বাড়িটা ভারী নিঃঝুম। অন্ধকারে নিবিড় গাছপালার ছায়ায় আর কুয়াশায় যেন মিশে গেছে চারপাশের সঙ্গে। শুধু বাগানের মধ্যে এক জায়গায় শুকনো কাঠকুটো দিয়ে আগুন জ্বেলে বসে আছে খ্যাপা নিতাই। প্রতিদিন এই নিশুত রাতে মাটিতে একটা শলা দিয়ে পুতুলরাণীকে আঁকে সে। তারপর মন্ত্র পড়ে বাণ মারে। এতদিনে বাণের চোটে পুতুলরাণীর মুখে রক্ত উঠে মরার কথা। কিন্তু শ্রীনাথ যতদূর জানে পুতুলরাণী গুসকরায় রসবড়া ভাজছে। মাঝখান থেকে এ ব্যাটাই তান্ত্রিক-মান্ত্রিক সেজে খ্যাপাটে হয়ে গেল।
নিতাই নাকি রে?–ডাকল শ্রীনাথ।
ডাক শুনে নিতাই উঠে আসে, কিছু বলছেন?
তোর আগুনটায় আমায় এক ডেকচি জল গরম করে দে তো!
গু মাড়িয়েছেন বুঝি? স্নান করবেন?
ঠিক ধরেছিস। আমার ঘর থেকে ডেকচি নিয়ে যায়। আর শোন, তোর কুকুরটা একটা গো-হাড় এনে ফেলেছিল এইখানে। ওটা তুলে ফেলে দিস।
বলে টর্চ জ্বেলে বারান্দার তলায় দেখাল শ্রীনাথ। হাড়টা পড়ে আছে এখনও।
নিতাই বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বাঁ হাতে হাড়টা তুলে নিয়ে বলল, দিচ্ছি ফেলে।
ব্যাটা চামার।–গাল দেয় শ্রীনাথ, এত রাতে হাড়টা ছুঁতে গেল?
নিতাই অন্ধকারে জটাজুট নিয়ে মিলিয়ে যায়। একটু বাদে ডেকচি নিয়ে ফিরে আসে।
এই শীতে খোলা জায়গায় টিউবওয়েলের ধারে গরম জলে স্নান করতে গিয়েও শীতে থরথরিয়ে কাপছিল শ্রীনাথ। স্নানের পর যখন গা মুছছে তখন হ্যারিকেনের সামনে একটা মস্ত ছায়া এসে পড়ল।
চোখ তুলে দেখল, তৃষা। আর একবার আপনা থেকেই কেঁপে উঠল শ্রীনাথ।
তৃষা গম্ভীর মুখে বলে, তুমি কি আজ সজলকে বকেছ?
আমি?–বলে ভাববার চেষ্টা করে শ্রীনাথ। ভেবে-টেবে বলে, বকিনি। তবে পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে মাছ ধরছিল। সাঁতার জানে না। বিপদ হতে পারে সাবধান করে দিয়েছিলাম।
তৃষা কোনও তর্ক করতে আসেনি। বিমর্ষ মুখে বলল, ছেলেটার বিকেল থেকে খুব জ্বর। ভুল বকছে। জ্বরের ঘোরে বার বার বলছে, বাবা বকেছে। বলেছে মারবে। ভীষণ মারবে।
বেকুবের মতো চেয়ে থেকে শ্রীনাথ বলে, মারব বলিনি তো! মারব কেন?
তৃষা একটু অবাক গলায় বলল, তুমি কি রোজ রাতে স্নান করো? সাধুটাধু হলে নাকি?
না। ওই নিতাইয়ের কুকুরটা একটা গোরুর হাড় এনে ফেলেছিল। সেটা পায়ে লেগেছে।
ও।–বলে তৃষা চলে গেল।
সজলকে একবার দেখতে যাওয়া উচিত কি না তা বুঝল না শ্রীনাথ। বাবা হিসেবে হয়তো উচিত। কিন্তু সে তো ঠিক স্বাভাবিক বাবা নয়।
স্নান করে ঘরে ফিরে এসে বালতি রেখে দড়িতে গামছা টাঙাচ্ছে, এমন সময় মঞ্জু এল চুপিসারে।
বাবা!
আবার কী চাই?
ভাইয়ের জ্বর হয়েছে কেন জানো?
না তো। কেন?
ভাই বলেছে, তুমি নাকি ওকে আজ খুব মেরেছ। মারতে মারতে পুকুরের জলে ফেলে দিয়েছিলে। তাই!
শ্রীনাথ রাগে স্তম্ভিত হয়ে মেয়ের দিকে চেয়ে থাকে। অনেকক্ষণ বাদে বলে, সজল এ কথা বলেছে?
নিজের কানে শুনেছি বাবা। আমার সামনেই মাকে বলল।
আমি মেরেছি?
বলে দিশেহারা শ্রীনাথ নিজের দুটো হাতের দিকে যেন সন্দেহবশে চেয়ে দেখল একটু। তারপর রাগে গরগর করে বলল, আচ্ছা মিথ্যেবাদী ছেলে তো! ওকে চাবকানো দরকার।
শুনে খুশি হল মঞ্জু। বলল, আমাদের নামেও বলে।
থমথমে মুখে শ্রীনাথ জিজ্ঞেস করে, ওর জ্বর এখন কত?
একশো চার। ওকে কিছু বলব বাবা?
না, এখন থাক। যা বলার আমিই বলব।
সেই রাগ নিয়েই গিয়ে রান্নাঘরে খেতে বসল শ্রীনাথ। সেই রাগ নিয়েই শুল রাত্রে। ঘুম আসতে চাইল না। পৃথিবীটা বড় পচে যাচ্ছে যে! সেই পচনের দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে স্পষ্ট। নিজের ছেলে জলজ্যান্ত এমন মিথ্যে কথাটা বলল কেমন করে?
শেষরাতে ঘুমিয়ে পড়েছিল শ্রীনাথ। স্বপ্ন দেখল, সজল একটা মস্ত সুন্দর দিঘির ধারে মাছ ধরছে। আসলে মাছ নয়, পুকুর থেকে ছিপের টানে উঠে আসছে নানা রঙের ঘুড়ি। পিছন থেকে চুপিচুপি গিয়ে শ্রীনাথ ওর পিছনে দাঁড়াল। দেখল দিঘির জল খুব গভীর। সজল তার পিছনে বাবার উপস্থিতি টের পায়নি। শ্রীনাথ হাত বাড়িয়ে আচমকা সজলকে ঠেলে ফেলে দিল জলে।
০৩. শিলিগুড়ির হোটেল সিনক্লেয়ার
শিলিগুড়ির হোটেল সিনক্লেয়ার থেকে দুপুরের রোদে ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছিল। দূর প্রসারিত নীলবর্ণ পাহাড়ের আড়াল থেকে সাদা কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে হঠাৎ তাকালে মনে হবে যেন শূন্যে ভেসে আছে। যেন-বা রুপোলি মেঘ। বহুবার দেখেছে দীপনাথ। আবারও দেখছে।
রওনা হতে আর বেশি দেরি নেই। হোটেলের লাগোয়া ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের অফিসের লাউঞ্জে একটু আগেই সে দেখে এসেছে এ কে বোসের নামের লেবেল মারা একটা বেডিং আর দুটো ঢাউস বিদেশি ফাইবার গ্লাসের সুটকেস নামানো হয়েছে। সে বুঝতে পারছে না মালপত্রগুলো নিয়ে তাকেই এয়ারলাইনসের গাড়িতে যেতে হবে কি না। এয়ারলাইনসের লাউঞ্জে মালপত্র রাখার অর্থটা তাই দাঁড়ায়। বোস আর তার স্ত্রীর জন্য রাঙ্গাপানি টি এস্টেটের অ্যামবাসাড়ার গাড়ি এসে গেছে। দীপনাথ বুঝতে পারছে না বাগডোগরায় সে নিজে যাবে কীসে। অ্যামবাসাডারে, না এয়ারলাইনসের। গাড়িতে? বস্তুত আজকাল এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তার নেই। সিদ্ধান্ত নেয় বোস। বোসের ইচ্ছাই তার সিদ্ধান্ত। তবে এ ব্যাপারগুলো নিয়ে আর ভাবে না দীপনাথ। মেনে নিতে নিতে মন ভোতা হয়ে গেছে।
পরশু গ্যাংটকে কার্পেট কেনা নিয়ে বোস ও তার স্ত্রীর মধ্যে একচোট ঝগড়া হয়ে গেছে। ভদ্রমহিলার খরচের হাত সাংঘাতিক। সেই ঝগড়ার জের এখনও চলছে কি না কে জানে! যদি চলে তবে বোস স্বভাবতই চাইবে দীপনাথ তাদের সঙ্গে অ্যামবাসাডারেই এয়ারপোর্টে যাক। সেক্ষেত্রে বোস বসবে সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে, দীপনাথকে বসতে হবে শ্রীমতী বোসের পাশে একটু জড়সড় হয়ে পিছনের সিটে এবং পুরো রাস্তাটাই কোনও কথাবার্তা হবে না। বড় জোর শ্রীমতী বোস বলবে, যা-ই বলুন গ্যাংটক ভীষণ নোংরা, তার চেয়ে কালিম্পং অনেক ভাল। কিংবা, আপনি কিন্তু এবারও শিলিগুড়ির হংকং মার্কেট দেখালেন না।
