স্ট্যাটাস!
বলে বোস হাঁ করে একটু চেয়ে থাকে। বারান্দায় কোনও আলো নেই। ঘর থেকে আর রাস্তা থেকে যেটুকু আলো আসছে তাতে অন্ধকার কাটেনি। তাই বোসের চাউনিটা ভাল করে বুঝতে পারল না দীপ। বোস একটা হুঁ বলে সোজা হয়ে বসল। তারপর বলল, কোম্পানি যে এখনই নতুন লোক নেবে এমন কোনও অ্যাসুরেনস নেই। আমিও কথা দিতে পারছি না। তবে ওখানেও আপনি এর চেয়ে খারাপ থাকবেন না।
আপনি কি আমার জন্য চেষ্টা করবেন?
করব। তবে প্রথম দিকে নয়। পরে। এ কোম্পানি সদ্য স্টার্ট করছে। দে নিড এ লট অফ এক্সপিরিয়েন্সড পিপল। কাজেই আপনারও চান্স আছে। কিন্তু প্রথম লটে নয়। আপনি তো ততটা এক্সপিরিয়েন্সড নন।
দ্বিতীয়বার ঘেন্না-পিত্তি সত্ত্বেও সসেজটি খারাপ লাগেনি দীপের। কিন্তু বোস যেহেতু আর সসেজ খেল না সেইজন্য তারও আর-একটা খেতে সংকোচ হচ্ছিল। পেটে যথেষ্ট খিদে। সে বিয়ারে নিরাসক্ত একটা চুমুক দিয়ে বলে, বাংগালোরেই যেতে হবে?
অফ কোর্স।
দীপ আনমনা হয়ে গেল কয়েক পলকের জন্য। বাংগালোরে। তার মানে হিমালয়ের সেই সব মহান পাহাড় থেকে আরও বহু দূরে। বাংগালোরে গেলে যখন-তখন প্রীতমটার কাছে গিয়ে হাজির হওয়া যাবে না। বাংগালোর দীপনাথের অচেনা নয়। বার তিনেক গেছে বোসের সঙ্গেই। বড় ভাল পরিচ্ছন্ন শহর। তবু তো দূর।
কী ভাবছেন?
ভাবছি, অনেকটা দূর।
বোস হঠাৎ হেসে ফেলে। খিলখিল মেয়েলি হাসি। বলে, দূর? কোথা থেকে দূর?
কলকাতা থেকে।
আমি যদি উলটো করে বলি বাংগালোর থেকেই কলকাতা দুর।
তার মানে?
বোস কথাটার সোজা জবাব না দিয়ে বলে, দুরের কনসেপশনটা বাঙালিদের খুব অদ্ভুত। আমার তো কোনও জায়গাকেই পরের জায়গা মনে হয় না, তাই দূরের জায়গা বলেও ভাবি না।
দীপনাথ একটু গোঁজ হয়ে থেকে অনিচ্ছার সঙ্গে বলে, সে অবশ্য ঠিক।
আপনাকে কলকাতার ভূতে পেল নাকি? কিন্তু শুনেছি আপনি নর্থ-বেঙ্গলের ছেলে।
দীপ একটু বিষণ্ণ গলায় বলল, কলকাতায় আমার এক ভগ্নিপতি থাকে। সে ভীষণ অসুস্থ। আমি ছাড়া ওদের মর্যাল গার্জিয়ান কেউ নেই।
বোস বোতল থেকে বিয়ার ঢালছিল গেলাসে। কথাটা শুনল কি না বোঝা গেল না, তবে পাত্তাও দিল না তেমন। বলল, ওটা কোনও কথা নয়। ইয়োর ডিসিশন মাস্ট বি ভেরি প্রম্পট।
বোস যখন বিয়ার ঢালছিল তখন প্রায় চুরি করার মতো করে আর-একটা সসেজ তুলে নিল দীপ। ভিতরটা হতাশায় ভরা। বোস চলে গেলে তার খুঁটি সরে যাবে। হতাশায় ফাঁকা পেরা অভ্যন্তরে সসেজটাকে পাঠিয়ে দীপনাথ কিছুক্ষণ বিয়ারের ঝিল্লিধ্বনি শুনল নিজের মাথায়। আজ মণিদীপা বাড়িতে নেই। কোথায় গেছে, আসবে। সেই পিকনিকের পর থেকেই মণিদীপার সঙ্গে কথা প্রায় বলেইনি সে। বড় অভিমান হয়েছিল। আর সবাই তাকে ফেলে চলে এলেও ক্ষতি ছিল না, কিন্তু মণিদীপা এল কী করে! সে তো মাতালও হয়নি সেদিন? সেই দিন দুপুরেই না মেজদার বাড়িতে গিয়ে খুব আঠা দেখিয়ে এসেছিল?
কী ভাবলেন?
কিছু না।
ভাবনাটা স্টার্ট করুন। কাল বা পরশুই একটা ফাইনাল কথা আমাকে জানিয়ে দেবেন।
আচমকা দীপ ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করে, ড়ু ইউ লাভ মি মিস্টার বোস?
বোস প্রশ্নটার জন্য প্রস্তুত ছিল না। তবে সময় নিয়ে এক রাউন্ড সসেজ বিয়ারের সঙ্গে ভিতরে পাঠিয়ে বলল, অ্যাজ এ ফ্রেন্ড ইউ আর টপ গ্রেড। অ্যান্ড আই রিয়েলি নিড এ ফ্রেন্ড।
এ কথার জবাব হয় না। কথাটা হয়তো আবেগ থেকেই বলা, যদিও বোসের আবেগ সহজে প্রকাশ পায় না।
একটু বাদে আর কিছু বিয়ার খাওয়ার পর বোস খুব গা ছেড়ে বসে ধীরে ধীরে বলে, আমার যে সত্যিকারের কেউ নেই তা বোধহয় আপনি এতদিনে টের পেয়েছেন।
দীপনাথ একটু মুশকিলে পড়ে গিয়ে আমতা-আমতা করে বলে, বৃহৎ মানুষরা সব সময়ই একা।
কথাটা দীপনাথ কোথায় যেন শুনেছিল। আজ আলটপকা কাজে লেগে গেল। বোস খুশিই হল বোধহয়। আহাম্মকটা হয়তো সত্যিই নিজেকে বৃহৎ মানুষ ভাবে। বিয়ার সহযোগে তাই হয়তো কিছুক্ষণ মনে মনে কথাটাকে উপভোগ করল। তারপর বলল, মিসেস বোস অবশ্য বাংগালোরে যেতে রাজি নন।
কেন?
কে জানে? শি হ্যাজ হার ওন ওয়ে। উনি ভয়ংকর স্টাববার্ন।
তা হলে?
তা হলে কিছুই না। আমি যাচ্ছিই।
মিসেস বোসের কী হবে?
শি মে সিক এ ডিভোর্স।
কথাটা এমন অনায়াসে বলে ফেলল বোস যে, খুব অবাক লাগল দীপনাথের। ডিভোর্সের ব্যাপারটা এখনও কোনও বাঙালির কাছে এতটা জলভাত হয়ে যায়নি। সে তাই বলল, না না, তাই কি হয়?
বোস কথাটায় কান না দিয়ে বলল, ওঁর একজন অ্যাডভাইজার আছে। স্নিগ্ধদেব চ্যাটার্জি। এ লেফটিস্ট হুলিগান। উনি তার পরামর্শ ছাড়া কিছু করবেন না। দ্যাট বাগার কন্ট্রোলস হার।
জুয়াড়ির মতো আবেগহীন মুখভাব বজায় রাখার চেষ্টা করতে করতে দীপনাথ বলল, তাই নাকি?
বোস মাছি তাড়ানোর মতো করে হাত নেড়ে বলল, ও প্রসঙ্গ থাক। মিসেস বোসকে নিয়ে বেশি ভাববার কিছু নেই। আই অ্যাম র্যাদার ইন নিড অফ এ ফ্রেন্ড। অ্যান্ড আই হ্যাভ নান। আপনি কি আমার বন্ধু হতে পারেন?
বহুকাল চাকরবাকরের মতো থেকে এখন একটা মরিয়াভাব এসে গেছে দীপনাথের। সে আর ততটা মুখচোরা থাকতে চাইল না। হঠাৎ বলে বসল, বৃহতের সঙ্গে কি ক্ষুদ্রের বন্ধুত্ব হয় বোস সাহেব?
বলেই বুঝল এ প্রায় শরৎচন্দ্রীয় ডায়ালগ হয়ে গেল। আসলে সে মোটে আধ গেলাস বিয়ার খেয়েছে। কিন্তু অভ্যাস না থাকায় সেইটুকুই পেটে গিয়ে জিভটাকে একেবারে লাগামছাড়া করে দিয়েছে বোধ হয়।
