রিসেপশনিস্ট বোসের ঘরে ফোন করল। তারপর দীপনাথকে বলল, আপনি মালপত্র নিয়ে এয়ারলাইনসের গাড়িতেই চলে যান।
দীপনাথ একটা শ্বাস ছাড়ল। তা হলে বোধহয় দাম্পত্য ঝগড়া মিটেছে। সে কিছুক্ষণ একা হতে পারবে।
বস্তুত হোটেলের রিসেপশনিস্ট থেকে এয়ারলাইনসের কর্মচারী পর্যন্ত সবাই দীপনাথের চেনা। কারণ বোসের টিকিট কাটা, হোটেল বুক করা, গাড়ি ভাড়া করা থেকে যাবতীয় অনভিপ্রেত কাজ তাকেই করতে হয়।
দীপনাথ এয়ারলাইনসের অফিসের দিকে আসতে আসতেই দেখল এয়ারলাইনসের গাড়ি ছেড়ে গেট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। দীপনাথ ‘দত্ত!’ বলে দু হাত তুলে চেঁচাতে চেঁচাতে দৌড়োতে লাগল। যেন তার সর্বস্ব চলে যাচ্ছে।
দত্ত বোধহয় গাড়ির আয়নায় দেখতে পেয়েছিল তাকে। চেনা লোক। জানালা দিয়ে মুখ বার করে পিছু ফিরে হাসল। তারপর গাড়িটা ধীরে ধীরে ব্যাক করিয়ে আনল।
দত্তর চোখে গগলস, মুখখানা দারুণ সুন্দর। দুর্দান্ত স্মার্ট ছেলে। বলল, আমি তো আপনাকে এতক্ষণ খুঁজছিলাম। উঠে পড়ুন।
দীপনাথ লাউঞ্জে ঢুকে প্রকাণ্ড ভারী সুটকেসগুলো প্রায় ঘেঁচড়ে নিয়ে এল নিজেই। এটুকু পরিশ্রমেই হাঁফাচ্ছিল। দত্ত বিরক্ত গলায় পোর্টারদের হাঁক দিয়ে বলল, ক্যা দেখ রহে হো? সাবকা মাল উঠা দো।
দীপনাথের কাছে একস্ট্রা খরচের পয়সা নেই। অন্য দিন থাকে। আজ নেই। স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হওয়ার পর থেকেই বোস গোমড়ামুখো হয়ে আছে, অনেক কিছু করণীয় কাজও করছে না। কাজেই পোর্টারদের মাল তোলার ব্যাপারে একটু ভয় খেল দীপ। টিপস দিতে হবে নিজের গাঁট থেকে।
গতকাল পিসির বাড়ি যাওয়ার সময় দশ টাকার মিষ্টি নিয়ে গিয়েছিল। দীপের কাছে আজকাল দশ টাকা মানে অনেক টাকা। সে যে ফুরনের কাজ করে তা তো কেউ জানে না। পিসতুতো ভাইরা বা পিসেমশাই জানে, সে একটা বড় ফার্মের ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের সেক্রেটারি। গালভরা কথা।
পোর্টারদের অবশ্য ঠেকাতে পারল না দীপ। তারা হাতাহাতি করে মালগুলো বাসের পিছনে তুলে দিল ফটাফট। চোখ বুজে তিনটে টাকা দিয়ে দিতে হল। এয়ারলাইনসের কুলিভাড়া সাংঘাতিক। এক পিস মালে এক টাকা।
বাসে কুল্লে দশ-পনেরোজন যাত্রী। তার মধ্যেও তিন-চারজন এয়ারলাইনসের লোক। বাস ছাডবার আগে কেতাদুরস্ত দত্ত হাসিমুখে এগিয়ে এসে বাসের টিকিট দেয়। চারটে টাকা। দীপনাথ চোখ বুজে টাকাটা দিল। এসব খরচের হিসেব দিয়ে বিল করলে টাকাটা সে পেয়ে যাবে ঠিকই। কিন্তু এসব ছোটখাটো হিসেব বিল করতে তার লজ্জা করে।
জানালার ধারে বসে বাইরে চেয়ে থাকে দীপ। সামান্য একটা কুয়াশার ভাপ উঠে কাঞ্চনজঙ্ঘা আবছা হয়েছে। প্রচণ্ড ঠান্ডা বাতাস চলন্ত বাসের জানালা দিয়ে এসে এফেঁড় ওফেঁড় করছিল তাকে! তবু জানালাটা বন্ধ করল না দীপ। এই জায়গার বাতাসটা তার প্রিয়। এই জায়গা প্রিয় প্রীতমেরও। প্রীতম কি শেষ হয়ে যাওয়ার আগে কোনওদিন ফিরে আসতে পারবে এখানে?
বহুকাল আগে হাকিমপাড়ার কাঁচা নর্দমার ধারে তার হাতে ঘুসি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল প্রীতম। বয়সে কয়েক বছরের ছোট ছিল প্রীতম। রোগা এবং দুর্বল। কী নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল তাদের তা আজ মনে নেই। শুধু মনে আছে মাটিতে পড়ে প্রীতমের প্রাণান্তকর চেঁচানি। অসহায় আক্রোশে প্রীতম কাঁদতে কাঁদতে তাকে বলছিল, তুই আমার বাঁ হাতটা খা, আমার বাঁ পাটা খা। প্রীতম খারাপ গালাগাল জানত না। কোনওদিন সে শালা’ কথাটাও বলেনি। তাদের পারিবারিক শিক্ষাই তার জিভকে শুদ্ধ রেখেছিল। কিন্তু সেদিন প্রীতমের সেই গালাগাল শুনে হেসে বাঁচেনি দীপ। ও কি একটা গালাগাল হল? বাঁ হাত খা! বাঁ পা খা!
আজ বহুকাল পরে সেই কথা মনে পড়ায় চোখে জল আসছিল দীপের। না কি ঠান্ডা বাতাস লেগে চোখ জলে ভরে আসছে! একজন দয়ালু যাত্রী পিছন থেকে হাত বাড়িয়ে জানালার কাচটা টেনে বন্ধ করে দিল। দীপ আর কাচটা খুলল না। দত্ত প্রায় এরোপ্লেনের মতোই জোর গতিতে গাড়িটা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এত বাতাস সইবে না।
এয়ারপোর্টে নামতেই আবার ব্যস্ততা। দার্জিলিঙে বরফ পড়ছে এবার। প্রচণ্ড শীতে মুহ্যমান উত্তরবঙ্গ। এয়ারপোর্টে ভিড় তাই তেমন নয়। সে মালপত্র ওজন করাল, কেবিন টিকিট নিল। প্লেনে মাত্র একটি সারিতেই রয়েছে দুটো সিট। সাধারণত বোস সস্ত্রীক সেই দুটো সিটেই জায়গা নেয়। কিন্তু মালপত্র ওজন করানোর সময় দীপের হঠাৎ মনে পড়েছে গ্যাংটকে দেড় হাজার টাকায় কেনা কার্পেটটা মালপত্রের সঙ্গে নেই। এয়ারলাইনসের অফিসে ফোন করে জানল যে, সেটা লাউঞ্জেও পড়ে নেই। মহার্ঘ কার্পেটটার গতি কী হল তা বুঝতে পারছিল না দীপ। ঝগড়ার মূলেও সেটাই। কার্পেটটা ভাজ করে সুটকেস বা বেডিং-এও ঢুকবে না। ঢুকলেও তা টের পেত দীপ। কারণ এই বেডিং বা সুটকেস তাকে বহুবার গোছাতে হয়েছে। তাই সে আন্দাজ করল কার্পেটটা ওরা সঙ্গে নিচ্ছে না। রাগ করে হয়তো ফেলে রেখেই যাচ্ছে। তার মানে, ওদের ঝগড়া মেটেনি। তাই যদি হয় তবে দুই আসনের সারিতে ওরা কিছুতেই পাশাপাশি বসবে না। দীপকে হয় বোস বা শ্ৰীমতী বোসের সঙ্গে বসতে হবে।
বোসরা এখনও আসেনি। লাউডস্পিকারে জানান দিচ্ছে, প্লেন আসতে দেরি হবে। কলকাতা থেকেই ছাড়বে পঁয়তাল্লিশ মিনিট দেরিতে। একটু বিরক্ত হয় দীপ। এই পঁয়তাল্লিশ মিনিট বেড়ে বেড়ে শেষ পর্যন্ত দু’ঘণ্টায় দাঁড়াতে পারে। এই অভিজ্ঞতা তার আছে। তার খুব ইচ্ছে আজ, কলকাতায় ফিরেই প্রীতমকে দেখতে যায়। অবশ্য বোস যদি সময়মতো তাকে অব্যাহতি দেয়।
