সরিৎ যতটা অবাক হয়, ততটাই রেগে যায়। তেজি গলায় বলে, কী বলছেন আপনি?
শ্রীনাথ তেড়ে এসে বলে, ঠিক বলছি। ওরা আওয়াজ দেয় ঠিকই করে। যা সত্যি তাই বলে। তাতে তোমাদের অত গায়ের জ্বালা কেন?
চেন-এর ফাঁস থেকে ছেলেটাকে ছেড়ে দিয়ে সরিৎ ধমক দিয়ে বলে, আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে! যান তো, বাড়ি যান। যা করার আমরা করছি।
কেন বাড়ি যাব? ইয়ারকি পেয়েছ? গুন্ডামি করে চলে যাবে? আপনারা বসে দেখছেন কী সব? এক্ষুনি পুলিশে খবর দিন। বেঁধে নিয়ে যাক দুটোকে…
দু-চারজন ডেইলি প্যাসেঞ্জার, চায়ের দোকানের খদ্দের, মালিক আর বয় বেয়ারা মিলে মোড়ে নেহাত কম লোক নেই। চেঁচানিতে তারা বেরিয়ে এসেছে।
মার-খাওয়া দুটো ছেলেই রাস্তার ওপর গাড়লের মতো বসে আছে। সরিতের হাতে রক্তমাখা চেন। জামাইবাবু লোক জড়ো করছে।
এই সংকট-সময়ে ছায়ার মতো গঙ্গা এসে পাশে দাঁড়াল। হিংস্র গলায় বলল, আপনাকে হুজ্জত করতে মানা করেছিলাম, শুনলেন না।
সরিৎ অন্যমনস্ক গলায় বলে, লোকটা পাগল হয়ে গেছে।
পাগল নয়। শয়তান। আপনি দেরি করবেন না। ফাগুলালের রিকশা সামনে এগিয়ে দাঁড় করানো আছে, সোজা বাড়ি চলে যান। পুলিশ এলে বিপদে পড়ে যাবেন।
জামাইবাবুকে কী করবে?
সে আমি দেখছি। আপনি যান তো৷ কাজ একেবারে গুবলেট করে দিয়েছেন আপনি।
সরিৎ ব্যাপারটা বুঝল না। তবে গঙ্গার পরামর্শটা মেনে নিল। একটু এগিয়ে গিয়ে রিকশাটা দেখে চড়ে বসল। ফাগুলাল ঊর্ধ্বশ্বাসে নিয়ে এল বাড়িতে।
তৃষা রান্নাঘরে বসে ঠাকুরের কাজকর্ম দেখছিল।
সরিৎ গিয়ে জরুরি গলায় ডাক দিল, মেজদি, একটু বাইরে এসো।
তৃষা তাড়াহুড়ো করল না। কিছু একটা বুঝে নিয়েই যেন একটু বিরক্ত গলায় বলল, ঘরে যা, যাচ্ছি।
সরিৎ কোথায় কী গণ্ডগোল করে ফেলেছে তা সে নিজেও বুঝতে পারছিল না। ঘরে এসে নিঃশব্দে জামা কাপড় বদল করল।
তৃষা শান্ত ভঙ্গিতে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
সরিৎ একটু উত্তেজিত গলায় ঘটনাটা সংক্ষেপে জানিয়ে ক্ষোভের সঙ্গে বলল, জামাইবাবু সব কঁচিয়ে দিয়েছে।
তৃষা কঠিন চোখে ভাইয়ের দিকে চেয়ে ছিল। ঠান্ডা এবং বিরক্ত গলায় বলল, তুই গঙ্গার কথা শুনলি না কেন?
ছেলে দুটো আমার ওপর এসে পড়ল যে।–একটু রং চড়াল সরিৎ।
তৃষা অনুত্তেজিত গলায় বলে, আমি খোঁজ নিয়েছি, ছেলেগুলো পাজি হলেও ষন্ডাগুন্ডা নয়। তোকে মারতে আসেনি।
আমি ভাবলাম বুঝি…
সরিৎ আমতা আমতা করে।
এর পর থেকে যেটা বলব সেটা ভাল করে শুনবি, বুঝবি। যা করলি তাতে সবাই জেনে যাবে এ ঘটনায় আমাদের হাত আছে। গঙ্গা অনেক সাবধানে কাজ করত।
সরিৎ বলল, লোকে জানতে পারত না। শুধু জামাইবাবু ওই পাগলামিটা না করলে
তোর জামাইবাবু যে ওরকম কিছু করবে তা জানি বলেই তোকে বলেছিলাম ওঁকে আগলে রাখতে। তুই ওঁকে নিয়ে চলে এলে এরকম করতে পারত না।
এখন তা হলে কী করব?
কিছু করতে হবে না। চুপচাপ থাক।
পুলিশ এলে?
তৃষা বোধহয় একটু হাসল। কিন্তু আবছা অন্ধকারে ভাল দেখতে পেল না সরিৎ। তবে শান্ত আত্মবিশ্বাসের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, পুলিশ আসবে না।
মেজদি চলে গেলে সরিৎ উত্তেজিত মাথায় বসে জামাইবাবুর সাইকোলজিটা বুঝবার চেষ্টা করছিল। এরকম কাণ্ড করার কোনও যুক্তিসংগত কারণই সে খুঁজে পাচ্ছে না।
একটু বাদে উঠে সে একবার বাইরের দিকে বেরোল। জামাইবাবুর ঘর এখনও অন্ধকার তালাবন্ধ। বুকটা গুরুগুর করে উঠল তার। লোকটা যদি সত্যিই পুলিশে যায়। বহু লোক সাক্ষী আছে।
খ্যাপা নিতাই আজ ঘরেই আছে। ডাকতেই বেরিয়ে এসে এক গাল হেসে বলল, আজকাল খুব কাজের লোক হয়েছ সরিৎবাবু।
তা হয়েছি। চল খালধারে গিয়ে একটু গাঁজা টেনে আসি। বহুকাল টানি না।
গাঁজা পাব কোথায়? পয়সা-টয়সা ছাড়ো কিছু।
ছাড়ছি। বদমায়েশি করিস না। আজ একটু গাঁজা না টানলেই নয়।
চোখ ছোট করে নিতাই জিজ্ঞেস করে, কেন, কী হয়েছে?
সে অনেক কথা।
নিতাই টপ করে ঘরে ঢুকে গাঁজার ঝুলি নিয়ে বেরিয়ে এসে ঘরের ঝপ টেনে দিয়ে বলল, চলো।
শ্রীনাথের চেঁচামেচিতে মোড়ের মাথায় বিস্তর লোক জমে গেছে এতক্ষণে। পরের ট্রেনের ডেলি-প্যাসেঞ্জাররাও জুটেছে। আচমকা দু-দুটো গুন্ডার হাতে দোকানঘরের আড্ডাবাজ ছেলেরা ঘায়েল হওয়ায় কিছু লোক হয়তো খুশিই কিন্তু শ্রীনাথ তাদের খুশি থাকতে দিতে চায় না।
সে সমবেত জনসাধারণকে বলছিল, আপনারা কি ভেড়া হয়ে গেছেন নাকি? যে ছেলেটা চেন চালিয়েছিল তাকে আমি চিনি। পুলিশের কাছে আমি তার নামধাম বলব। আপনারা সাক্ষী দেবেন।
ভিড়ের মধ্যে গঙ্গাকে কোথাও দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু তার জায়গা নিয়েছে আর-একজন রোগা পাতলা ছোটখাটো লোক। তাকে এ অঞ্চলের সবাই চেনে। এত ধূর্ত এবং ফেরেববাজ লোক দুটো নেই। তার নাম গণি। যখন যে রাজনৈতিক দল টাকা দেয় তখনই সে সেই দলের হয়ে গ্রামেগঞ্জে কাজ করে বেড়ায়। মামলা-মোকদ্দমায় তার মাথা খুব সাফ। জমি-ঘটিত আইন-কানুন তার নখদর্পণে।
পিছন থেকে গলা তুলে গণি জিজ্ঞেস করে, ছেলেটার নাম যদি জানেন তবে সবার কাছে বলছেন না কেন? সাক্ষী দেবার কথাই বা উঠছে কীসে? লোকে যদি তাকে না চিনে থাকে তবে কি বানিয়ে বলবে নাকি?
গণিকে শ্রীনাথও ভালই চেনে। এও জানে গণি অন্তত তৃষার বিপক্ষের লোক নয়। তবু সে তেজি গলায় বলল, যে ছোকরা দু’জন মার খেয়েছে তারা দেখেছে।
তারা কোথায়? কে মার খেয়েছে?
