দীপনাথ জিজ্ঞেস করল, বোস সাহেবের ঘরে কনফারেন্স কতক্ষণ চলছে?
রঞ্জনের এখন কোনও তেমন কাজ নেই বোধ হয়। ডান হাতের মুঠোটা মুদ্রাদোষবশত সব সময়ে মুখের সামনে মাউথপিসের মতো ধরে রাখে। ওই ভঙ্গিতেই বলল, তা ঘণ্টা খানেক হয়ে গেল।
মালিকের চেহারা কেমন দেখলে? খুব বুড়ো?
না, তেমন বুড়ো নয়। বছর খাটের হবে। একেবারে আমার মতো দেখতে। রোগা চিমসে চেহারা। তবে ভীষণ লম্বা। ছ’ফুটের ওপর। সঙ্গে আরও সাঙ্গোপাঙ্গ আছে।
ক’জন হবে?
জনা চারেক। সবাই নাকি মালিক। বড় মেজো সেজো।
তা হলে খুব লড়ালড়ি হচ্ছে, কী বলো?
রঞ্জন হাসল। বলল, তাই তো মনে হচ্ছে।
কোনদিকে ফয়সালা হবে মনে হয়?
কী করে বলি? বোস সাহেব চলে গেলে আমাদের চাকরিরও বারোটা বাজবে। কদিন হল এসব ভেবে আরও শুকিয়ে যাচ্ছি। মালিক যখন নিজে এসেছেন তখম…
মালিক কি খুব বড় অফার দিয়েছে?
সবই গুজব। তবে অতদূর থেকে তো কেবল মিঠা বাত বলতে আসেনি। মালকড়ির কথাই হচ্ছে বোধ হয়।
দীপনাথ একটা স্বস্তির শ্বাস ছাড়ে। বোস থাকলে তার সব দিক দিয়েই সুবিধে। বলল, কনফারেন্স আর কতক্ষণ চলবে?
বলতে পারি না। শুনেছি আজই হেস্তনেস্ত যা হয় হয়ে যাবে। ফেলাদা অবশ্য কালই আমাকে বলেছে অন্য জায়গায় চাকরির চেষ্টা করতে।
সবিস্ময়ে দীপনাথ বলে, ফেলাদা কে?
রঞ্জন একটু হেসে বলে, ফেলাদা বোস সাহেবের ডাকনাম।
তুমি ওঁকে চেনো নাকি?
চিনি না আবার! আমার পিসতুতো দাদা।
বলো কী? এতদিন জানতাম না তো?
অফিসে আত্মীয়তার ব্যাপারটা গোপন রাখাই ভাল।
সে অবশ্য ঠিক। তোমার আপন পিসির ছেলে?
হ্যাঁ। তবে তেমন ঘনিষ্ঠতা তো নেই। ফেলাদাও এখন টপ বস। ফান্ডাই আলাদা।
দীপনাথ বুঝল, সম্পর্কে ভাই হলেও রঞ্জন বোধ হয় বোস সাহেবের ওপর তেমন সন্তুষ্ট নয়। সাবধানে জিজ্ঞেস করল, তোমার বাবা বেঁচে আছেন?
রঞ্জন একটু অবহেলার মুখভঙ্গি করে বলল, আছে না-থাকার মতোই। মাথার গোলমাল।
বোস সাহেব মামাকে দেখতে-টেখতে যান না?
নাঃ। ওসব ফেলাদা পছন্দ করে না। আত্মীয়তা তো সব বোগাস ব্যাপার ওদের কাছে।
তবু তো তোমাকে চাকরি দিয়েছেন।
দিয়েছেন।–রঞ্জনের গলার স্বরে কোনও কৃতজ্ঞতা ফুটল না, আমাকে না দিলেও আর কাউকে তো দিতেই হত।
নোস সাহেবের নিজের মা-বাবা নেই?
কেন থাকবে না? টালিগঞ্জে ওদের বিরাট জয়েন্ট ফ্যামিলি।
সেই ফ্যামিলির সঙ্গে বোস সাহেবের যোগাযোগ নেই?
একটু-আধটু কি নেই! তবে না থাকার মতোই। ফেলাদার মা-বাবা অর্থাৎ আমার পিসি আর পিসেমশাই খুব ভাল মানুষ। বলতে কী তাদের জন্যই আমার এই চাকরি। কিন্তু ফেলাদা দারুণ সেলফিশ।
মা-বাবাকে দেখেন না বুঝি?
এমনিতে দেখার দরকার নেই। ফেলাদার আর দুই ভাইও ভাল চাকরি করে, পিসেমশাই পেনশন পান। ওদের ভালই চলে যায়। কিন্তু টাকাটাই তো বড় কথা নয়। সোজা কথা ফেলাদার কোনও দরদ নেই। বউটাও হয়েছে তেমনি। আপনি তো ওদের ভালই চেনেন!–বলে একটু ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হাসল রঞ্জন।
আমি কর্মচারী। যেটুকু চিনি তা কর্মচারী হিসেবে। মানুষ কেমন তা তো বিচার করিনি।
কিন্তু আপনি তো ওদের সঙ্গে টুরেও যান শুনেছি।
তা অবশ্য যাই। কিন্তু দুরত্ব থাকে।
বউটাকে আপনার কেমন মনে হয়?
কেন, এমনিতে তো ভালই।
রঞ্জন একটু করুণার হাসি হাসল। চাপা গলায় বলল, কিছুই জানেন না। একটা আস্ত ভ্যাম্প। ফেলাদার বারোটা না বাজিয়ে ও মেয়ে ছাড়বে না।
মণিদীপা সম্পর্কে এসব কথা শুনতে খুব ভাল লাগছিল না দীপনাথের। সে উদাসভাবে বলল, তাই নাকি?
জিনস পরা মেয়ে পথেঘাটেই দেখতে ভাল, কিন্তু আমাদের মতো মিডল ক্লাস ফ্যামিলিতে ওসব মেয়ে চলে না। আমার ও রকম বউ হলে থাপ্পড় মেরে বাড়ি থেকে বের করে দিতাম।
দীপনাথ একটু চিন্তা করে বলে, তোমার কথাটা ফেলে দেওয়ার মতো নয়। তবে সব কিছুর জন্য তো কেবল মেয়েদেরই দোষ দেওয়া যায় না।
মেয়েদের দোষ দিচ্ছে কে? ফেলাদা যে তার বউকে কন্ট্রোল করতে পারে না তার জন্য ফেলাদাই দায়ী। অথচ ওদের লাভ-ম্যারেজও নয়।
জানি। শুনেছি মিসেস বোস গরিব ঘরের মেয়ে।
গরিব মানে একদম ভুখখা পার্টি। বাপ পলিটিকস করত। চাকরি-বাকরি করেনি কোনওদিন। পার্টি থেকে কিছু কিছু পেয়ে টেনেমেনে সংসার চালাত। ওদের বাড়ির সবাই পলিটিকসের পোকা।
মিসেস বোসের বাবা কি কোনও নেতা-টেতা?
না না। স্রেফ ক্যাডার।
ও–বলে দীপনাথ চুপ করে থাকে।
রঞ্জন তার মুঠোর মাউথপিস সরিয়ে নিয়ে চুল ঠিক করছিল। ঠোঁট সামান্য ফাঁক। দীপনাথ চকিতে দেখতে পেল, রঞ্জনের সামনের সামান্য উঁচু দুটো দাঁতের রং কালচে। বোধ হয় পোকা লেগেছে। একটা দাঁত বোধ হয় আধখানা ভাঙাও।
রঞ্জনকে কেন মাউথপিস সামনে রাখতে হয় তা বুঝতে পারল দীপনাথ। মানুষের যে কত কমপ্লেক্স থাকে!
রঞ্জন আবার মাউথপিস সামনে ধরে বলল, শুনেছি ফেলাদায় আর বউদিতে নাকি খুব খাড়াখাড়ি। ডিভোর্সও হয়ে যেতে পারে।
তাই নাকি?— বলে বিস্ময়ের ভান করে দীপনাথ।
শুনেছি। যদি ডিভোর্স হয় তো ফেলাদা জোর বেঁচে যাবে।
তোমার সঙ্গে মিসেস বোসের ভাল আলাপ আছে?
না। তবে দেখেছি। আমাদের পাত্তাই দিতে চায় না। তাকালে যেন মনে হয় পোকামাকড় দেখছে।
একটু ডাঁটিয়াল, না?
সেন্ট পারসেন্ট। অথচ ডাঁটের কী আছে বলুন? গায়ের রং তো টেলিফোনের মতো। বাপেরও কিছু মালকড়ি নেই। তবু এমন রং নেবে যে আপনার গায়ে বিচুটি লেগে যাবে। লোয়ার ক্লাস থেকে আপার ক্লাসে উঠে এখন চোখে ভেলভেট দেখছে।
