স্নিগ্ধর কথা ওঠে কেন? কথা হচ্ছে আপনার আর আমার মধ্যে। লিভ স্নিগ্ধ।
আমি ওঁর নাম উচ্চারণ করলেও বুঝি ওঁকে অপমান করা হয়?
মণিদীপা অধৈর্যের গলায় বলে, ইউ আর স্টিল প্রিমিটিভ। ইউ আর জেলাস।
দীপনাথ একটু চোখ বুজে দম ধরে রইল। তারপর বলল, আমার জেলাসির কোনও কারণ নেই। নিশ্চয়ই জেলাস। আপনি জেলাস, মিস্টার বোস জেলাস। আপনারা স্নিগ্ধকে হিংসে করেন, কারণ আপনারা জন্মেও ওর মতো হতে পারবেন না।
সবাই কি নেতা হতে পারে? কাউকে কাউকে তো জনগণও হতে হবে।
স্নিগ্ধ নেতা নয়। আমরা ব্যক্তিপূজায় বিশ্বাস করি না, নেতৃত্বেও নয়।
তা হলে কি কালেকটিভ লিডারশিপ?
ও বাবা। তাও জানেন দেখছি।
একটু একটু শিখছি।
এবার খবরটা কি দয়া করে বলবেন?
তাই তো বলতে চাইছিলাম। কিন্তু আপনি বলতে দিচ্ছেন কই?
সরি। এবার বলুন।
বোস সাহেব বাংগালোরের চাকরি নাও নিতে পারেন। আজ মালিকদের সঙ্গে কনফারেন্স হল।
শুনে মণিদীপা একটু চুপ করে থাকে। তারপর নিস্পৃহ গলায় বলে, তাতে আমার কী?
কিছুই কি নয়?
বোস সাহেবের বাংগালোরে যাওয়া না-যাওয়া নিয়ে তো কোনও প্রবলেম হয়নি। আমাদের প্রবলেম অন্য। সে আপনি বুঝবেন না।
দীপনাথ বিষণ্ণ হয়ে বলে, ও। আমি অবশ্য আপনাদের প্রাইভেট ব্যাপারে কিছু জানতে চাইছিলাম না। জাস্ট খবরটা দিলাম, যদি তাতে আপনার মত বদলায়।
না, খবরটার তেমন কোনও দাম নেই আমার কাছে। বোস কি ফাইন্যালি ডিসিশন চেঞ্জ করেছে?
তা এখনও জানি না। তবে ভাবসাব দেখে মনে হয়, মালিকরা এ রকম একজন এফিসিয়েন্ট লোককে ছাড়বে না।
এফিসিয়েন্ট!–বলে একটু শ্লেষের হাসিই যেন হাসল মণিদীপা। তারপর বলল, আপনি কষ্ট করে খবরটা দিলেন বলে ধন্যবাদ। যদিও খবরটার কোনও ইমপট্যান্সই আমার কাছে নেই।
শুনুন, মিসেস বোস।
শুনছি। কিন্তু মিসেস বোস নয়, মণিদীপা। আমার নিজস্ব পরিচয়টাই আমার একমাত্র পরিচয়, কথাটা কতবার বলেছি?
মনে রাখতে পারি না। আমরা একটু সেকেলে।
হ্যাঁ, আপনারা কিছু অভ্যাসের দাস।
তাই হবে।
কী বলছিলেন?
কাল রাতে আমি আপনাকে যা বলেছি তার জন্য খুব লজ্জিত।
লজ্জার কী আছে? ফ্র্যাংকনেস আমি পছন্দই করি। আমিও তো আপনাকে কিছু কথা বলেছি।
ওসব তো সত্যি নয়।
কোনটা সত্যি নয়?
ওই যা সব বললেন।
বোস সাহেব আপনাকে আর আমাকে সন্দেহ করে কি না?
দীপনাথের কান লাল হল এত দূরে থেকেও। বলল, ওসব উনি যদি ভেবে থাকেন তো ভুল ভেবেছেন।
ভুল ভাবতে পারেন। তবে সত্যি হলেও লজ্জার কিছু নেই।
কী যে বলেন!
আপনি মেয়েদের বোকা ভাবেন, না?
না তো। কেন?
সব পুরুষই তাই ভাবে।
আমি ভাবি না।
আর মেয়েরাও আবার পুরুষদের বোকা ভাবে।
এসব কথা হচ্ছে কেন?
ভাবছিলাম, আপনি আমাকেও বোকা ভাবেন কি না?
মোটেই না।
ভাবলেই ভাল। কারণ, আমি বোকা নই।
আপনি তো খুবই বুদ্ধিমতী।
খুব না হলেও মোটামুটি।
কিন্তু কী বলতে চাইছেন?
বলছি যে, আমি পুরুষদের ভাবসাব এবং মতলব টের পাই।
ঠিক বুঝলাম না।
আমি জানি আপনি আমার প্রেমে পড়েছেন।
না না। ছিঃ ছিঃ কী যে বলছেন সব…
আর তাতে আমি মোটেই রাগ করিনি। বরং খুশি হয়েছি।
কিন্তু ব্যাপারটাই যে সত্যি নয়।–দীপনাথ মিথ্যেটাকে সত্যি বলে চালাবার চেষ্টা করে।
ওপাশ থেকে মণিদীপা খুব আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বলে, আমি মানুষে মানুষে ভালবাসায় বিশ্বাসী। বরং ভাল না বাসাটাই সন্দেহজনক।
কিন্তু সে তো অন্য ভালবাসা।
আমার কাছে সব ভালবাসারই অর্থ এক। ভালবাসা মানেই তো আর বিয়ে বা সেক্স নয়।
তা হলে মিস্টার বোস কী দোষ করলেন? উনি কেন আপনার ভালবাসা পাচ্ছেন না?–খুব বুদ্ধিমানের মতো পট করে কথাটা পেড়ে ফেলল দীপনাথ।
মানুষ হিসেবে ওঁর প্রতিও আমার ভালবাসা এবং সহানুভূতি আছে। তবে আমরা শ্রেণিশত্রুর প্রতি কিছুটা নির্দয়।
মিস্টার বোস আপনার শ্রেণিশত্রু হতে যাবেন কেন? আপনাদের শ্রেণি তো এক।
মোটই নয়। দেয়ার ইজ এ গ্রেট ডিফারেন্স।
কিসের ডিফারেন্স?
আমি তো আপনাকে আগেও বলেছি আমি হচ্ছি শ্রমিকশ্রেণির মানুষ।
বলেছেন, কিন্তু আমি কথাটা আজও বুঝতে পারিনি।
কারণ আপনার সেই মানসিকতা বা ট্রেনিং নেই।
তা অবশ্য ঠিক।
অথচ শুনেছি আপনি এক সময়ে ছাত্র আন্দোলন করতেন। এবং সেটা করতেন শিলিগুড়িতেই, যেখানে অনেক বিপ্লবীর জন্ম।
দীপনাথ সত্যিকারের অবাক হয়ে বলে, এ কথা আপনাকে কে বলল?
বলেছে শিলিগুড়িরই একটা ছেলে। জেসপের ইঞ্জিনিয়ার। একটা পার্টিতে কিছুদিন আগে আলাপ হল। সে শিলিগুড়ির ছেলে শুনে আপনার রেফারেন্স দিয়েছিলাম।
আমাকে চিনল?
খুব চিনল। নইলে জানলাম কী করে?
তখনকার ছাত্র আন্দোলন তো এখনকার মতো ছিল না।
তা হতে পারে। তবু আপনি যে কোনওদিন কোনও আন্দোলন করেছেন তাতেই প্রমাণ হয় যে, আপনার ব্যাকবোন ছিল।
এখন কি নেই?
না। মিস্টার বোসের তাঁবেদারি করে করে আপনার বাকবোন ভেঙে গেছে। সোজা কথা, মিস্টার বোসরা অন্যের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার জন্যই অত মাইনে পান।
তাই নাকি?
ঠিক তাই। আর সেইজন্যই মিস্টার বোস আমার শ্রেণিশত্রু। আপনারও।
দীপনাথ ঠিক করেছিল, কথাটা বলবে না। কিন্তু এখন একটু গুমগুম রাগ আর উত্তেজনার মাথায় কথাটা এসে গেল। সে বলেই ফেলল, কিন্তু আপনাকেও যে কেউ কেউ চরম শ্রেণিশত্রু মনে করে।
করতে পারে। তারা কারা?
আপনারই আত্মীয়স্বজন কেউ কেউ।
আমার আত্মীয়দের আপনি চেনেন?
আপনার এক দেওরের সঙ্গে আলাপ হল। দূর-সম্পর্কের দেওর। সে আপনাকে পছন্দ করে না।
