কোন স্ত্রীই বা চায় বলুন? কিন্তু কথাটা তা নয়।
তবে কী?
কথাটা হল, আপনি অন্য জায়গায় যেতে চাইছেন কেন? এদিকে তো আপনার জমিজায়গার অভাব নেই।
জমি কি আমার?
বদ্রী চোখ লুকিয়ে বলে, আপনার ছাড়া আর কার? বউঠান তো আর আপনার পর-মানুষ নন।
এসব কথা তোকে শেখাল কে? তৃষা?
না, না। কী যে বলেন!
বদ্ৰী, আমি জানি তৃষা তোকে হয় ভয় দেখিয়েছে, নয় তো ঘুষ দিয়েছে।
বীর মুখটা আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছিল। কেমন অসহায়, ফ্যাকাসে, ভয়ে ভরা।
হাতপাখা রেখে বদ্রী নিচু স্বরে বলল, দোষ ধরবেন না তো? তা হলে বলি।
বল, বদ্রী। আমি কাউকে কিছু বলব না। কিন্তু ব্যাপারটা আমার জেনে রাখা দরকার।
বউদিকে আমরা ভয় খাই। উনি চোখ রাঙালে সে কাজ করতে ভরসা হয় না।
তা হলে তৃষা তোকে চোখই রাঙিয়েছে?
ঠিক চোখ রাঙানো নয়। বরং ডেকে পাঠিয়ে অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথাই বললেন। শেষে জিজ্ঞেস করলেন, আমি আপনাকে জমির খোঁজ দিতে পেরেছি কি না।
তুই কি গাড়লের মতো সব বলে দিলি?
বললেও উনি ঠিকই খোঁজ রাখেন। চতুর্দিকে ওনার চর ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রমথবাবুর জমি কিনতে চেয়েছিলাম সেকথা প্রমথবাবুই বলে এসেছেন বউদিকে।
তোকে কী বলল তৃষা?
আমার কাছ থেকে সব কথা বের করে নিয়ে বললেন, উনি এখন অন্য জায়গায় জমি-টমি কিনলে এখানকার সব দেখাশোনার অসুবিধে হবে।
বাজে কথা। আমি এখানকার কিছুই দেখাশোনা করি না।
সে আমি জানি। বউদি যা বললেন তাই বললাম আপনাকে।
তারপর কী হল?
উনি বললেন, আর জমি-টমি তোমাকে দেখতে হবে না। নিজের কাজ নিয়ে থাকো। জমির যদি তেমন কোনও খবর পাও তা হলে আমাকে জানিয়ো। কাছেপিঠে হলে আমরা কিনব।
শ্রীনাথ একটু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর বদ্রীর দিকে চেয়ে বলল, তুই আমার নিজের লোক ছিলি রে, বদ্রী। তৃষা তোকেও হাত করল।
বদ্রী কাঁচুমাচু হয়ে বলে, আমার দোষ নেই দাদা, ছা-পোষা মানুষ।
শচীন সরকারের ভিটে কেনা হচ্ছে, সে খবর রাখিস?
রাখি। আপনার শালার নামে।
কেন?
ল্যান্ড সিলিং আছে না? জমি কিনে গেলেই তো আর চলবে না। আপনার নামেও বিস্তর জমি কেনা হয়েছে, আপনি কি জানেন?
না তো!–খুব অবাক হয়ে শ্রীনাথ বলে।
হয়েছে।
কিনলেই হল? আমার সইসাবুদ লাগবে না?
আপনার ওকালতনামায় অন্য লোক কিনছে।
ওকালতনামা আমি কাউকে দিইনি তো?
তার আমি কী বলব বলুন? যা জানি তাই বলছি।
জানিস যদি তবে খোলসা করে বল। আমার ওকালতনামা অন্যে পায় কী করে?
পেয়েছে। আমি ভাল করে জানি।
তবে কি বলছিস আমার সইও জাল হচ্ছে আজকাল?
আমি তাই বললাম নাকি? হয়তো কোনও সময়ে দিয়েছেন, এখন মনে নেই।
বাজে কথা বলিস না। আমার এখনও ভীমরতি ধরেনি।
বদ্রী জবাব দিল না। আস্তে আস্তে হাতপাখা নাড়তে লাগল। খুব আস্তে করে বলল, শুধু আপনি নয়। বৃন্দা, মংলু, এমনকী খ্যাপা নিতাইয়ের নামেও বিস্তর জমি কেনা হয়েছে।
সেই যে সেজোকাকা এসে গেছে তারপর থেকে সজলের প্রায়ই খুব সেজোকাকার কথা মনে পড়ে। সজলের হাত ধরেছিল সেজোকাকা। হাতটা দারুণ শক্ত। ধরলেই বোঝা যায় সেজোকাকার গায়ে খুব জোর। অত চওড়া কবজি আর কারও দেখেনি সে।
স্কুলে সে একদিন বন্ধুদের বলল, আমার সেজোকাকা একবার খালি হাতে বাঘ মেরেছিল।
খালি হাতে? যাঃ।
সেজোকাকার গায়ের জোর তো জানিস না। ঘুসি মেরে পাথর ফাটিয়ে দেবে।
তোর সেজোকাকা কুংফু জানে? ক্যারাটে?
ফুঃ। সেজোকাকা যখন শিলিগুড়িতে ছিল তখন একবার সিনেমাহলে মারপিট লাগে। একা পঞ্চাশজনকে মেরে ঠান্ডা করে দিয়েছিল।
গুল ঝাড়িস না।
আচ্ছা, আবার এলে তোদের দেখাব সেজোকাকাকে।
কীরকম দেখতে?
ইয়া লম্বা, অ্যায়সা গুল্লু গুলু মাসল্।
বুকের ছাতি কত?
ছেচল্লিশ।
আমার দাদারই তো বাহান্ন।
তোর দাদাকে আমি দেখেছি রে, কমল। মোটেই বাহান্ন হবে না।
তবে কত?
বিয়াল্লিশ হবে বড়জোর।
দাদা কার কাছে ব্যায়াম শেখে জানিস? বিষ্টু ঘোষের আখড়ায়।
জানি। সেজোকাকা আমাকে কুংফু শিখিয়ে দেবে বলেছে। ক্যারাটেও।
আমার দাদাও ক্যারাটে জানেন।
আমার সেজোকাকার মতো নয়।
তোর সেজোকাকা যে বাঘটা মেরেছিল সেটা কত বড়?
দশ ফুট। খবরের কাগজে বেরিয়েছিল। দেখিসনি?
আমাদের বাড়িতে খবরের কাগজ রাখাই হয় না।
বেরিয়েছিল। আসল রয়েল বেঙ্গল।
তোর বাবার গায়ে কিন্তু একদম জোর নেই।
সজল ফুঁসে উঠে বলে, কী করে বুঝলি?
একদিন দেখি স্টেশনের দিক থেকে আসছে তোর বাবা। চায়ের দোকানে কতকগুলো লোক বসে থাকে না সব সময়? সেই লোকদের একজন চেঁচিয়ে তোর বাবাকে আওয়াজ দিল, ওই যে শ্রীচরণনাথ যাচ্ছে, দেখ দেখ।
বাবা কী করল?
তোর বাবা মাইরি সব শুনতে পেল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালও। তখন সেই লোকটা না— হিঃ হিঃ—
সেই লোকটা কী?
সে যা অসভ্য কাণ্ড না!
বল না!
সেই লোকটা দু’হাতের আঙুল দিয়ে তোর বাবাকে খুব অসভ্য একটা জিনিস দেখিয়ে বলল, যাও যাও, এইটে করে গে।
লোকটা কে?
নাম জানি না। খুব মস্তানের মতো দেখতে।
বাবা কিছু বলল না?
কিছু না। মাথা নিচু করে চলে এল ভেড়ুয়ার মতো।
সজলের গা রি রি করে রাগে। সে বলে, ঠিক আছে, মামাকে বলে দেব।
তোর মামা কী করবে?
মামাকে তো চেনো না। কী করবে দেখো।
যাঃ, যাঃ, তোর মামাকে জানি। ওই তো মহাদেবের দোকানে বসে থাকে বিকেলের দিকে। লোকে যলে বেকার।
মালদায় মস্তান ছিল, জানো না তোর
বাড়িতে ফিরে সজলের নানা সময়ে বারবার কথাটা মনে পড়ে। স্টেশনের কাছে একটা লোক তার বাবাকে আওয়াজ দিয়েছিল।
