এইসব ঘটনাগুলো বাইরে থেকে দেখতে কিছুই নয়। কিন্তু প্রীতমকে এইসব ছোটখাটো পরিবর্তন বড় গভীরভাবে স্পর্শ করে। বিলু বাড়িতে না থাকলে তার কাছে ভীষণ একঘেয়ে আর ফাঁকা লাগে বাড়িটা। নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। লাবু যতক্ষণ স্কুলে থাকে ততক্ষণ সে ভিতরেভিতরে অস্থির হয়ে থাকে। সবচেয়ে খারাপ লাগে বেবিসিটার মেয়েটিকে। বয়স বেশি নয়, লেখাপড়া জানে, চেহারারও খানিকটা চটক আছে। কিন্তু মেয়েটা খুব অবাক চোখে প্রীতমকে বারবার তাকিয়ে দেখে। কী দেখে মেয়েটি? প্রীতমের অস্বাভাবিক রোগা, শুকিয়ে যাওয়া হাত-পা? প্রীতমের নিরন্তর শুয়ে থাকা? ও কি ভাবে, এ লোকটা আর বেশিদিন বাঁচবে না?
যদি সবসময়ে একজন লোক প্রীতমকে লক্ষ করে তাহলে প্রীতম কীভাবে তার লড়াই করবে? বারবার যে সে আত্মসচেতন হয়ে ওঠে! চমকে যায় মাঝে মাঝে! অস্বস্তি বোধ করে।
সে একদিন বলেই ফেলল, বিলু, ওকে তাড়াও।
কাকে?
অচলাকে।
কেন? ও কী করেছে?
কিছু করেনি। কিন্তু বাইরের অচেনা একজন সবসময়ে ঘরে থাকলে আমার ভারী অস্বস্তি হয়।
ও মা! তাহলে লাবুকে দেখবে কে?
কেন, বিন্দু!
বিন্দুর যে ট্রেনিং নেই! অচলা ট্রেইনড নাস। ভাল বেবিসিটার। অরুণের চেনা বলে কম নিচ্ছে। নইলে ট্রেইনড বেবিসিটারের মাইনে কম করেও তিনশো।
প্রীতম জানে, বলে লাভ নেই। সে যত ঘ্যানঘ্যান করবে তত বিলু তাকে খুব ভদ্রভাবে বোঝাবে, রাজি করানোর চেষ্টা করবে। কিছুতেই তবু ছাড়বে না অচলাকে। বিলু ওইরকম। খুব ঠান্ডা আর কঠিন ওর প্রতিরোধ।
প্রীতম তাই হাল ছেড়ে দেয়। কিন্তু তবু তো তাকে বাঁচতেই হবে! সব বিরুদ্ধতার বিরুদ্ধেই তো তার লড়াই। তাই সে অচলার বিস্ময়কে সহ্য করার নতুন শিক্ষণ নিতে চেষ্টা করে।
শোনো অচলা।
বলুন।
পাখাটা একটু আস্তে করে খুলে দাও। গরম লাগছে।
দিচ্ছি।
তোমার বাড়িতে কে কে আছে?
স্বামী, একটা ছেলে।
তোমার ছেলেকে কে দেখাশোনা করে?
সে এখন বড় হয়েছে। দশে পড়ল। কাউকে দেখতে হয় না।
তোমার যে দশ বছরের ছেলে আছে তা তো মনে হয় না। কত বয়স তোমার?
কত আর হবে! আমার খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল।
স্বামী কী করে?
বিজনেস।
এবার একটু শীত-শীত করছে। পাখাটা আর-একটু কমিয়ে দাও বরং।
পাখা তো এক-এ আছে, আর তত কমবে না। তাহলে বন্ধ করে দিই?
দাও। এখন কি গরম পড়েছে?
তা একটু পড়েছে।
তাই বলল, আমারও আজকাল গরমই লাগে।
শীত তো চলে গেল।
বিন্দুকে একটু চা করতে বলবে?
বিন্দু বাড়ি নেই, এ বেলা ছুটি নিয়েছে।
ও। তাহলে থাক।
ও মা! থাকবে কেন? আমি করে দিচ্ছি।
এইভাবে লড়াইটা লড়তে থাকে প্রীতম। বেশ ভালই লড়ে। একদিন অচলার চোখ থেকে কৌতূহল খসে যায়। সে প্রীতমের দিকে আর আড়ে-আড়ে তাকায় না।
২১. কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে
আপনি কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে আছেন কেন? এখন তো আর শীতকাল নেই!
শীতকাল নেই? তবে এটা কী কাল?
ফাল্গুনের শেষ। এখন আর শীত কোথায়?
তাই বলো। আমারও কেমন হাঁসফাঁস লাগে আজকাল! চোখে ভাল দেখি না, বাইরে কি রোদের খুব তেজ?
খুব তেজ। কিন্তু চোখে ভাল দেখেন না কেন? ছোট ছেলে তো ছানিটা কাটিয়ে দিতে পারত।
চেয়েছিল কাটাতে। আমিই ভাবলাম, সে ছা-পোষা মানুষ। চোখ কাটাতে খরচ তত কম নয়। আর এ বয়সে চোখ নিয়ে আমি করবটাই বা কী?
চোখ কাটানোর নাম করে টাকা নিয়েছিল সেই গেলবার। শুনি দীপু ঠাকুরপোও টাকা দিয়েছিল। তা হলে কাটাল না কেন?
সে টাকা কি আর রেখেছে? গরিবের সংসার, কবে বোধহয় ভেঙে খেয়ে ফেলেছে।
খুব গরিব নয়। মাইনে তত খারাপ পায় না যতদুর জানি। থাকে অবিশ্যি গরিবের মতো। কিন্তু তা বলে নিজের বাবার চোখের ছানিটা পর্যন্ত কাটাতে নেই? অমন ছেলের কাছে ছিলেন কী করে এতদিন?
না, এমনিতে অযত্ন করত না। ডাক-খোজও করত খুব। বউমাটিও ভাল।
ভাল হলেই ভাল। কিন্তু চোখ যখন কাটায়নি, তখন টাকাটা আমাদের ফেরত দিয়ে দিক।
সে কি আর দিতে পারবে? পাবে কোথায়? ওদের সংসারে সারাদিন হা-টাকা যো-টাকা।
আপনার নিজেরও তো কিছু টাকাপয়সা ছিল শুনেছি। সেটাও খুব কম হবে না। সেটাও কি গিয়েছে নাকি?
আমার টাকা!
তা নয় তো কী? কিছু টাকা তো আপনার ছিল। অন্তত পনেরো-বিশ হাজার তো হবেই।
কে জানে! কোথাও আছে বোধ হয়। ডাকঘরে বা ব্যাংকে।
আছে ঠিক জানেন?
মনে নেই। আজকাল ভুলে যাই বড্ড।
শাশুড়ি-মায়ের কিছু গয়নাও ছোট কর্তার কাছে ছিল।
বুলুর কাছে? না, না, বুলুর কাছে থাকবে কেন? গয়না ছিল আমার কাছে।
ছিল মানে? এখন কি নেই?
কথাটা তা নয়। আসলে গয়নাগুলো আমি বউমাকে দিয়েছিলাম তার লকারে রাখতে।
তবেই হয়েছে। বউমা তার লকার বোধহয় আর জীবনেও খুলবে না।
মটরমালা একটা হার কিন্তু দিইনি।
সেটা তবে কোথায়?
সেটা বউমা স্যাকরাকে দেখাতে চেয়ে নিয়েছিল। বেশি দিনের কথা নয়। বলল, ওরকম একটা হার গড়বে। স্যাকরা প্যাটার্নটা দেখতে চেয়েছে।
ফেরত দিয়েছিল?
দিয়েছে বোধহয়। আমার বাক্সটা খুলে দেখো তো! বাঁ দিকে একটা বহু পুরনো সিগারেটের কৌটো আছে। ওপরে কয়েকটা পইতে, তার তলায়।
দেখতে হবে না। ধরেই নিচ্ছি ওটাও নেই।
না, না, দেখোই না ভাল করে। আমি লুকিয়েই রেখেছিলাম।
লুকিয়ে রাখতে গেলেন কেন? চোর-ডাকাত না ছেলের ভয়ে?
ভয়ে ঠিক নয়। তোমার শাশুড়ি যখন মারা যান তখন গলায় ওইটে ছিল। আমি খুলতে চাইনি। ভাবলাম যার জিনিস তার সঙ্গে যাক। সুরবালাকে মনে আছে তোমার?
ও মা। নিজের পিসশাশুড়িকে মনে থাকবে না কেন?
