দীপনাথ আড়চোখে দেখল, উর্দিপরা একজন বেয়ারা ট্রে-ভর্তি কোল্ড ড্রিংকস নিয়ে বোস সাহেবের চেম্বারে ঢুকছে। সাদা গুলো বোতলের মুখ থেকে উঁচু হয়ে আছে। দৃশ্যটা সুন্দর দেখায়।
দীপনাথ চেম্বারের দরজার দিকে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল, তুমি এখানে কত পাচ্ছো?
রঞ্জন বলল, মোটে আড়াইশো। ফেলাদা ইচ্ছে করলেই তিনশো সাড়ে তিনশো করতে পারত। কিন্তু করবে না। হি ইজ সেলফিশ।
আত্মীয়রা কেউই বোধহয় মিস্টার বোসের ওপর খুব খুশি নয়, না?
কেউ না। ফেলাদার মা-বাবা পর্যন্ত ওকে পছন্দ করে না।
দীপনাথ চুপ করে বসে রইল। বোস সাহেব যে কেন এত একা তা বুঝতে আর কষ্ট হয় না তার। গতকাল সন্ধ্যায় বোস সাহেব যে কেন তার বন্ধুত্ব চেয়েছিল তা স্পষ্ট হয়ে গেল এখন।
রঞ্জন বলল, আমি শুনেছি আপনি নাকি খুব এফিসিয়েন্ট লোক। অথচ ফেলাদা আপনাকে লেজে খেলাচ্ছে, চাকরি দিচ্ছে না। অফিসে এ নিয়ে কথা হয়।
দীপনাথ কথাটা কানে নিল না। বরং অন্য দিকে চেয়ে হঠাৎ একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল, ওঁর ডাকনাম ফেলা কেন বলো তো?
ফেলা? ও। ফেলাদার আগে বোধহয় পিসির আরও ছেলেমেয়ে হয়ে বাঁচেনি। তাই এই ছেলের নাম ফেলা। খুব আদরের ছিল।
দীপনাথ মাথা নেড়ে বলে, বেশি আদরের ছেলেরা একটু বখা হয়।
রঞ্জন হাসল। বলল, আদরের ছেলেরা বখা হলে আপত্তি নেই। বখা ছেলেরাও অনেক সময়ে মা-বাপকে হ্যাটা করে না। কিন্তু ফেলাদা তো বখা ছেলে নয়। বরং ভাল রেজাল্ট করে পাশ করেছে বরাবর, ভাল চাকরি করছে। একে তো বখা বলে না। এ তো সেলফিশনেস। আদরের ছেলেরা সেলফিশ হবে কেন?
দীপনাথ ভ্রু কুঁচকে ভেবেও এই রহস্যের সমাধান খুঁজে পেল না। কিন্তু বোস সাহেবের একাকিত্বের ব্যাপারটা বুঝতে পারল। লোকটা খুবই আনপপুলার সন্দেহ নেই। সে মাথা নেড়ে হঠাৎ একটু হেসে ঘোষণা করল, মিসেস বোস কিন্তু সেলফিশ নন।
রঞ্জন স্থির চোখে দীপনাথকে একটু মাপজোখ করে নিয়ে বলে, বউদি ফেলাদার চেয়েও বেশি সেলফিশ। আপনি ওকে চেনেন না।
চেম্বারের দরজা হঠাৎ খুলে গেল। জনা চারেক লোক বেরিয়ে এল কথা বলতে বলতে। তিনজনের পরনে ঝকঝকে স্যুট। শুধু খুব লম্বা এবং রোগা মানুষটির পরনে ধুতি এবং গলাবন্ধ সুতির কোট, মাথায় সাদা পাগড়ি। সকলের পিছনে বোস সাহেব। তাদের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল না, ডিসিশন কোন দিকে গেছে। তবে তাদের কারও মুখেই গাম্ভীর্য বা হাসিখুশি ভাব নেই।
বোস সাহেব ওদের সঙ্গেই অফিস থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে চারদিকে চেয়ে দেখে নিল একবার। দীপনাথ নিজের উপস্থিতি জানান দিতে উঠে দাঁড়িয়েছিল। বোস সাহেব একবার তাকালও তার দিকে, কিন্তু কোনও ইশারা করল না।
দীপনাথ আবার বসে পড়ল। এই দাঁড়ানোর অবস্থায় তাকে দেখলে মণিদীপা অবশ্যই চাপা হিংস্র গলায় বলত, স্লেভ! স্লেভ! বন্ডেড লেবারার।
ওরা বেরিয়ে যেতেই অফিসে একটা চাপা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল, নানা রকম অনুমান, আন্দাজ।
হাতে একটা কাজ আছে। সেরে ফেলি। বলে রঞ্জন তার টাইপ মেশিনে খটাখট শব্দ তুলতে লাগল।
দীপনাথ উঠে সামনের দিকে জানালায় এসে উঁকি দিয়ে দেখল, মস্ত একটা গাড়িতে বোঝাই হয়ে বোস সাহেব সমেত মালিকরা কোথাও যাচ্ছে। অর্থাৎ এখন তার কোনও কাজ থাকছে না।
দীপনাথ বোকা নয়। সে জানে এই কোম্পানির যা ক্যাপিট্যাল ইনভেস্টমেন্ট আছে তাতে অনায়াসে এটাকে উঁচু গ্রেডে তোলা যায়। কিন্তু ব্যবসায়িক কারণে মালিকরা তা চাইছে না। বোস চাইছে। শুধু ব্যক্তিগত বেতন বা ভাতা বাড়ালেই বোস খুশি হওয়ার লোক নয়। সে যে এ কোম্পানিকে হায়ার গ্রেডে তুলেছে তার স্বীকৃতি না দিলে সে খুশি হবেও না। টাকার সঙ্গে প্রেস্টিজও তার দরকার! মালিকরা সেই মৌলিক ব্যবসাগত নীতিতে নরম হল কি না সেটাই বড় কথা।
সুতরাং দীপনাথের অনিশ্চয়তা কাটে না।
বোস সাহেবের বেয়ারাকে জিজ্ঞেস করতেই সে বলল, সাহেব লাঞ্চের পর অফিসে আসবে।
লাঞ্চের এখনও দেরি আছে দেখে দীপনাথ সন্তর্পণে গিয়ে বোস সাহেবের চেম্বারে ঢুকে দরজাটা টেনে দিল। এই চেম্বারে ঢুকতে তার কোনও বাধা নেই। প্রায়ই ঢোকে।
চেম্বারে এয়ারকন্ডিশনার চলছে। বিশাল ঝকঝকে সেক্রেটারিয়েট টেবিল, ঘোরানো চেয়ার। মেঝেয় সত্যিকারের উলের কার্পেট। মালিকরা বোস সাহেবকে যথেষ্ট আদরে রেখেছে। এত আদরে থাকলে দীপনাথ বর্তে যেত, আর কিছু চাইত না। মালিকদের কথায় উঠত, বসত। কিন্তু নাল্পে সুখমন্তি। বোস আরও চায়। কেন চায় কে জানে! এ পৃথিবীতে কিছু মানুষের আছে রাক্ষুসে চাওয়া। আলাদিনের দৈত্য কিংবা জিন পরিরাই বোধহয় সেই চাহিদা কেবলই মিটিয়ে যাচ্ছে। দীপনাথ খবর রাখে, এক আধা-সাহেবি কোম্পানির এক ডিরেক্টর বিশ হাজার টাকা মাইনে এবং আর-সব খরচপত্র পায়। এত পাওয়া পছন্দ করে না দীপ। এত পেলে কি জীবনটা বিস্বাদ হয়ে যায় না!
ডাইরেক্ট লাইনে সে বোস সাহেবের বাড়ির নম্বর ডায়াল করল।
মণিদীপা বোধ হয় আর-কারও অপেক্ষায় টেলিফোন কোলে করেই বসে ছিল। প্রথম রিং-এর শব্দটা হতে না হতেই রিসিভার তুলে বলল, হ্যালো।
আমি দীপ।
হুঁ। কী খবর?
একটা খবর বোধহয় দিতে পারি।
কী সেটা?
খবরটা ভাল হলে খাওয়াবেন তো!
আপনার প্রিমিটিভিনেসটা কবে যাবে বলুন তো?
ব্যথাহত দীপনাথ বলে, কেন? প্রিমিটিভিনেসটা কী দেখলেন?
ওই যে খাওয়ার কথা। খাওয়াটা এমন বড় প্রবলেম কি?
দীপনাথ বিষণ্ণ হেসে বলে, আপনার মতো একজন মার্কসবাদীর মুখে কথাটা কি মানাল? দেশের লক্ষ মানুষের মূল প্রবলেমটাই তো এই প্রিমিটিভ প্রবলেম। যা নিয়ে আপনি ভাবছেন, স্নিগ্ধদেব ভাবছেন।
