বোস সাহেবের অবস্থাও খুব ভাল কিছু নয়। বেতের সোফার পিছনে আরও তিনটি খালি বোতল জমা পড়েছে, টেবিলের ওপর বাকি দুটোর মধ্যে একটার মুখ এখনও ভোলাই হয়নি। বাড়ির বেয়ারা এইমাত্র একপ্লেট গরম পকোড়া রেখে গেল টেবিলে। বোস সাহেব একটা পকোড়া তুলে কামড় দিয়ে বলল, হয়। মে বি আই অ্যাম সামটাইমস ভেরি রুড। আপনিও হয়তো অফিস-ওয়ার্কে তেমন এফিসিয়েন্ট নন। কিন্তু তার মানে এ নয় যে আমি আপনার ক্যারেকটারের প্লাস পয়েন্টগুলো লক্ষ করিনি। আই র্যাদার লাইক ইউ। অন দি আদার হ্যান্ড আমারও কিছু প্লাস পয়েন্ট আছে মিস্টার চ্যাটার্জি। সেগুলো কি আপনি লক্ষ করেছেন?
দীপনাথ আর একটু হলেই বোসের সামনেই লজ্জায় জিভ কেটে ফেলত বা বলে উঠত, আই অ্যাপোলাজাইস। কিন্তু বিয়ারের ধোয়ার ভিতর দিয়েও মগজের যুক্তি বুদ্ধি পথ হারিয়ে ফেলেনি। এ কথা সত্যি যে, সে বোসের প্লাস পয়েন্টগুলো লক্ষ করেনি। কিন্তু সে কথা স্বীকার করে কোন আহাম্মক?
সে বলল, আপনার প্লাস পয়েন্ট তো অনেক।
বোস বোকা লোক নয়। বোকা হলে এত অল্প বয়সে এত ওপরে উঠতে পারত না। কথাটা শুনে একটু হাসল। আবার পকোড়া আর বিয়ার খেয়ে বলল, আই হ্যাভ মাই ভাইসেস অলসো। কিন্তু একটা জিনিস কি জানেন? আপনি যদি কেবল আমার দোষগুলো লক্ষ করেন তা হলে কোনওদিনই আমাকে ভালবাসতে পারবেন না। মিসেস বোসের প্রবলেমটা এখানেই।
বলেই হঠাৎ বোস পিছনে হেলে ছাদের দিকে চেয়ে বড় একটা শ্বাস ফেলে বলল, দূর ছাই। এসব কথা আপনাকে বলছিই বা কেন?
আপনাদের ভিতরকার প্রবলেমটা কী তা আমি আজও জানি না। তবে মিসেস বোস ইজ এ উয়োম্যান অফ পার্সোনালিটি।
বলছেন! ঠিক আছে, মানছি। কিন্তু শি ইজ ক্রিয়েটিং এ ডেঞ্জারাস মানিটারি প্রবলেম ফর মি।
কী রকম?
কোম্পানি এক্সিকিউটিভদের অবস্থা যতটা ভাল বলে লোকে মনে করে আসলে তো ততটা ভাল নয়। আপনিও জানেন, আই হ্যাভ বিগ এক্সপেন্ডিচারস। মিসেস বোস হ্যাজ ইভন গ্রেটার এক্সপেন্ডিচারস। উনি খুব বড়লোকের মেয়ে নন, তবু খরচের হ্যাবিটা এত সাংঘাতিক—ইউ নো।
আপনার কি টাকার প্রবলেম চলছে বোস সাহেব?
ভেরি অ্যাকিউটলি। কোম্পানিতে আমার দেদার লোনও হয়ে গেছে। হাজার ত্রিশেকের কাছাকাছি।
বলেন কী?
বোস আর একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, সেটাও একটা মস্ত প্রবলেম। নতুন কোম্পানিতে যাওয়ার আগে এই কোম্পানির টাকা শোধ করতে হবে। নইলে দেয়ার মে বি আগলি কনসিকোয়েন্সেস।
বুঝতে পারছি।
বোস হাসল, বুঝতে তো পারছেন, কিন্তু এই টাকাটা আমি কোথায় পাব তা বলতে পারেন কি?
দীপনাথের মনে পড়ল, মণিদীপা তাকে কয়েকবারই বলেছে ‘আমি ওকে শেষ করে ছাড়ব।’ বোস সাহেবকে সেসব কথা কোনওদিনই বলা যাবে না। বলতে গেলে এই প্রথম তার বোস সাহেবের ওপর খানিকটা মায়া হচ্ছিল। এতকাল এই লোকটার তাবেদারি সে করেছে বটে, কিন্তু কোনওদিনই বিন্দুমাত্র সহানুভূতি বোধ করেনি। বরং মণিদীপা বোসকে শেষ করছে ভেবে সে মনে মনে এক রকমের আনন্দও পেত। আজ কষ্ট হল। বোস কোনওদিন এত খোলামেলা কথাবার্তা বলেনি তার সঙ্গে।
দীপনাথ মাথা নেড়ে বিষণ্ণ মুখে বলল, না। ত্রিশ হাজার আমার কাছে অনেক টাকা।
আমার কাছেও।–বলে বোস আবার একটা শ্বাস ছাড়ে। আস্তে করে স্বগতোক্তির মতো বলে, ক্লাবে আনপেইড বিল কত জমে গেছে কে জানে। হায়ার পারচেজ-এর দোকানেও অনেক পেমেন্ট রয়ে গেছে। বাংগালোরে যাওয়ার আগে সবই মেটাতে হবে। যাকগে, যা বলছিলাম। আপনি কি
আমার সঙ্গে যাবেন মিস্টার চ্যাটার্জি? আই নিড ইউ।
একটু ভেবে দেখি।
খুব বেশি ভাববেন না। তা হলে আর যাওয়া হবে না।
দ্বিধার সঙ্গে দীপনাথ বলে, বাংগালোরে বোধ হয় খরচ বেশি।
একটু বেশি হতে পারে। তবে সেখানে আমি তো বিশাল বাংলো পাব। মিসেস বোস যদি না যান তা হলে ইউ মে শেয়ার দি হাউস। আপনার মাসে কত হলে চলে যায়?
দীপনাথ মিথ্যে করে বাড়িয়ে বলতে পারত। কিন্তু মিথ্যে কথাটা চট করে তার মুখে আসে না। তাই বলল, ছ-সাত শো।
বোস মৃদু স্বরে বলল, আপনাকে আমার হিংসে হয়। এত কমে চালান কী করে?
দীপনাথ করুণ করে হাসল। কী করে সে চালায় তা তত বোসকে তারই জিজ্ঞেস করার কথা।
অন্ধকার বারান্দায় দু’জনের কথাবার্তা হঠাৎ থেমে গেল। নীচে গেটের সামনে একটা গাড়ি এসে থেমেছে। বোস সাহেবের নিজস্ব ছোট গাড়িটা। দারোয়ান গেট খুলে দিল। গাড়িটা বাঁক নিয়ে ঢুকে এল ভিতরে। মিসেস বোস।
দীপনাথের বুকের ভিতর হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন কিছু বাড়ল। একটু দমের কষ্ট হতে থাকল। বেশ কিছুদিন হল সে মণিদীপার সঙ্গে অভিমানে কথা বলেনি। আর বোধহয় সেই কারণেই বুকের মধ্যে অনেক বেশি আবেগ জমে উঠেছে।
দু’জনেই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল।
প্রথম স্তব্ধতা ভেঙে বোস সাহেব বলল, প্রস্তাবটা নিয়ে একটু তাড়াতাড়ি ভাববেন। বেশি সময় নেই।
বোস সাহেবকে এত দুর্বল কোনওদিন দেখেনি দীপনাথ। আজ বিয়ারের ধাঁধার সঙ্গে এই হৃদয়দৌর্বল্য মিশে কেমন ভোম্বল-ডোম্বল লাগছিল নিজেকে। সে কিছুক্ষণ কান খাড়া করে বসে রইল। মণিদীপা যে ঘরে এলেন তা বোঝা গেল ক্ষীণ কণ্ঠস্বরে। ডাইনিং হলেই বোধহয় বেয়ারার সঙ্গে কিছু কথা বললেন।
দীপনাথ উঠে বলল, আমি তা হলে আসি।
বোস আনমনে সামনের দিকে শূন্য চোখে চেয়ে বসে ছিল। ঠ্যাংদুটো ছড়ানো। কিছু দেখছে না। শুনছে না।
দীপনাথ আর-একবার বিদায় জানাতে বোস মুখটা ফিরিয়ে যেন অন্য কোনও মানুষকে বলল, গুড নাইট।
