এসো।–বলে শ্রীনাথ এগোয়।
সরিৎ রেল-কোয়ার্টারের পিছনে মেঠো পথটা আগেই ঠিক করে রেখেছিল। পাকা রাস্তা এড়িয়ে ওটা ধরে দোকানঘরগুলোর পিছন দিকে গিয়ে ওঠা যায়।
মেঠো পথে নেমেই পকেট থেকে চেনটা বের করে সরিৎ একবার নিপুণ হাতে বাতাসে সেটা ঘোরাল। বেঁ করে ভোমরার ডাক ডেকে বাতাস কেটে এসে বশীভূত সাপের মতো সেটা আবার কুণ্ডলী পাকাল তার হাতে।
শ্রীনাথের অনেক আগেই সে দোকানঘরের পিছনে পৌঁছে যায়। এখানে গাছপালার অভাব নেই। শান্তভাবে সে একটা বড়সড় গাছের আবডালে দাঁড়িয়ে দোকানঘরগুলোর দিকে লক্ষ রাখে। প্রথম দোকানটাই বড় এবং সেখানেই ছোকরা আড্ডাবাজদের সংখ্যা বেশি। অন্তত ছ’জনকে সে দেখতে পায় বাইরের বেঞ্চে বসে হাঃ হাঃ হিঃ হিঃ করছে। বয়স কুড়ি থেকে ত্রিশের মধ্যে। কাউকেই তেমন পোক্ত মাস্তান মনে হল না। একজন খুব চেঁচিয়ে গান গাইছে, চাদনি চাদসেই হোতা হ্যায়, সিতারো সে নহি। কোনও হিন্দি ছবির গান। ছেলেটা গায়ও ভাল। একটু উৎকর্ণ হয়ে শুনছিল সরিৎ। এ ছবিটা তার দেখা নয় নিশ্চয়ই। কাছেপিঠে কোথাও চলছে কি? কিংবা কলকাতায়? একদিন সময় করে গিয়ে দেখে আসবে।
শ্রীনাথ মন্থর পায়ে মোড়ে এসে পড়ল। চলার ভঙ্গিতে আত্মবিশ্বাস নেই, তাড়া নেই, এমনকী কোনদিকে যাবে তারও যেন ঠিক নেই। মোড়ে এসে চারদিকে চেয়ে তবে বাঁ দিকে ফিরল।
মুঠো থেকে চেনটার একটা কোনা ছেড়ে দিল সরিৎ।
ঠিক এমন সময়ে পিছন থেকে তার কবজিটা আলতো হাতে ধরে ফেলল কে যেন। সরিৎ বাঘের মতো পিছু ফিরতেই গঙ্গা বলল, এখানে আপনি জড়াবেন না। বাবুকে নিয়ে বাড়ি চলে যান। হাঙ্গামা হলে মা ঠাকরোন যেন এতে না বেঁধে যান।
তবে আমি এলাম কেন?
দরকার হলে আমি হাঁক মারব।
দু’জনে গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে কটমটে চোখে তাকিয়ে দেখে, শ্রীনাথ বড় দোকানঘরটার সমুখে আমোর চৌহদ্দিতে গিয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে একটা ছোকরা লাফিয়ে উঠে বলল, আরে শ্রীচরণ চাটুজ্জে যাচ্ছে ওই দ্যাখ।
আর একজন, আজ খুব টেনেছে রে।
কাছাটা টেনে খুলে দিয়ে আয় না।
আমার কাকা কী বলে জানিস? শ্রীনাথ বউদি আর তৃষা দাদা।
হোঃ হোঃ! হিঃ হিঃ!
শ্রীনাথ একবার খুব উদাস চোখে দোকানটার দিকে তাকাল। চোখে রাগ নেই, ঘৃণা নেই, কেবল বুঝি বৈরাগ্য বা অবহেলা আছে।
সরিতের চোখ বাঘের মতো জ্বলে ওঠে।
গঙ্গা নিচু স্বরে বলে, আপনি কর্তাবাবুর পিছু পিছু যান। একটু আস্তে হাঁটবেন।
সরিতের এই প্রস্তাব পছন্দ নয়। তার রক্তে রীতিমতো জ্বালা ধরেছে, হাত-পা নিশপিশ করছে। সে বলল, অত কায়দা কানুনের দরকার কী?
দরকার আছে।–ঠান্ডা গলায় গঙ্গা বলে।
সরিৎ কথা বাড়ায় না। মেজদির ব্যাপার মেজদিই ভাল বুঝবে। ভিতরের জ্বালা চেপে রেখে রাগে গনগন করতে করতে পাকানো চেনটা হাতের মুঠোয় চেপে রেখে সে বড় রাস্তা ধরে জামাইবাবুর পিছু নেয়। দোকানঘরটার সামনে একবার থমকে দাঁড়িয়ে আগুনে চোখে তাকায় ছছাকরাদের দিকে।
ছোকরারা চোখ ফিরিয়ে নেয়। তাদের স্বাভাবিক জৈব বুদ্ধি তাদের বলে দেয়, এবার গোলমাল করাটা ঠিক হবে না।
ছোকরারা একটা টু শব্দ করলেও সরিৎ লাফিয়ে পড়ত। তা হল না। সরিৎ কয়েক কদম এগিয়ে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে একবার ফিরে চাইল। গঙ্গাকে এখনও দেখা যাচ্ছে না। লোকটা করছে কী?
জামাইবাবু খানিকটা এগিয়ে গেছে। যাক। লোকটা আস্তে আস্তে হাঁটছে। সরিৎ পা চালিয়ে ধরতে পারবে। সে রাস্তা থেকে সরে ধারে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরাল।
একটু বাদে হঠাৎ ওপাশের আঁধার থেকে গঙ্গা বেরিয়ে এসে দোকানটার সামনে দাঁড়াল, তার হাতে একটা খাটো লোহার রড। ভাবগতিক আকাট খুনির মতো। ছোকরাগুলো বোধহয় গঙ্গাকে চেনে। গঙ্গা দু-চারটে কথা বলে দোকানটার দিকে দু’ কদম এগোতে না এগোতেই তড়াক তোক করে লাফিয়ে উঠে ছোকরাগুলো এধার-ওধার দৌড়ে পালাতে থাকে। সরিৎ হাসে। একপাল ভেড়য়া। এগুলোকে ধাওয়া করতে খামোখা এত কায়দা কসরত। গঙ্গা একটা ছোকরাকে ধরে পেটাচ্ছে, দূর থেকে দেখতে পেল সরিৎ। দুই হোকরা এদিকে পালিয়ে আসছিল। সরিৎ চেনটা খুলে দু’কদম এগিয়ে রাস্তার মাঝবরাবর গিয়ে দাঁড়ায়। ছোকরা দুটো পালাতে পালাতে পিছু ফিরে দোকানঘরের কাণ্ডটা দেখছে। সরিৎকে লক্ষ করেনি।
সরিতের চেন একবার ঘুরে এল। ‘বাপ রে’ বলে চেঁচিয়ে পয়লা ছোকরা বসে পড়তে না পড়তেই দু’ নম্বরকে ল্যাং মেরে ফেলে দিয়ে সরিৎ তার থুতনিতে বুটশুদ্ধ একটা লাথি জমিয়ে দিল। এতসব করতে গা একটু ঘামলও না তার। পয়লা ছোকরার গলায় চেনটা ফাঁসের মতো পরিয়ে টেনে দাড় করাল সরিৎ। কদর্য একটা খিস্তি দিয়ে বলল, আর কখনও গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোবে?
এ ধরনের কঠিন মার ছোকরা বোধহয় জীবনেও খায়নি। কেমন ভ্যাবলা হয়ে গেছে। কানের ওপরে অনেকটা জায়গা চেন-এ কেটে গিয়ে কাঁধের জামা পর্যন্ত রক্তে ভিজে যাচ্ছে। ওই অবস্থাতে ছেলেটা মাথা নেড়ে বসা গলায় বলল, না।
ঠিক এই সময়ে পিছন থেকে জামাইবাবুর স্পষ্ট তীক্ষ গলা শুনতে পায় সে, কী হচ্ছে এখানে? সরিৎ, ওদের মারছ কেন?
সরিৎ চেনটায় একটু টাইট মেরে জামাইবাবুর দিকে ফিরে চেয়ে হাসল। বলল, আপনাকে রোজ আওয়াজ দেয় এই সুমুন্দির পুতেরা। মুখগুলো বন্ধ করে দিয়ে যাচ্ছি।
শ্রীনাথ একটু বুঝি থমকে যায়। তারপর হঠাৎ প্রচণ্ড রাগে ফেটে পডে চেঁচিয়ে ওঠে, কে বলেছে তোমাকে এ কাজ করতে? আওয়াজ দেয়, বেশ করে। একশোবার আওয়াজ দেবে। ছেড়ে দাও। ছেড়ে দাও শিগগির।
