হোটেলেব লাউঞ্জে বসে না থেকে দীপনাথ দুপুরের রোদে বাইরে দাঁড়িয়ে ক্ষণেক কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে নিচ্ছে। ছেলেবেলায় বহুবার দেখেছে সে। তার বড়ভাই শ্রীনাথ আর ছোট সোমনাথ যখন মা বাবার কাছে মানুষ হচ্ছে তখন বড়পিসি তাকে এনে রেখেছিল শিলিগুড়িতে। তখন সারাদিন কাঞ্চনজঙ্ঘা জেগে থাকত ঠিক এইভাবে। তার যৌবন নেই, জরা নেই। কিংবা হয়তো আছে। কিন্তু পাহাড়ের যৌবন বা জরা এতটাই দীর্ঘস্থায়ী যে মানুষের আয়ুতে বেড় পায় না। কিন্তু আজও সে বাল্যকালের সেই যৌবনোদ্ধত পাহাড়টিকে দেখে খুব আনন্দিত হয়। সবকিছুর চেয়ে আজও তার বেশি প্রিয় পাহাড়। উঁচু, একা, মহৎ।
দীপনাথ নিজে পাহাড়ের ঠিক বিপরীত মানুষ। কোনও উচ্চতা নেই, মহত্ত্ব নেই। কলকাতার এক কৌটো তৈরির ছোট্ট কারখানায় সে প্রায় বছর আষ্টেক ম্যানেজারি করেছে। বাঙালির সেই প্রতিষ্ঠানটি প্রথম থেকেই ধুকছিল। মালিক তেমন গা করত না। শ্রমিকরা ছিল ভয়ংকর তেড়িয়া। অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ছিল দীপনাথের চিরশত্রু এবং মালিকের স্পাই। দীপনাথের খবরদারির মধ্যেই কারখানায় নিয়মিত চুরি হত। এ সবই সহ্য করে মুখ বুজে পড়ে ছিল সে। এমনকী অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের উসকানিতে সে একবার যোবলা ঘণ্টা ঘেরাও হয়ে থাকে, আর একবার তিন-চারজন ওয়ার্কারের হাতে তাকে মারধর খেতে হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টেকা গেল না। কারখানার বুড়ো মালিক ডেকে বললেন, তোমার হাতে দিয়ে এতদিন তো দেখলাম, এবার ছেড়ে দাও, নতুন কারও হাতে দিয়ে দেখি যদি চালাতে পারে। দীপ জানে কারখানায় নতুন করে টাকা না ঢাললে, আপাদমস্তক ঢেলে না সাজালে কিছুতেই কিছু হওয়ার নয়।
বছরখানেক আগে চাকরি খুইয়ে সে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াল খানিক। তারপর জুটল বোসের সঙ্গে। মস্ত এক গুজরাটি ফার্মের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার বোস অতি ধূর্ত ও অভিজ্ঞ। দীপনাথ যে কাজের লোক নয় সেটা বোধহয় সে এক নজরেই বুঝে নিয়েছে। কিন্তু সেটা স্পষ্ট করে বলেনি আজও। তবে দীপনাথকে যে সে সঙ্গী এবং সাহায্যকারী হিসেবে খুবই পছন্দ করে তাতে সন্দেহ নেই। কোম্পানি থেকে দীপনাথ ভাউচারে মাসিক ছয় থেকে সাতশো টাকা পায়। তাকে খাতায় সই করতে হয় না, অফিসে বসতে হয় না, ডিউটি আওয়ার্স বা ছুটির দিন বলেও কিছু নেই। অর্থাৎ তাকে কোম্পানির চাকরিতে বহাল করা হয়নি। কেবল ফুরনের লোক হিসেবে পোষা হচ্ছে। বোসকে বিস্তর টুর করতে হয়, সঙ্গে থাকে দীপনাথ। এসব খরচ অবশ্য কোম্পানিই দেয়। বোস কারও সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় দীপনাথের যে পদের উল্লেখ করে সেটাও গোলমেলে। বোস তাকে নিজের সেক্রেটারি বলে চালায়। ধৈর্যশীল এবং উপায়ান্তরহীন দীপনাথ তবু বোসের সঙ্গে লেগে আছে। সবদিন তো সমান যায় না। কৌটোর কারখানার ম্যানেজার হিসেবেও সে ছয়-সাতশো টাকার বেশি পেত না। কোনওদিন চুরি করেনি এক পয়সাও। করলে মাসিক আয় বেড়ে হাজার দুয়েকে দাঁড়াতে পারত। চুরি দীপনাথ এখনও করে না। আর সেটা জানে বলেই বোধহয় বোস তাকে এখনও খাতির করে। আপনি-আজ্ঞে করে কথা বলে।
কাল গ্যাংটক থেকে ফিরে দীপনাথ বোস এবং তার বউকে হোটেলে পৌঁছে দিয়ে নিজে ফিরে গিয়েছিল হাকিমপাড়ায়, পিসির বাসায়। বছরখানেক আগে পিসি মারা গেছে। অতিবৃদ্ধ পিসেমশাই আর পিসতুতো ভাইরা আছে। দীপনাথ গেলে বাড়ির সবাই আন্তরিক খুশি হয় এখনও। কাল অনেক রাত পর্যন্ত ভাইদের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছে। সব ব্যর্থতার গ্লানি ফুকারে উড়ে গিয়েছিল গানে, গল্পে, ঠাট্টায় আর পুরনো দিনের কথায়। ছেলেবেলার কয়েকজন বন্ধুও এসে জুটেছিল। এসেছিল প্রীতমের মেজো ভাই শতম। কয়েকটা ঘণ্টা বড় আনন্দে কেটেছে। আজ দুপুর থেকে আবার সে বোসের রহস্যময় সেক্রেটারি। অর্থাৎ ফাইফরমাশ খাটার লোক, ফুরনের ভবিষ্যৎহীন খাটনদার।
শতম তার জিপগাড়িতে সিনক্লেয়ার হোটেলে পৌঁছে দিয়ে গেল দীপনাথকে। চলে যাওয়ার আগে হঠাৎ বলল, মেজদা, আমার দাদার জন্য কিন্তু বউদিই দায়ী। দাদা বোধহয় বাঁচবে না, এই শেষ সময়টায় যদি আমাদের কাছে তাকে আসতে দিত বউদি, তবে দাদা বোধহয় একটু আনন্দে মরতে পারত। তুমি বউদিকে একটু বুঝিয়ে বোলো।
পিসতুতো ভাইরা দীপনাথকে মেজদা বলে ডাকত। সেই থেকে সে প্রায় সকলেরই মেজদা। এই ডাকের ভিতরে পুরনো দিনের গন্ধ আছে, জড়িয়ে আছে আত্মীয়তা। মেজদা ডাকের মধ্যে আজও গভীর ভালবাসা খুঁজে পায় দীপনাথ।
মনটা খারাপ হয়ে আছে সেই থেকে। বিলুর সঙ্গে প্রীতমের বিয়ের সম্বন্ধ এনেছিল পিসিমাই। কিন্তু প্রীতমের মতো সাদা সরল ভাল মানুষের সঙ্গে বিলুর মতো বারমুখো মেয়ের যে মিল হয় না সেটা প্রথম থেকেই বুঝেছিল দীপ। কিছু বলেনি তুব। গরমিল কতটা হয়েছিল তা হিসেব করার অবশ্য অবসর হল না। তার আগেই, জীবনের শুরুতেই আস্তে আস্তে নিভে যাচ্ছে প্রীতম। এখনও একবার শিলিগুড়িতে আসার জন্য সে ছটফট করে। কিন্তু বিলু আসতে দেয় না। শেষ চেষ্টা হিসেবে প্রীতমের এখন আকুপাংচার চলছে। একটু উন্নতি হয়তো দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সেটুকুর ওপর ভরসা রাখতে ভয় পায় সবাই।
দীপ আর-একবার লাউঞ্জে ঢুকে খোঁজ নিল বোস সাহেবদের কতদূর। যদি এয়ারলাইনসের গাড়ি ছেড়ে যায় তবে তাকে বোসের সঙ্গে আমরাসাডারেই যেতে হবে। কিন্তু এখন কিছুটা সময় সে বোসের সঙ্গ এড়িয়ে চলতে চায়। সঙ্গে গেলেই হাজারও কথার জবাব দিতে হবে। একা থাকলে মুখ বুজে কিছুক্ষণ চিন্তা করার অবকাশ পাবে সে।
