মণিদীপা হাসিটা মুছে ফেলে মৃদু স্বরে বলল, যখন ভাঙল মিলনমেলা ভাঙল…।
দীপনাথ একটু গম্ভীর ও দুঃখিত মুখ করে বলে, কিছুই ভাঙবে না। আপনিও বাংগালোরে চলুন।
কেন? আপনার হুকুম?
না, তা নয়। শুনেছি আপনাকে হুকুম করার আলাদা লোক আছে।
আছেই তো। যার চরিত্র আছে সেই হুকুম করতে পারে।
ঠিক কথা। কিন্তু তিনি এ ক্ষেত্রে কী হুকুম দিয়েছেন?
ভ্রুকুটি করে মণিদীপা বলে, আগে বলুন আমাকে হুকুম দেওয়াব লোকটা কে?
হয়তো স্নিগ্ধদেববাবু।
স্নিগ্ধদেব সম্পর্কে আপনার এত স্বচ্ছ ধারণা হল কী করে?
আমার ধারণা নেই। বোস সাহেব বলছিলেন।
বোস সাহেব! বলে হঠাৎ যেন কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকে মণিদীপা। তারপর চাপা হিংস্র স্বরে বলে, স্নিগ্ধদেবের নাম ওঁর জানার কথা নয়। আপনি বলেছেন কে?
একটু অবাক হয়ে দীপনাথ বলে, আমি বলব কেন? আমি তো তেমন কিছু জানিও না।
তবে ও জানল কী করে?
দীপ মাথা নেড়ে বলে, তা আমি জানি না।
ও আপনাকে কী বলছিল?
দীপ একটু বিপদে পড়ে যায়। ভরসা এই, এই মেয়েটিকে বোস ডিভোর্স করবে এবং সম্ভবত দীপের বস হিসেবেও বোস আর থাকছে না। দীপনাথ তাই সাহস করে একটু হাসি মুখে এনে বলে, বলছিলেন আপনি নাকি স্নিগ্ধবাবুর কথায় চলেন।
মণিদীপার চোখে-মুখে ক্রুদ্ধ অহংকার ফুটে ওঠে। ঠোঁট উলটে বলে, আমাকে কেউ কখনও হুকুম করে না। আমি কখনও কারও কথায় চলি না।
তবু আমি ওয়েল-উইশার হিসেবে বলছি, আপনি বাংগালোরে যান। ভাল হবে। মিলনমেলা ভাঙবে না।
ভাঙলে বয়ে গেল। আপনি যাচ্ছেন বুঝি?
ঠিক করিনি। তবে যেতেও পারি।
তাই বুঝি আমাকে অত সাধাসাধি?
কথাটা বুঝতে একটু সময় লাগল দীপের। কয়েক সেকেন্ড। তারপরই তার ফর্সা রঙে আগুন ধরে গেল যেন। অপলক স্থির চোখে চেয়ে বলল, তার মানে?
মিস্টার বোস আপনাকে বলেননি যে আপনি আমার প্রেমে পড়েছেন আর আমি আপনাকে নাচাচ্ছি?
দীপনাথ হতভম্ব হয়ে চেয়ে থাকে।
মণিদীপা হাসছিল। খুবই বিষাক্ত শ্লেষ ভরা হাসি। আস্তে করে বলল, আমাকে বলেছে।
কী বলেছে?
ওই যা বললাম।
আমি! আপনাকে?
হ্যাঁ, আপনি আমাকে এবং আমি আপনাকে। বলা উচিত ছিল। স্নিগ্ধদেবের কথা যখন উঠল তখন এটা উঠলেও দোষ ছিল না।
ছি ছি, আমি তো ভাবতেও পারি না।
বলেই দীপ অনুভব করল তার ভিতরকার ঠোঁটকাটা ইয়ারবাজ আর-একটা দীপনাথ খুব হোঃ হো করে হেসে বলল, পারোও বটে হে তুমি। ভাবতে ভাবতে ছাল তুলে ফেললে, আর মুখে বলছ ভাবতে পারো না!
আপনি ভাবতে না পারলে কী হবে? বোস সাহেব তো ভাবছেন।
খুব ভুল ভেবেছেন উনি।
ভুল ভাবায় উনি একজন বিশেষজ্ঞ। কিন্তু এ ব্যাপারটা হয়তো ততটা ভুল ভাবেননি।
এই বলে মণিদীপা হঠাৎ মুখে রঙিন ম্যাগাজিনটা চাপা দিয়ে আড়ালে হাসতে থাকে।
দীপ অবাক হয়ে বলে, কোন ব্যাপারটা?
এই আপনার আর আমার ব্যাপারটা।
তার মানে?
আপনি হয়তো সত্যিই আমার প্রেমে পড়েছেন।
কী যে বলেন!–দীননাথ বোধহয় রামধনুর মতো বহুরঙা হয়ে গেল লজ্জায়, ঘেন্নায়, আত্মধিক্কারে।
খুব অসম্ভব ব্যাপার কি?
খুবই অসম্ভব।
তা হলে আমার পক্ষে বেশ দুঃখের কথা। সারা জীবনে বহু লোক আমার প্রেমে পড়েছে। প্রায় সব পরিচিত যুবক এবং প্রৌঢ়। আপনারই না পড়ার কী?
কী যে বলেন!
দোষের তো কিছু নয়।
মিসেস বোসের মুখ ম্যাগাজিনে ঢাকা। তবু চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে মেয়েটি হাসছে।
দীপ দরজার নবের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, আমি কারও প্রেমে পড়িনি।
সত্যিই? বলে চোখ বড় করে মণিদীপা।
বিশ্বাস করা না করা আপনার ইচ্ছে।
তা হলে আর বাংগালোরে গিয়ে আমার কী হবে? আপনি যদি আমার প্রেমে পড়তেন তা হলে বাংগালোরে গিয়েও সুখ ছিল!
ইয়ারকি করছেন?
মণিদীপা খুব ধীরে ধীরে ম্যাগাজিনটা মুখ থেকে নামায়। মুখে এতটুকু হাসি নেই, মজা নেই। বড় বড় দু’খানা চোখ নেমে যায় কার্পেটের দিকে।
জবাবের জন্য অপেক্ষা করে না দীপ। দরজা খুলে বেরিয়ে যায়।
যদি কেউ ড্রয়িংরুমে থাকত তা হলে দেখত, জ্ঞানবয়সে মণিদীপা এই প্রথম সচেতনভাবে কাঁদছে।
২৪. পরদিন অফিসে এসেই দীপনাথ শুনল
পরদিন অফিসে এসেই দীপনাথ শুনল, আমেদাবাদ থেকে স্বয়ং বড় মালিক এসেছেন। বোস সাহেবের সঙ্গে রুদ্ধদুয়ার আলোচনা চলছে। অফিসে জোর কানাঘুষো, বড় মালিক বোস সাহেবকে ছাড়তে রাজি নন। তার জন্য বোস সাহেবকে আরও অনেক বেশি মাইনে দিতেও তিনি প্রস্তুত।
অফিস বলতে চল্লিশ বাই কুড়ি একটা হলঘর। গাদাগাদি স্টিলের টেবিল-চেয়ার, ফাইল ক্যাবিনেট লোহার আলমারি। শুধু বোস সাহেবের জন্য আলাদা একটা কাঠের ঘেরা দেওয়া চেম্বার।
দীপনাথ সম্পর্কে অফিসের সকলেরই প্রথম-প্রথম একটু সন্দেহের ভাব ছিল। সম্ভবত তাকে বোস সাহেবের স্পাই বলে মনে করত। এখন আর সে ভাবটা নেই। বরং দীপনাথ যে এখনও পাকা চাকরি পায়নি তার জন্য কারও কারও কিছু সহানুভূতি আছে।
আগে এ অফিসে বাঙালি প্রায় ছিলই না। ইদানীং বোস সাহেব কিছু বাঙালি ছেলেকে চাকরি দিয়েছেন। কম বেতনের কেরানি বা টাইপিস্ট নেওয়ার ক্ষমতা বোস সাহেবের হয়তো আছে।
দীপনাথ গিয়ে টাইপিস্ট রঞ্জন রায়ের মুখোমুখি চেয়ারে বসল। রঞ্জন একদম হালে ঢুকেছে। মাস দুই হবে বোধ হয়। চেহারাটা খুব রোগা, মুখে শুকনো খড়ি-ওঠা ভাব, চোখ গর্তে, গাল ভাঙা। তবে লম্বা চুল আর জঁদরেল জুলপি আছে। কিন্তু রঞ্জনের পোশাক-আশাক খুবই সাদামাটা। সাধারণ একটা লাল-সাদা চেককাটা হাওয়াই শার্ট আর পবনে বোধ হয় এসপ্লানেডের ফুটপাথ থেকে কেনা স্ট্রেচলনের সস্তা বেলবটম, পায়ে চটি। ছেলেটা সর্বদাই খুব গম্ভীর থাকে। কিন্তু কথা শুরু করলে আবার অনেক কথা কয়।
