বলতে বলতে রাগে বুদ্ধিবিভ্রমে, আক্রোশে বকুল হঠাৎ নিজের পায়ের চটি খুলে ছুড়ে মারল দীপনাথের দিকে।
দীপনাথের কপাল খারাপ। চটিটা এদিক-ওদিক না গিয়ে সোজা এসে লাগল তার কপালে।
প্রিন্সিপ্যালের চোখের সামনে এই ঘটনা।
দীপনাথ তেমন কিছু বলেনি। পকেট থেকে চিঠিটা বের করে প্রিন্সিপ্যালকে ফেবত দিয়ে বলেছিল, আমি এ কাজ করিনি। আপনি এনকোয়ারি করে দেখতে পারেন। যদি আমার কথা সত্যি হয় তবে এ মেয়েটির পানিশমেন্টের ব্যবস্থা করবেন কি? আমি বিচার চাই।
ব্যাপারটা নিয়ে সারা কলেজ এবং শহরেও বেশ একটা হইচই পড়ে গিয়েছিল। ফয়সালা হতেও অবশ্য দেরি হয়নি। চিঠির হাতের লেখা দীপনাথের ছিল না, সুব্রত নামে একটি মিটমিটে ডান ছেলে ওই কাজটি করে দীপনাথকে ফাসায়। ব্ল্যাকবোর্ডের লেখাটা কার তা অবশ্য ধরা পড়েনি।
প্রিন্সিপ্যাল একদিন ইউনিয়নের পা সমেত দীপনাঘকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠিয়ে বললো, ব্যাপারটা মিটিয়ে নাও। আফটার অল একটা মেয়ের ভবিষ্যৎ বলে একটা কথা আছে। তাকে। তোমরা পাবলিকলি অপমান করলে তোমাদের পৌরুষ বলে কিছু থাকে না।
কিন্তু ইউনিয়নের নেতারা বলল, না জেনে যখন অন্যায় কাজ করেছে তখন পানিশমেন্টও তাকে নিতেই হবে। একজন নির্দোষ ছেলেকে আপনার সামনেই ও চটি ছুড়ে মেরেছে। এ কাজ কোনও ছেলে করলে তো আপনি ছেড়ে দিতেন না!
এই নিয়ে বিস্তর কথাবার্তা, তর্কাতর্কি হল।
অবশেষে প্রিন্সিপ্যাল বললেন, বকুলের কী শাস্তি হবে তা লেট হারসেলফ ডিসাইড। মেয়েটির স্বভাব চমৎকার। আমার মনে হয় ওকে সেলফ-ইমপোজড পানিশমেন্ট নেওয়ার স্বাধীনতা তোমাদের দেওয়া উচিত।
এতে দীপনাথ ও তার বন্ধুরা আপত্তি করেনি।
বিকেলের দিকে জানা গেল বকুল নিজের শাস্তি নিজেই ঠিক করে নিয়েছে। সে ছ’মাস খালি পায়ে কলেজে আসবে।
এ পর্যন্ত ঘটনাটা ছিল অপমান, আক্রোশ, বিবাদে ভরা।
কিন্তু বকুল যখন পরদিন থেকে খালি পায়ে কলেজে আসতে লাগল তখন ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়াল ভারী করুণ।
বকুলের মাথা আরও হেঁট, চোখে-মুখে অহংকারের বদলে নিরুদ্ধ কান্না। মেয়েটাকে প্রায় ভিখিরি করে ছেড়ে দিয়েছিল দীপনাথ। আর তখনই তাকে গভীরভাবে ভালবেসে ফেলেছিল।
কিন্তু মফস্সল শহরে তখনকার দিনে মেলামেশা বা ভাব করা অত সহজ ছিল না।
মাসখানেক বাদে ভরা বর্ষার একটি দিনে যখন কলেজে ভিড় খুব কম, তখন বারান্দায় হঠাৎ বকুলের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল দীপনাথের।
দীপনাথ বলল, বকুল, একটা কথা বলব? মাথা নত করে বকুল মৃদু স্বরে বলল, বলুন।
আমি ব্যাপারটা মনে রাখিনি। আপনি কাল থেকে আর খালি পায়ে কলেজে আসবেন না। তার দরকার নেই।
বকুল বিনীত এবং দৃঢ় স্বরে বলেছিল, আপনার কথায় তো হবে না।
কেন হবে না! ভিকটিম তো আমিই। আমিই সব অভিযোগ তুলে নিচ্ছি।
তা নিলেও হয় না। পানিশমেন্টটা তো আমি নিজেই নিয়েছি। ডিসিশনটা আমার। সেখানে অন্যের কথায় কিছু যায় আসে না।
দীপনাথ উদ্বেগের সঙ্গে বলল, খালি পায়ে হেঁটে অভ্যাস নেই, শেষে যদি পেরেক-টেরেক ফুটে ভাল-মন্দ কিছু হয় তো লোকে আমাকেই দায়ী করবে যে!
করবে না। এতে আপনার কোনও হাত ছিল না।
শান্ত স্বভাবের আড়ালে বকুলের যে একটি জেদি, একগুয়ে, নিজস্ব মন আছে তা হাড়ে হাড়ে টের পেল দীপনাথ। এও বুঝল, এ মেয়েটির সঙ্গে জমানো ততটা সহজ হবে না। বরফ এখনও গলেনি।
বরফ অবশ্য কোনওদিনই তেমন করে গলল না। তবে বকুলের সঙ্গে একটু মাখামাখি করার রাস্তা দীপনাথ অনেক চেষ্টায় করে নিয়েছিল। প্রায়ই দেখা হত তাদের। কথাবার্তা হত।
শেষ পর্যন্ত বুঝি দীপনাথেব ওপর একটু টান এসেছিল বকুলের। একদিন বলল, আপনি কি চাকরি-বাকরি করবেন না? বি-এ পাশ করে ভ্যাবাগঙ্গারামের মতো আড্ডা মেরে বেড়াচ্ছেন যে বড়!
চাকরি করলে কী হবে?
হবে একটা কিছু। আপনি একটা চাকরি জোগাড় করুন তো আগে।
মনে মনে তখন বকুলকে প্রশ্ন করেছিল দীপনাথ, আমাকে বিয়ে করবে বকুল?
মনে মনে বকুলের জবাব এল, হ্যাঁ।
পিসেমশাইয়ের এক চেনা লোকের সূত্র ধরে কৌটোর কারখানায় চাকরি পেয়ে গেল দীপনাথ। কলকাতায় চলে এল।
তারপর যা হয়। চাকরি বাঁচাতে আর কাজ শিখতে হিমশিম খেতে খেতে একদিন বকুল তার মন থেকে বেরিয়ে গেল। বকুলের কী হয়েছিল কে বলবে! সে দীপনাথকে কোনওদিন মনের কথা তেমন করে জানায়নি তো! তবে একজন মিলিটারি অফিসারকে বিয়ে করে সে ইউ পিবাসিনী হয় বলে খবর পেয়েছিল দীপনাথ। খুব একটা দুঃখ পায়নি তার জন্য।
এখন প্রীতমদের এই ঘরে অনেকখানি উজিয়ে দৃশ্যটা দেখে আবার বর্তমানে ফিরে আসে দীপনাথ। একটা বড় করে শ্বাস ছাড়ে।
প্রীতম বলে, তাহলে বকুল নয়।
দীপনাথ মৃদু ম্লান হেসে বলে, না, বকুল নয়।
তবে কে সেজদা?
কেউ নয়।
আজ নয়, তবে কোনওদিন ইচ্ছে হলে বোলো।
বলার কিছু নেই রে। আজ চলি।
বলে উঠল দীপনাথ।
আবার এসো। তুমি এলে ভাল লাগে।
আসব। তুই ভাল থাকিস।
আমি ভাল আছি। খুব ভাল আছি।
দীপনাথ চলে গেলে প্রীতম খানিকক্ষণ চোখ বুজে থাকে। সে কিছু ভোলে না, সে অনেক কিছু দেখতে পায়, অনেক বেশি অনুভব করে। বিড়বিড় করে সে বলল, তোমার কিছু হয়েছে সেজদা। তুমি ভাল নেই। তুমি কি এমন কারও প্রেমে পড়েছ যে তোমাকে ভালবাসে না?
জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকেই স্কুলে যেতে শুরু করল লাবু। ফেব্রুয়ারিতে বিলু যোগ দিল চাকরিতে। আড়াইশো টাকা মাইনে আর খাওয়া-দাওয়া কবুল করে একজন বেবি সিটার রাখা হয়েছে লাবুর জন্য।
