তা সেই সুরবালাই ওটা গলা থেকে খুলে আমার হাতে দিল। বলল, ওটা কাউকে দিয়ো না। এখনও রাঙা বউঠানের গায়ের তাপ এতে লেগে আছে। সেই থেকে হারটা ছিল। তোমার শাশুড়ির কথা খুব মনে পড়ত বলে হারটা দেখতাম ঘুরিয়ে ফিরিয়ে! কী যেন বলছিলাম!
বলছিলেন, হারটা লুকিয়ে রেখেছিলেন।
ঠিক তাই। পাছে কেউ চুরি করে সেই ভয়ে। ভেবেছিলাম একেবারে শেষ সময়ে যে সেবা করবে তাকে দিয়ে যাব। সময় করে একবার খুঁজে দেখো তো!
আমি দেখব কেন? আপনার জিনিস আপনিই খুঁজুন। আমার ওতে লোভ নেই। তবে এও জানি, খুঁজলেও পাবেন না।
তবে কি ফেরত দিতে ছোট বউমা ভুলে গেল?
ভুলে যাবে কেন? অত ভুলো মন তো ওর নয়।
তা হলে?
তা হলে আর কী? মনে মনে ওটা ছোট বউমাকেই দান করে দিন।
দান করাই যায়। ছোট বউমা আমার সেবা কিছু কম করেনি।
সেটা করেছে নিজের গরজেই। আপনি যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিনই মাসে মাসে টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা ছিল যে! আমরা পাঠাতাম। দীপু ঠাকুরপো পাঠাত।
দীপু! বহুকাল দীপনাথকে দেখি না। সে কি তোমাদের এখানে মাঝে মাঝেই আসে?
না, বহুকাল বাদে ওই সেদিন এসেছিল, যেদিন আপনাকে সোমনাথ পৌঁছে দিয়ে গেল এখানে। তাড়া ছিল বলে চলে গেল একটু। সঙ্গে ওর বসের বউ ছিল!
কী করছে এখন?
চাকরিই করছে।
ভাল আছে তো! বহুদিন দেখিনি।
দেখবেন। আসতে লিখে দেব।
তোমাদের এই বাড়িটা খুব ভাল। বেশ খোলামেলা, হাওয়া-বাতাস আছে। আগেরবার দেখে গেছি, তখন এত দালান-কোঠা ওঠেনি।
এসব ঘর পরে হয়েছে।
মল্লিনাথের কি অনেক সম্পত্তি, বউমা?
খুব কম নয়।
আমার ছেলেদের মধ্যে মল্লিনাথই ছিল সবচেয়ে সাকসেসফুল। অথচ দেখো, তারই ভোগ করার কেউ নেই।
কেউ নেই কেন? এই তো আমরা ভোগ করছি।
সে ঠিক কথা। তবে তার নিজের তো কেউ নেই। পাঁচ ভূতে লুটে খাচ্ছে।
আমরা কি ভূত, বাবা?
তোমাদের কথা নয়। কী মুশকিল! আমার কি বুড়ো বয়সে সব কথা ঠিকঠাক আসে?
বললেন বলেই জিজ্ঞেস করলাম। সোমনাথ কী বলে? আমরাই সেই পঞ্চভূত?
বুলুকে তোমরা দেখতে পারো না কেন বলো তো? সে কিন্তু তার মায়ের খুব আদরের সন্তান ছিল।
বেশি আদর দিয়েছেন বলেই তো এরকম।
ছেলেপুলেরা তো বাপ-মায়ের আদরেরই হয়। তুমি কি আদর দাও না?
দেব না কেন? তবে অন্যায় আদর দিই না!
দীননাথ চট্টোপাধ্যায় তার নিবিড় চুলে ভরা মাথাটা নাড়ালেন। বললেন, সবাই সেকথা বলে।
কী বলে?
বলে মেজো বউ খুব কড়া ধাতের। তা ভাল, আমরা সে আমলে সত্যিকারের ছেলেপুলে মানুষ করতে জানতাম না। ছেলেরা নিজেরাই যে যার মানুষ হত। এখনকার দিনের মা-বাবারা অনেক বেশি ছেলেপুলের যত্ন করে। তবে শাসনটা তেমন করে না। তুমি অবশ্য করো।
আপনারাও যদি ছেলেপুলেকে শাসন করতেন তবে এরকম হত না।
দীননাথ শঙ্কিত চোখ তুলে বলেন, কীরকম বলো তো? আমার ছেলেপুলেরা কি খুব খারাপ?
ভালও কিছু নয়।
কেউ নয়?
ভাশুর ঠাকুরকে ধরছি না।
দীননাথ খুশি হয়ে আবার মাথা নেড়ে বললেন, মল্লিনাথ ছিল ব্রিলিয়ান্ট। ওরকম ছেলে হয় না।
দীপুও বড় ভাল। আপনার ছেলেপুলেদের মধ্যে এই দু’জন অন্যরকম।
শ্রীনাথ কি খুব সৃষ্টিছাড়া? তাকে এখানে এসে অবধি ভাল করে দেখলামই না।
কখন দেখবেন? সেই সকালে বেরোন, রাত করে ফেরেন। কখনও ফেরেনই না।
ফেরে না? তবে রাতে কোথায় থাকে?
তা কে বলবে?
দীননাথ একটু ভাবেন। বলেন, ওর কি চরিত্র খারাপ?
খোঁজ নিয়ে দেখিনি।
খারাপ হতে দিয়ো না। এখনও আটকাও। স্বামী ছাড়া মেয়েদের কিছু নেই।
আমি ওসব মানি না।
আজকালকার মেয়েরা অবশ্য মানে না। পুরুষগুলোও তো যাচ্ছেতাই। একটা কথা বলব, বউমা?
বলুন।
আমি মরে গেলে বুলুকে একটু দেখো। যত খারাপ ভাবো ও তত খারাপ নয়।
দেখব কী, দেখার আছেই বা কী? সোমনাথ তো আর কচি খোকা নয়। বয়স হয়েছে, বিয়ে করেছে, নিজের এবং অন্যের ভালমন্দ ভালই বুঝতে শিখেছে।
ও ওর মায়ের খুব আদরের ছিল।
তাতে আমার কী? আমি তো মায়ের আদর দিতে পারব না।
তা বলিনি। বলছি, ওর বড় অভাব। ওকে একটু দেখো।
আপনি কী বলতে চাইছেন বুঝেছি। বোধহয় সোমনাথই আপনাকে এসব বলতে শিখিয়ে দিয়েছে।
দীননাথ একটু লজ্জা পেয়ে বলেন, যত যা-ই হোক, ওর দাদারই তো সম্পত্তি।
সেটা দাদা বেঁচে থাকতে বুঝে নিল না কেন?
তুমি কি ওকে খুব অপছন্দ করো?
করলেই বা। ওর তাতে কী যায় আসে?
ও তোমারই দেওর।
তা হলেই বা কী? আমাকে তো বউদি বলে ভাবে না। ভাবলে এখানকার লোকদের আমার ওপর খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করত না।
ও কি তাই করছে?
হ্যাঁ।
দীননাথ তাঁর এই বয়সেও প্রচুর কালো চুলে ভরতি মাথাটা চুলকোন দু’ হাতে। তারপর বলেন, ওকে কি তুমি তোক দিয়ে মার খাইয়েছিলে?
ও তাই বলে নাকি?
ঠিক তা বলে না। তবে আন্দাজ করে। মরতে মরতে বেঁচে গেছে।
তৃষা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
দীননাথ তৃষার দিকে গভীরভাবে চেয়ে দেখছিলেন। ভাল দেখতে পান না বলে ভ্রু কোঁচকানো। বললেন, তবে এই কম্বলটা আর গায়ে দেব না বলছ?
না। শীত করলে পাতলা সুতির চাদর গায়ে দেবেন।
চাদর তো নেই।
আপনার যে কিছুই নেই তা আমি জানি। ওসব নিয়ে ভাববেন না। চাদর বিছানায় ঠিক থাকবে। আচ্ছা। খুব ভাল। তোমার বেশ চারদিকে চোখ।
চোখ ছিল বলে বেঁচে আছি। নইলে চিল-শকুনে খেয়ে যেত। কম্বল দিন, রোদে দিয়ে তুলে রাখব।
থাক না, বিছানাতে আছে থাক। এ কম্বল বিলেতে তৈরি। মল্লিনাথ দিয়েছিল। একটা স্মৃতির মতো।
ভয় নেই বাবা। আমি শমিতা নই যে, নিয়ে ফেরত দেব না।
