ওই দেখো, কী কথা থেকে কী কথা!
কম্বলটা দিন। শীত এলে ফেরত পাবেন।
আর শীত কি আসবে আমার জীবনে? এটাই শেষ শীত বোধহয়।
তৃষা কম্বলটা নিয়ে চলে যায়। বিছানাটা একটু ফাঁকা-ফাঁকা ঠেকে দীননাথের। কম্বলটার জন্য বড় উদ্বেগ। নিয়ে গেল, আবার দেবে তো! ঠেকে ঠেকে শিখেছেন, একবার নিলে লোকে আজকাল আর কিছু ফিরিয়ে দেয় না।
দীননাথ আর শুয়ে রইলেন না। বসে বসে নিজের ছেলেপুলেদের কথা ভাবতে লাগলেন। দীপনাথ মানুষ হয়েছিল বেদবালার কাছে। বেদবালার প্রথম সন্তান বাঁচেনি। তাই দীপুকে নিয়ে গেল। পরে আরও ছেলেপুলে হয়েছিল বটে, কিন্তু দীপুকে খুব বুক দিয়ে মানুষ করেছিল। বলত, দীপ হল আমার মেজো ছেলে।… বিলুর বড় বিপদ চলছে। জামাইয়ের নাকি বাড়াবাড়ি অসুখ!… শ্রীনাথ রাতে ফেরে না মাঝে মাঝে, এ ভাল কথা নয়।… ওদিকে ছোট বউমা কী করছে কে জানে। সোমনাথ বলেছিল, রবিবারেরবিবারে আসবে। তা কত রবিবার চলে গেল। এল না তো! বউমার কি কিছু হল-টল?
খবর দেওয়া সত্ত্বেও বদ্রী এল না দেখে এক ছুটির দিনে বিকেলে নিজেই তার খোঁজে বেরিয়েছে শ্রীনাথ।
তাড়া নেই। বাজারের কাছটায় মাদারির খেল হচ্ছে, তাই দাঁড়িয়ে দেখল খানিক।
আবার রওনা হওয়ার মুখে পিছন থেকে রঘু স্যাকরা ডাকল, কে, শ্রীনাথদা নাকি?
আরে রঘুবাবু, খবর কী?
কোন দিকে চললেন?
যাই একটু ঘুরে-টুরে আসি।
খবরটা শুনেছেন নাকি?
কী খবর?
আপনার শালাবাবুর নামে যে শচীন সরকারের ভিটেটা কেনা হয়ে গেল।
সরিতের নামে? কে কিনল?
কোনও খবরই রাখছেন না আজকাল।
শ্রীনাথ বিরক্ত হয়ে বলে, ওসব খবরে আমার ইন্টারেস্ট নেই, রঘুবাবু।
রঘু শ্রীনাথের বিরক্তিটা গায়ে মাখল না। খুব জরুরি গলায় বলল, পুকুর আর বাঁশবন সমেত বিঘে সাতেক জায়গা। টাকাও নেহাত কম লাগেনি। বিঘেতে তিন হাজার, তার ওপর পাকা একতলা বাড়িটার জন্য আরও হাজার আষ্টেক। আপনার শালা কি ব্ল্যাক-ট্যাক করে নাকি?
কে জানে কী করে?
সবাই এ নিয়ে খুব গরম। শচীন সরকারের বউয়ের সঙ্গে বিনোদ কুণ্ডুর ব্যবস্থা হয়েছিল বিঘেতে দুই হাজার আর বাড়ির বাবদ পাঁচ। আপনার শালা চড়া দাম ছেঁকে কিনে নিল।
তার আমি কী করব?
বিনোদ সহজে ছাড়বে না। টাকাটা কোত্থেকে এল তার খোঁজ নিচ্ছে। বাগে পেলে জেলে ভরে দেবে। বিনোদের এক ভায়রাভাই সার্কেল অফিসার।
দিক। আমি ওসবের মধ্যে নেই।
তা আমরা জানি।
আপনারা মানে?
এ অঞ্চলের সবাই। আমরা বলি, শ্রীনাথ চাটুজ্জে কখনও কারও পাকা ধানে মই দিতে আসেনা। বলে থেমে গিয়ে রঘু গেলাসের ইঙ্গিত করে বলল, চলবে নাকি? এই কাছেই খালধারে আমার একটা ঠেক আছে।
না। কাজে যাচ্ছি।
আপনার বাবা এলেন শুনেছি! কদিন থাকবেন?
তা জানি না। আছেন তো এখন।
বাপ-মায়ের মতো জিনিস হয় না। গৃহদেবতা। যত্ন-আত্তি করবেন। ওঁদের আশীর্বাদেই সব।
তা বটে।
সোমনাথবাবু বাবাকে মাথায় করে রেখেছিলেন। ওই হল ছেলের কাজ।
ঠিকই তো।
যাই তা হলে। ডানদিকে এই কাছেই রামলাখন সিং-এর ঘর। চেনেন তো?
না। আসিনি কখনও।
ভাল জায়গা। সব ব্যবস্থা আছে।
কী ব্যবস্থা?
যা চান। সবই চলে ওখানে। দরকার হলে বলবেন।
রঘু খালধারের ধুলোভরতি রাস্তায় নেমে গেলে অনেকক্ষণ ভাবমাভরতি মাথা নিয়ে আনমনে হাঁটে শ্রীনাথ। বাজার পেরিয়ে রেললাইনের ধারে উঠে হাঁটাপথ ধরে। হাঁটতে হাঁটতে একটু হাসে শ্রীনাথ। এরা তৃষাকে চেনে না।
তার মায়া হয়। ভাবে রঘু স্যাকরাকে ডেকে বলে দিয়ে আসে, শুনুন মশাই, তৃষা আপনাদের একদিন এখান থেকে উচ্ছেদ করে ছাড়বে। কোন দিক থেকে ওর মার আসবে তা টেরও পাবেন না।
বদ্রী ঘরে ছিল। ডাকতেই বেরিয়ে এসে খাতির করে ঘরে নিয়ে গিয়ে বসাল।
ঘরটা পাকা হলেও ছোট আর গরম। পশ্চিম দিকে খোলা বলে রোদে তেতে আছে।
বদ্রী একটা হাতপাখা নাড়তে নাড়তে বলল, ক’দিন খুব ঝামেলায় ছিলাম বলে যেতে পারিনি। যাব-যাব করছিলাম।
তুই তো গিয়েছিলি শুনলাম।
কোথায়?—বদ্রী আকাশ থেকে পড়ে।
তৃষা তোকে ডেকে পাঠিয়েছিল না?
বদ্রী হেসে বলে, ওঃ, সে বহুদিন হল।
কেন ডেকেছিল?
রায়পাড়ার একটা জমি বেচতে চাইছেন।
তৃষা জমি বেচতে চাইছে?–শ্রীনাথ খুব অবাক হয়।
তাই তো বললেন।
মিথ্যে বলিস না, বদ্রী। তৃষাকে আমি জানি সে কোনওকালে এক ইঞ্চি জমিও বেচবে না। পারলে সে গোটা অঞ্চল, গোটা দেশ, মায় গোটা দুনিয়া কিনে নেবে।
বী ফঁপরে পড়ে বলে, আজ্ঞে, আমি যা জানি তাই বললাম।
তুই চেপে যাচ্ছিস। তৃষা তোকে অন্য কাজে ডেকেছিল।
আজ্ঞে না।
আর তারপর থেকেই তুই আমার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ করেছিস।
বললাম তো, ঝামেলায় ছিলাম খুব। আমার সম্বন্ধীর অসুখ গেল। ছোটাছুটি, ডাক্তারবদ্যি, হাসপাতাল অবধি হয়ে গেল।
তৃষা তোকে কী বলেছে?
আপনার ব্যাপারে কিছু নয়। জমি নিয়েই কথা ছিল।
আমার জন্য যে জমির খোঁজ এনেছিলি তার কী হল?
যেরকম চাইছেন সেরকম পাচ্ছি না।
বলেছিলি দূরের দিকে পাওয়া যাবে।
শেষতক হয়নি। সব জায়গায় হুড়োহুড়ি করে বর্গা রেজিস্ট্রি হয়ে যাচ্ছে।
ভাল দাম পেলে বর্গা ছাড়া জমিও লোকে বেচবে। আমি তো টাকায় পিছোচ্ছি না।
দেখব। কয়েকদিনের মধ্যেই খবর পেয়ে যাবেন।
না বদ্রী, খবর পাব না। খবর তুই দিবিও না।
আমার তাতে কী লাভ বলুন। খবর দিয়েই তো দু’পয়সা ঘরে তুলি।
তৃষা কি তোকে ঘুষ দিয়েছে?
কী যে বলেন!–বদ্রী জিব কাটে।
লুকোস না। তৃষা কি চায় না যে আমি কোথাও জমি কিনি, চাষবাস করি?
