দীপনাথ প্যাসেজে ঢুকে একটু অপেক্ষা করে। ডান ধারে দুটি শোয়ার ঘর, বাঁ দিকে একটা মস্ত লিভিং রুম, সামনে ডাইনিং কাম ড্রয়িং। এতটা অতিক্রম করে তবে সিঁড়ি। কিন্তু এই পথটুকুতে মণিদীপার সঙ্গে দেখা হবে কি? যদি বেডরুমে ঢুকে গিয়ে থাকে?
দীপনাথের ভিতরটা আজ বড় কাঙাল। খুব প্রত্যাশা নিয়ে সে একটু গলাখাঁকারি দিল। তারপর ধীর পদক্ষেপে এগোতে লাগল। চোখের নজর ডাইনে বাঁয়ে খবর নিচ্ছে। প্রায় বয়ঃসন্ধির অবস্থা। বুক কাপছে, গলা শুকোচ্ছে, কান গরম হচ্ছে। অথচ পিকনিক থেকে ফেরার সময়ে এই ভদ্রমহিলা তার খোঁজও নেয়নি।
ডাইনিং হল পর্যন্ত কোনও ঘটনাই ঘটল না। একটু হতাশ হল দীপনাথ। আজকের দিনটা বোধহয় তার ভাল গেল না।
ড্রয়িংরুমে মণিদীপাকে বসে থাকতে দেখবে বলে মোটেই আশা করেনি দীপ। বাইরে থেকে ফিরে কোনও মহিলাই নিজের ড্রয়িংরুমে বসে ম্যাগাজিন দেখে না।
কিন্তু মণিদীপা ঠিক তাই করছে। যেন এ বাসা তার নয়, সে বেড়াতে এসেছে মাত্র। বাইরের ঘরে বসে অপেক্ষা করছে।
মণিদীপাকে এক পোশাকে দু’দিন কখনও দেখেনি দীপ। আজও তার পরনে দীপনাথের–দেখা একখানা নীল শাড়ি। যাদের রং চাপা তাদের নীল রং পরতে নেই। এমন একটা কথা কারও মুখে কখনও শুনে থাকবে দীপ। তাতে নাকি কালোকে আরও কালো দেখায়। কিন্তু মণিদীপা সেই নীল রংকে হজম করে আরও সুন্দর হয়ে বসে আছে। মস্ত চওড়া সোফায় গা ছেড়ে বসার ভঙ্গিটির মধ্যে একটু অহংকার মেশানো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ভাব আছে। তবে হ্যাঁ, ভঙ্গি, মুখের ভাব সব কিছুর মধ্যে একটা অপেক্ষার ভাব আছে ঠিকই।
কিন্তু কার জন্য অপেক্ষা? বুকের মধ্যে একটা আশার পাখি হঠাৎ গুড়গুড় করে ওঠে যে!
আত্মবিস্মৃত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল দীপনাথ। বোকার মতোই। প্রথম কয়েক সেকেন্ড মণিদীপা লক্ষই করল না। তারপর হঠাৎ বড় বড় চোখ তুলে নীরবে তাকাল। চোখে সেই পুরনো অহংকার।
চোখে চোখ। কয়েকটি দ্বিধাগ্রস্ত মুহূর্ত।
আচমকাই মণিদীপা জিজ্ঞেস করে, কী চলছিল? বিয়ার?
ওই একটু।
হাতের ম্যাগাজিনটা আবার দেখতে দেখতে মণিদীপা বলল, আগে তো এসব খেতেন না!
এখন মাঝে মাঝে খাই। বারণ করবার তো কেউ নেই।
মণিদীপার চোখ আবার উঠল। এবার চোখ দুটো বেশ কঠিন।
বারণ করারও লোক চাই নাকি?
লোক কেউ থাকলে ভাল লাগত।
আজকাল বেশ সাহসের সঙ্গে কথা বলতে পারেন তো!
মরিয়ার সাহসের অভাব হয় না।
মণিদীপা চমৎকার একটু হাসল, স্লেভারির চেয়ে এরকম সাহস অনেক ভাল।
তা হলে আমার উন্নতি হচ্ছে বলছেন?
বোধহয়। আর-একটু না দেখলে বোঝা যাবে না।
তা হলে দেখুন।–বলে একটু বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় দীপ। হেসে বলে, অনেককাল দেখেন না।
তাই নাকি? খুব শ্লেষের সঙ্গে বলে মণিদীপা।
কিন্তু দীপনাথ আর সেই পুরোনোে সংকোচটা বোধ করে না। বোস বাংগালোরে চলে যাচ্ছে এবং তাকে মিনতি করছে সঙ্গে যাওয়ার জন্য। তাতে বোস সাহেবের ওপরওয়ালাসুলভ চরিত্রটা ভেঙে গেছে। মণিদীপা ছিল বসের বউ, কিন্তু সেও এখন সম্ভাব্য ডিভোর্সের গাড়ায়। তবে দীপনাথের আর কাকে সংকোচ?
দীপনাথ তাই খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, আমি একটা গাছের তলায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম সেদিন। আমার বিশ্বস্ত বন্ধুরা আমাকে না নিয়েই চলে এসেছিল। অথচ সেইসব বন্ধুদের পায়ে কাঁটা ফুটলেও আমাকেই দায়ী হতে হত।
মণিদীপা হঠাৎ নিভে গিয়ে দাঁতে ঠোঁট কামড়ায়।
ম্যাগাজিনটা ফেলে রেখে নিজের খাটো চুল খোঁপায় বাঁধার একটা অক্ষম চেষ্টা করতে করতে বলে, আমার দোষ ছিল কি না ঠিক জানেন?
আপনার কথা বলছি না।
তবে কার কথা?
আমার ছদ্ম-বন্ধুদের কথা। আর দোষের কথাই বা উঠছে কেন? আমি সামান্য মানুষ, নজরে পড়ার মতোই তো নয়।
আমি খুঁজছিলাম। কিন্তু সেদিন ওঁকে নিয়ে এত বেসামাল হয়ে যাই যে কিছু করার উপায় ছিল না। দে ওয়্যার মেকিং এ সিন। আমি মিসেস সিনহাকে বলেছিলাম আপনাকে যেন ওঁদের গাড়িতে তুলে নিয়ে আসেন। পরে মিসেস সিনহা আমাকে বললেন তাড়াতাড়িতে আপনাকে নাকি খুঁজে পায়নি।
তা হবে।–উদাসভাবে বলে দীপ। তারপর দরজার দিকে এগোয়।
শুনুন।
বলুন। তেমনি উদাস স্বর দীপনাথের।
নিশ্চয়ই আপনি ও ব্যাপারটার জন্য আমার ওপর চটে যাননি!
আপনার ওপর চটার প্রশ্নই ওঠে না।
ছদ্ম-বন্ধু বলতে আপনি আমাকেই মিন করছেন।
না। আপনাকে কেন মিন করব?
হলে আপনার কোন বন্ধুই বা ওখানে ছিল?
বোধহয় সবাই আমার পরম বন্ধুই ছিল ওখানে।
একটু ঝাঁঝালো স্বরে এবার মণিদীপা বলে, এত ন্যাগ করতেও পারেন আপনি। আচ্ছা বাবা, ক্ষমা চাইছি। কান ধরছি।
হাসিমুখে দীপ ফিরে দাঁড়ায়। তার রাগ বেশিক্ষণ থাকে না। একটু মিষ্টি কথাতেই উবে যায়।
সে বলল, অতটার দরকার নেই।
এবার আর রাগ নেই তো?
মোটই নেই।
আবার আমি ভাল বন্ধু তো?
নিশ্চয়ই।
বসুন না একটু।
দীপ বসল। কোনও সংকোচ হল না। বোস সাহেব দেখে ফেললেও বোধহয় ক্ষতি নেই, এই মহিলাকে তো সে ডিভোর্সই করবে।
বলুন।
মণিদীপার মুখ-চোখ কাছ থেকে দেখে একটু শীর্ণ মনে হল। কাঁধের হাড় দুটোও একটু বেশি জেগে রয়েছে। বলল, বোস সাহেবের সঙ্গে কী কথা হল?
বাংগালোরে যাওয়া নিয়ে।
আমি কিন্তু যাচ্ছি না, শুনেছেন?
বলছিলেন।
আর কিছু বলেনি?
আর কী?
এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে মণিদীপা খুব সুন্দর করে একটু হাসল। ন্যাকামি নেই, অঙ্গভঙ্গি নেই, তেমন কোনও কটাক্ষ নেই, তবু নিছক নিজের চরিত্রের একটা সহজ সরল জোরে মণিদীপা কী করে তাকে সম্মোহিত রেখেছে তা দীপনাথ ঠিক বুঝতে পারে না।
