দীপ এক কাপ কফি খাবে বলে রেস্টুরেন্টে ঢুকল। বেশ কয়েকজন সাহেব-মেম বসে বিয়ার খাচ্ছে। সামনের দিকে কয়েকজন সাহেব-মেমের খুব জটলা আর উঁচু গলার কথা শোনা যাচ্ছিল। তাদের মাঝখানে একজন প্রৌঢ় নেপালি দাঁড়িয়ে। তার গায়ে বিদেশি জার্কিন, পরনে কর্ডের প্যান্ট, চোখে গগলস। প্রথমটায় চিনতে পারেনি দীপ। একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। কফি এলে গভীর তৃপ্তিতে চুমুক দিল সে। কিন্তু মনটা খচখচ করছে। আবার তাকাল এবং সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত স্মৃতি মথিত করে উঠে এল পরিচয়। তেনজিং নোরকে!
তেনজিং যখন এভারেস্টে উঠেছিল তখন দীপ বোধহয় স্কুলের বেশ নিচু ক্লাসে পড়ে। শিলিগুড়িতে সে বহুবার তেনজিংকে দেখেছে। দুটি কিশোরী মেয়েকে নিয়ে তেনজিংকে তখন চারদিকে সংবর্ধনা নিতে ছুটতে হচ্ছে। জন্মগত বিনয় ও অহংকারহীনতা তেনজিংকে ভারী জনপ্রিয় করেছিল। আজও তাকিয়ে সে তেনজিং-এর মুখে সেই সবল হাসি দেখতে পায়। এই লোকটা এক মস্ত পাহাড়ে উঠেছিল। দীপ কোনওদিন সেইসব দুরারোহ পাহাড়ে উঠবে না। তার গতি নীচের দিকে। নীচের দিকে।
সমস্ত কৈশোরকাল তার সমস্ত রং আর গন্ধ নিয়ে ঘিরে ধরে দীপকে। সে উঠে কোটের পকেট থেকে ছোট নোটবই আর ডটপেন বের করে এগিয়ে যায়। সাহেব-মেমরা রাস্তা দিল। সোজা গিয়ে তেনজিং-এর সামনে, খুব কাছাকাছি দাঁড়ায় দীপ। হাত বাড়াতেই তেনজিং শক্ত পাঞ্জায় চেপে ধরে তার হাত। এ লোকটা পাহাড়ে উঠেছিল। খুব উঁচু, একা মহৎ এক শুভ্র পাহাড়ে। বাঁ হাতের নোটবইটা বাড়িয়ে যখন দীপ বলল, অটোগ্রাফ প্লিজ’ তখনই বুঝতে পারল রুদ্ধ আবেগে তার গলা বসে গেছে।
তেনজিং খুব বিনয়ের সঙ্গে সই দিয়ে দেয়। কিছু বলার ছিল না দীপের। সে ফের এসে টেবিলে বসে। কফি ঠান্ডা হয়ে এসেছে। সে এক চুমুকে সেটা খায়। নোটবইটা খুলে একবার সইটা দেখে। এইভাবে সই নেওয়ার অভ্যাস তার কোনওকালে নেই। তেনজিং বিখ্যাত মানুষ বলেও নয়। কেবল সেই শৈশবের দারুণ সুন্দর স্মৃতি আর পাহাড়ে ওঠার এক অসম্ভব স্বপ্নই তাকে এই কাজে প্ররোচিত করেছে। পাহাড়ের মতো সুন্দর আর কী আছে পৃথিবীতে? কে আছে তার মতো সুখী যে পাহাড়ে ওঠে?
একদিন দীপ তার সব কাজকর্ম ফেলে রেখে একা বেরিয়ে পড়বে। হাঁটতে হাঁটতে চলে যাবে কোনও মস্ত দুরারোহ পাহাড়ের পাদদেশে। তারপর শুরু করবে তার ধীর ও কষ্টকর আরোহণ। কোনওদিনই শীর্ষে পৌঁছাবে না সে। অনাহারে, শীতে, পথশ্রমে একদিন ঢলে পড়বে পাহাড়েরই কোলে। বড় একা, নিঃসঙ্গ মৃত্যু ঘটবে তার। কিন্তু বড় সুখী হবে সে।
আচমকাই বোস কাচের দরজা ঠেলে হনহন করে তার টেবিলে চলে এল। একা। বসেই বলল, বিয়ার চলবে?
না।–দীপ স্বপ্নভঙ্গের পর কিছুটা নরম স্বরে বলে। তারপর ভদ্রতাবশে জিজ্ঞেস করে, মিসেস বোস কোথায়?
বোস তার বিয়ারের অর্ডার দিয়ে বলে, স্টলে বোধহয় কিছু কিনছে। শি ইজ অলওয়েজ বায়িং অ্যান্ড বায়িং হেল।
বোস ছ’ ফুটের ওপর লম্বা। কিন্তু চেহারাটা শক্তিমানের নয়। বরং খানিকটা ভুড়ি এবং যথেষ্ট চবিওলা দশাসই চেহারাটা দেখলে একটু মায়াই হয়। মনে হয় এত বড়সড় চেহারাটা টানছে কী করে লোকটা? বোসের বয়স দীপের মতোই ত্রিশ পেরোনো। অর্থাৎ যথেষ্ট যুবক। তবু আরাম আমোদ এবং উচ্ছঙ্খলতার দরুন তার চুলে পাক ধরেছে, চোখের দৃষ্টিতে একটা ঘোলাটে ভাব এসেছে। লোকটা প্রচণ্ড অহংকারী। হালকা পেপারব্যাক ছাড়া আর কিছু পড়ে না বলে ওর মানসিকতাও এক জায়গায় থেমে আছে।
চোঁ করে বিয়ারের গ্লাস শেষ করে বোস। তারপর বলে, প্লেন লেট শুনছি!
হ্যাঁ। পঁয়তাল্লিশ মিনিট বলছে। তবে বেশিও হতে পারে।
বোস অন্য দিকে চেয়ে থাকে ভ্রু কুঁচকে বলে, আপনি দমদমে নেমে ওকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যাবেন। আমি অফিস হয়ে যাব।
দীপ স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল। মিসেস বোসকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েও সে প্রীতমের কাছে যাওয়ার যথেষ্ট সময় পাবে।
রেস্টুরেন্ট থেকে লাউঞ্জে ঢুকবার আগে পকেট থেকে এম্বাকেশন কার্ডগুলো বের করে ভ্রু কুঁচকে খানিকক্ষণ দেখে দীপ। সমস্যা একটা থেকেই যাচ্ছে। দুটো সিট পাশাপাশি, একটা আলাদা। ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে বোস এবং তার বউ কিছুতেই পাশাপাশি বসবে না। সেক্ষেত্রে তাকে হয় বোস বা তার বউয়ের সঙ্গে বসতে হবে। একা চুপচাপ বসে কিছুক্ষণ আপনমনে থাকার কোনও আশাই নেই।
লাউঞ্জে খুব একটা ভিড় নেই। সব মিলিয়ে ষাট-সত্তরজন লোক হবে। বড়সড় বোয়িং ৭৩৭ বিমানটি আজ ফাঁকাই যাবে। তবু একা আলাদা বসার কোনও সুযোেগই পাবে না দীপ। ভেবে তার মনটা ভার লাগছিল। কিছুই নয়, মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময়, তবু ওই সময়টুকু নিজের জন্য চুরি করার যেন বড় প্রয়োজন ছিল। প্লেনটা যখন উঠবে তখন কয়েক পলক এক অসম্ভব অবিশ্বাস্য অ্যাঙ্গেল থেকে সে আর-একবার প্রাণমন ভরে দেখে নেবে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে। দেখবে বিপুল কালো শরীরে মহিষাসুর পাহাড়গুলিকে। তারপর চোখ বুজে পাহাড়ের কথা ভাববে বাকিটা সময়।
ওপাশের স্টলে কয়েকজন দাঁড়িয়ে। পিছন থেকেও নির্ভুলভাবে মিসেস বোসকে চিনতে পারে দীপ। ইদানীং ভদ্রমহিলা কিছু উগ্র হয়েছেন। পরনে ঢোলা প্যান্ট এবং গায়ে খুব আঁটসাঁট একটা লাল পুলওভার। গলায় জড়ানো কালো নকশাদার একটা স্কার্ফ। বব চুলের ওপর একটা মস্ত বেতের টুপি। কাছাকাছি এগিয়ে যেতেই একটা অসম্ভব সুন্দর সুগন্ধ পায় দীপ। গন্ধটা মোহাচ্ছন্ন করে ফেলার ক্ষমতা রাখে।
