ওই যে রাস্তায়।–বলে শ্রীনাথ আঙুল তুলে দেখায় পিছনবাগে। কিন্তু রাস্তায় ছেলে দুটোকে দেখা গেল না।
গণি বলল, কেন ঝুটমুট ঝামেলা করছেন? মাল খেয়ে আছেন বুঝতে পারছি। বাড়ি গিয়ে আরাম করুন গে।
শ্রীনাথ রাগে লাল হয়ে চেঁচিয়ে বলল, এইমাত্র এত বড় ঘটনাটা ঘটে গেল সকলের চোখের সামনে সেটা কি ইয়ারকি নাকি?
সবাই গুনগুন করছিল। একমাত্র গণিই গলা তুলে বলল, ঘটনা আবার কী? একটা গাঁইয়া লোক হঠাৎ কী কারণে খেপে গিয়ে একটা ছেলেকে দুটো কিল ঘুসি চালিয়ে পালিয়ে গেল। তাই নিয়ে এত হইচইয়ের কিছু নেই।
গাঁইয়া লোক!–শ্রীনাথ অবাক হয়ে বলে, কিসের গাঁইয়া লোক! ও তো গঙ্গা।
গণি খুব হাসল। বলল, গঙ্গা না কে তা কে দেখেছে? আপনি মাল-খাওয়া চোখে কী দেখতে কী দেখেছেন।
শ্রীনাথ বলল, আলবত গঙ্গা। সবাই দেখেছে।
দেখেছে তো বলুক না। বলছে না কেন?
শ্রীনাথ চেঁচিয়ে বলল, আপনারা বলুন তো, লোকটা গঙ্গা নয়?
শ্রীনাথ ভুল করেছিল। এ কথা ঠিক গঙ্গাকে প্রায় এক ডাকে লোকে চেনে। তাকে মারতে লোকে দেখেছেও। কিন্তু সে কথা কেউ কখনও স্বীকার করবে না।
করলও না। দু-চারজন বরং বলল, শ্রীনাথবাবু, বাড়ি চলে যান। যা হওয়ার হয়ে গেছে।
শ্রীনাথ অসহায়ভাবে বলল, একটা ছেলের মাথা ফেটে রক্ত পড়ছিল, আমার নিজের চোখে দেখা।
চারদিকের গুঞ্জনটা বেশ চেঁচামেচিতে দাঁড়িয়ে গেল! শ্রীনাথের কথা কেউ শুনছে না। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, যাদের ওপর হামলা হয়েছিল সেই আড্ডাবাজ ছেলেগুলোর একটারও টিকি দেখা গেল না।
ভিড় ঠেলে একটা খালি রিকশা এগিয়ে এল। চালাচ্ছে তৃষার আর-এক বশংবদ বীরু। তৃষারই রিকশা। ঝকঝকে নতুন। সামনে এসে শ্রীনাথকে বলল, বাবু, উঠে পড়ুন, মা আপনার জন্য ভাবছেন।
গণি এক ফাঁকে কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। কাঁধে হাত রেখে একটু চাপ দিয়ে বলল, উঠে পড়ুন। মালটা কিন্তু আজ একটু বেশি টেনে ফেলেছেন।
শ্রীনাথ কঠিন স্বরে বলল, আমি কিন্তু অত সহজে ছেড়ে দেব না গণিমিয়া। বলে রাখলাম।
কী করবেন? পুলিশে যাবেন? যান না, কে ঠেকাচ্ছে?
যাব। তাই যাব।
পুলিশ হাসবে। আপনার তো সাক্ষীই নেই।
দরকার হলে টাকা দিয়ে সাক্ষী জোটাব। তা বলে এত বড় অন্যায় সহ্য করব না।
তার চেয়ে বাড়ি গিয়ে মাথাটা ঠান্ডা করুন। তারপর যা বিবেচনা হয় করবেন।
বলে একরকম ঠেলেই তাকে রিকশায় তুলে দেয় গণি। রোগা হলেও গণির কবজিতে জোর বড় কম নয়। আঙুলগুলো লোহার মতো শক্ত। ছাড়াতে গিয়েও পারল না শ্রীনাথ। কবজিতে ব্যথা পেয়ে ‘উঃ করে ককিয়ে উঠল। রিকশায় উঠতে না উঠতেই বীরু হাওয়ার বেগে রিকশা ছেড়ে দিল। একটু বাদে ছায়ার মতো রিকশার পাশাপাশি একটা সাইকেল চলে এল। তাতে গণি।
পাশাপাশি চলতে চলতে গণি বলল, ওই ছেড়াগুলো যে রোজ আপনাকে টিটকিরি দেয় সেটা কি আপনার ভাল লাগে শ্রীনাথবাবু?
শ্রীনাথ উগ্ৰস্বরে বলল, বেশ করে টিটকিরি দেয়। কেন দেবে না?
আপনাকে বা আপনার বউকে অপমান করলে আপনার লাগে না?
না। ওরা সত্যি কথাই বলে।
আপনি কি মরদ নন? আমাকে বললে তো আমি অনেক আগেই চামড়া তুলে নিতাম।
ওরা ঠিক কাজই করে।
সে আপনার যা খুশি ভাবুন। কিন্তু থানা-পুলিশ করলে একটু ভেবেচিন্তে করবেন।
আমি কাউকে পরোয়া করি না।
লোকে তো হাসবে। আজও তো তোক হাসালেন।
এটা তোমাদের ষড়যন্ত্র, গণি। তোমরা তৃষার টাকা খাও।
হি হি। কী যে বলেন!–গণি বোধহয় জিভ কাটল। তারপর হালকা গলায় বলল, ঠাকরোনের সঙ্গে আপনার বনিবনা নেই তো সেটা হল ঘরের ব্যাপার। পাঁচজনকে সেটা জানাতে যাওয়া কি ভাল? ঘরের কথা পরকে জানালে যে ঘরটা বাজার হয়ে যায়।
২৩. আমি যদি এই কোম্পানি ছেড়ে দিই
আমি যদি এই কোম্পানি ছেড়ে দিই তা হলে আপনি কী করবেন?
দীপনাথ একটু ভেবে বলল, কী করে বলি? আপনি কি সত্যিই ছাড়ছেন?
ছাড়তে পারি। একটা ইংলিশ ফার্ম ভাল অফার দিয়েছে। পুরোপুরি ইংলিশ নয়, ইন্ডিয়ান কোলোবোরেটর আছে।
ভাল অফার কি?
খুবই ভাল অফার। ডিরেক্টর করবে বলে প্রমিস করেছে। কিন্তু সেটা কোনও কথা নয়। আমার প্রশ্ন হল, আপনি কী করবেন?
দীপনাথ মিস্টার বোসের দিকে চেয়ে ছিল। বোস ঠ্যাং ছড়িয়ে বেতের আরামদায়ক চেয়ারে বসে আছে। সামনে বেতের টেবিলে দুটো বিয়ারের বোতল আর গেলাস। বোতলের গায়ে এখনও ফ্রিজের কুয়াশা। দীপনাথ নিজের গেলাস নামিয়ে রেখে বলল, আমার তো এ কোম্পানিতে কোনও পাকা চাকরি নেই। আপনি চলে গেলে এরাই বা রাখবে কেন?
একজ্যাক্টলি। আমিও তাই জানতে চাইছিলাম, আপনি আমার সঙ্গেই থাকতে চান কি না।
বোসের গলার স্বর খুব সহানুভূতি এবং সমবেদনায় মাখনের মতো নরম হয়ে কানে বাজল।
দীপনাথ বলল, খবরটা খুব আনএক্সপেকটেড। আমি একটু ভেবে দেখি।
বোস অসহিষ্ণুভাবে বলে, আপনি কেন ইনস্ট্যান্ট ডিসিশন নিতে পারেন না বলুন তো? সব সময়ই সব কাজে আপনার জড়তা দেখতে পাই। জীবনে বড় কিছু করতে গেলে ডিসিশনটা মাস্ট বি প্রোন্টো।
তাড়াহুড়োর কিছু আছে কি?
আছে।–বোস প্লেট থেকে কাই মাখানো সসেজ কাটায় তুলে মুখে দেয়। বিয়ারে দীর্ঘ চুমুকের পর বলে, ইংলিশ ফার্মের ম্যানেজিং ডিরেক্টর গ্র্যান্ডে বসে চারদিকে জাল ফেলছেন। পরশু ফিরে যাচ্ছে বাংগালোরে। যাওয়ার আগেই পাকা কথা হয়ে যাবে।
শুয়োরের মাংসের প্রতি আজন্ম একটু খুঁতখুঁতোনি থাকা সত্ত্বেও স্রেফ বোসকে সঙ্গ দিতে দ্বিতীয়বার সসেজ খেয়ে খুব সংকোচের সঙ্গে বলল, এই কোম্পানিতে আমার কোনও স্ট্যাটাস ছিল না। নতুন কোম্পানিতে কোনও স্ট্যাটাস পাব কি?
