নাম কো বাস্তে। ডিসিশন যা হওয়ার তা এখানে আজই বলতে গেলে হয়ে গেল।
তবু আপনি বাংগালোরে যাওয়ার ব্যাপারটা ঝুলিয়ে রাখলেন কেন?
দেয়ার ইজ অ্যানাদার প্রবলেম। কাল রাতে সেটা নিয়েও আপনার সঙ্গে ডিসকাশন হয়েছিল। মিসেস বোস?
একজ্যাকটলি।
প্রবলেমটা কী?
দীপা নিজেই প্রবলেম। শি ইজ পলিটিক্যালি অবসেন্ড। মেয়েদের পলিটিকস করা আমার পছন্দ নয়। দু’নম্বর, শি ইজ গাইডেড বাই অ্যানাদার ম্যান।
